শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দশমীতে সিঁদুরের রং, ঢাকের বাদ্যি আর চোখের কোণে জমে থাকা জল দুর্গাপুজোর শেষ দিনের চেনা ছবি। চার দিনের উৎসব শেষে উমাকে বিদায় জানানোর পালা এলেই বাঙালির মনে ভিড় করে বিষাদ আর অপেক্ষা। একদিকে দেবীকে বরণ করে কৈলাসে ফেরানোর রীতি, অন্যদিকে আগামী বছরের পুজোর দিন গোনার শুরু। কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিতে এই পরম্পরা আজও সমান মর্যাদায় পালিত হয়। ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ির দুর্গাপুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। এ বারও বিজয়া দশমীতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সিঁদুরখেলায় মেতে উঠলেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick)। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ়, ছিমছাম সোনার গয়না আর পরিপাটি খোঁপায় তাঁর সাবেকি সাজ নজর কাড়ল সকলের।
মল্লিকবাড়ির দুর্গাপুজো কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম পরিচিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পুজোয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে। আধুনিক সময়ের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব ও বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার মধ্যেও পরিবারের সদস্যেরা পুজোর দিনগুলিতে একত্রিত হন। দেবীর বোধন থেকে বিসর্জনের প্রস্তুতি, প্রতিটি পর্বেই বজায় থাকে পুরনো রীতির ধারাবাহিকতা। আর দশমীর সিঁদুরখেলা সেই ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ। এ বারও দেবীবরণের পর বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে সিঁদুরের খেলায় অংশ নেন কোয়েল। অভিনেত্রীর সাজেও ছিল দশমীর চেনা বাঙালিয়ানা। লাল পাড়ের সাদা শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ়, চুলে খোঁপা ও পরিমিত সোনার গয়নায় কোয়েলকে দেখা যায় সাবেকি রূপে। উৎসবের শেষ দিনে অতিরিক্ত জাঁকজমকের বদলে ঐতিহ্যনির্ভর সাজই বেছে নেন তিনি। সিঁদুরের লাল রঙে রাঙা হয়ে পরিবারের অন্য মহিলাদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন অভিনেত্রী। মল্লিকবাড়ির পুজোর যে নিজস্ব ঘরোয়া আবহ রয়েছে, তাঁর উপস্থিতিতে সেই ছবিই আরও একবার সামনে আসে।

সিঁদুরখেলার আনন্দের আড়ালে দশমীর চিরাচরিত মনখারাপও যে রয়েছে, তা ভুলে যাননি কোয়েল। সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘আজ যদিও মনখারাপের পালা। কিন্তু নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলব, আসছে বছর আবার হবে! শুভ বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা। সকলে ভাল ও আনন্দে থাকবেন। অন্যদেরও আনন্দে রাখবেন।’ তাঁর কথায় ধরা পড়েছে পুজো শেষ হওয়ার পরিচিত আবেগ। উৎসবের কয়েকটি দিন যেন চোখের পলকে কেটে যায়। তার পরেই আসে বিদায়ের মুহূর্ত। কিন্তু বাঙালির পুজো শেষ মানেই অপেক্ষার আর একটি অধ্যায়ের শুরু। কোয়েলের কাছে মল্লিকবাড়ির দুর্গাপুজো কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়, পরিবারের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে আরও নিবিড় করে নেওয়ার সময়ও। অভিনয়জীবনের ব্যস্ততা সারা বছর তাঁকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখলেও পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করেন তিনি। অষ্টমীর অঞ্জলি হোক কিংবা দশমীর দেবীবরণ, বাড়ির পুজোর বিভিন্ন পর্বে তাঁকে দেখা যায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে পুজোর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে তাঁর উৎসব উদ্যাপনের নিজস্ব ধরন।
এবারও পুজোর প্রথম দিন থেকেই মল্লিকবাড়িতে ছিল ব্যস্ততা। প্রতিদিন নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা হয়েছে। অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে এবং পুজোর কাজে হাত লাগাতে দেখা গিয়েছিল কোয়েলকে। তাঁর পাশে ছিলেন স্বামী নিসপাল সিংহ রানে (Nispal Singh Rane) এবং দুই সন্তান কবীর ও কাব্যা। পরিবারের প্রবীণ সদস্য রঞ্জিত মল্লিক (Ranjit Mallick) ও তাঁর স্ত্রীকেও পুজোর নানা মুহূর্তে দেখা যায়। বাড়ির ছোট থেকে বড়, সকলের উপস্থিতি পুজোর আনন্দকে পারিবারিক মিলনোৎসবের রূপ দেয়। দশমীতেও সেই চেনা পরিবেশের পরিবর্তন হয়নি। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি ও দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে দিনের অনুষ্ঠান। নিয়ম মেনে দেবীকে বরণ করার পর সিঁদুরখেলায় অংশ নেন বাড়ির মহিলারা। সিঁদুর, পান-সুপারি এবং মিষ্টি দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালি হিন্দু পরিবারের দীর্ঘদিনের সংস্কার। এরপর একে অপরের কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তাঁরা। বিবাহিত নারীদের এই পরম্পরায় মিলেমিশে থাকে পারিবারিক আনন্দ, মঙ্গলকামনা এবং বিদায়ের আবেগ।
মল্লিকবাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সাবেকি রীতির সঙ্গে পরিবারের ব্যক্তিগত স্মৃতির সংযোগ। অনেক বনেদি বাড়ির মতো এখানেও পুজোকে কেন্দ্র করে আত্মীয়স্বজনের সমাগম ঘটে। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও সেই পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। কোয়েলের দুই সন্তান কবীর ও কাব্যার উপস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই একটি দিক। পুজোর আচার-অনুষ্ঠান যে কেবল বড়দের দায়িত্ব নয়, বরং ছোটদের কাছে পারিবারিক ঐতিহ্যকে চিনে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে, মল্লিকবাড়ির উৎসবের ছবিতে তা ধরা পড়ে। এবারের দুর্গাপুজোয় মল্লিকবাড়িতে রাজনৈতিক উপস্থিতিও নজর কেড়েছিল। নবমীর সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সেখানে উপস্থিত হয়ে দুর্গাপ্রতিমা দর্শন করেন। সেই সময় অভিনেত্রী তথা বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য কোয়েল মল্লিক-সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বনেদি বাড়ির পুজোয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি কলকাতার উৎসব-সংস্কৃতির পরিচিত ছবির অংশ। তবে দশমীর দিনে মল্লিকবাড়ির মূল আকর্ষণ ছিল দেবীবরণ, সিঁদুরখেলা ও পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে উৎসবের শেষ মুহূর্তগুলি উপভোগ করা।
দুর্গাপুজোর শেষ দিনটি বাঙালির কাছে একই সঙ্গে আনন্দের এবং বিষাদের। সিঁদুরখেলায় লাল হয়ে ওঠে কপাল, শাড়ির আঁচল ও উৎসবের স্মৃতি। তার পর আসে বিসর্জনের পালা। দেবীকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মন পড়ে থাকে পরের বছরের অপেক্ষায়। কোয়েলের বিজয়ার শুভেচ্ছাতেও সেই চেনা অনুভূতি ফিরে এসেছে। ‘আসছে বছর আবার হবে’ এই কথার মধ্যেই যেন জমা থাকে বাঙালির পুজোকে ঘিরে যাবতীয় আবেগ। মল্লিকবাড়ির সিঁদুরখেলায় কোয়েল মল্লিকের সাবেকি সাজ তাই শুধু উৎসবের একটি সুন্দর মুহূর্ত নয়, বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর দীর্ঘদিনের পরম্পরারও পরিচিত ছবি। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়েও যে পারিবারিক রীতি ও শিকড়ের টানকে ধরে রাখা যায়, সেই ছবিই আবার সামনে এল বিজয়া দশমীতে। সিঁদুরের লাল রং, ঢাকের শেষ আওয়াজ আর বিদায়ের বিষাদ পেরিয়ে এখন অপেক্ষা আগামী শরতের। দেবী বিদায় নিলেও মল্লিকবাড়ির পুজোর স্মৃতি থেকে গেল আগামী বছরের প্রতীক্ষায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal four new airport | UDAN airport project West Bengal, Kolkata Europe direct flight : কলকাতা থেকে ইউরোপের আকাশপথ ফের খোলার উদ্যোগ, বাংলার চার প্রান্তে নতুন বিমানবন্দর তৈরিতে বড় পদক্ষেপ



