সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্যের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার পথে বড় পদক্ষেপ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কেন্দ্রের ‘উড়ান’ (UDAN) প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের চারটি এলাকায় নতুন বিমানবন্দর তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমঝোতাপত্র বা মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। সোমবার নবান্ন সভাঘরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক, এয়ারপোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (Airports Authority of India) ও রাজ্যের পরিবহণ দফতরের মধ্যে এই চুক্তি হয়। প্রস্তাবিত চার বিমানবন্দর তৈরি হবে পুরুলিয়ার ছড়রা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কলাইকুন্ডায়। রাজ্যের বিমান যোগাযোগের মানচিত্রে এই চারটি জায়গা যুক্ত হলে কলকাতাকেন্দ্রিক বিমান পরিষেবার পরিধি অনেকটাই বাড়তে পারে। এত দিন বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট শহর ও অঞ্চলের উপর বেশি নির্ভরতা ছিল। নতুন বিমানবন্দরগুলি চালু হলে উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, দক্ষিণবঙ্গের শিল্পাঞ্চল থেকে সীমান্তবর্তী এলাকা, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কলকাতা ও দেশের অন্য শহরে যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিমানবন্দরগুলিতে আঞ্চলিক বিমান পরিষেবার আওতায় ৭২ আসনের বিমান চালানোর ব্যবস্থা করা হতে পারে।
মউ স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Shuvendu Adhikari), কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী কিনজারাপু রামমোহন নাইডু (Kinjarapu Ram Mohan Naidu), প্রতিমন্ত্রী মুরলীধর মোহল (Murlidhar Mohol), রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহ (Arjun Singh) ও পরিবহণ ও অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন (Anandamoy Barman)। প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ আধিকারিকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্র ও রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ায় এবার প্রস্তাবিত বিমানবন্দরগুলির পরবর্তী কাজ আরও দ্রুত এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অনুষ্ঠান থেকেই কলকাতা থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে সরাসরি বিমান পরিষেবা পুনরায় চালুর বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-এর বক্তব্য, অতীতে কলকাতা থেকে ইউরোপের একাধিক গন্তব্যে সরাসরি বিমান চলাচল করত। বর্তমানে সেই সংযোগ আর আগের মতো নেই। ফলে কলকাতাকে পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বিমান পরিবহণ কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক বিমানপথের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ফিরলে যাত্রী পরিবহণের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং শিল্পক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের ‘উড়ান’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দেশের ছোট শহর ও অপেক্ষাকৃত দূরের অঞ্চলের বিমান যোগাযোগ বাড়ানো। ২০১৬ সালে এই প্রকল্প চালু হওয়ার পর আঞ্চলিক বিমান পরিষেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বড় শহরের বাইরে থাকা মানুষকেও বিমানযাত্রার সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা ও তুলনামূলক কম খরচে ছোট শহরের সঙ্গে বড় বিমানবন্দরগুলির যোগাযোগ তৈরি করা। পশ্চিমবঙ্গেও সেই পরিকল্পনার আওতায় একাধিক জায়গাকে বিমান পরিষেবার পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ছড়রা, বালুরঘাট, হাসিমারা ও কলাইকুন্ডাকে ঘিরে এই নতুন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাসিমারা ও কলাইকুন্ডায় বিমানবন্দর তৈরির জন্য অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন নিয়ে আগে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসনের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওই দুই এলাকায় প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত জমির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরুলিয়ার ছড়রা এবং বালুরঘাটেও বিমানবন্দর তৈরির জন্য জমির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে এত দিন যে জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ এগোতে সময় লাগছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন বিমানবন্দরগুলির সম্ভাব্য সুবিধা শুধু যাত্রী পরিষেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ বাড়লে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। উত্তরবঙ্গের চা, কৃষিজাত পণ্য, ফুল কিংবা হস্তশিল্প দ্রুত কলকাতা বা দেশের অন্য বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিমান পরিষেবা কাজে লাগতে পারে। একই ভাবে দক্ষিণবঙ্গের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্দিষ্ট ধরনের শিল্পপণ্য দ্রুত অন্য রাজ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রেও বিমানপথ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে। হাসিমারা উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও সংলগ্ন পর্যটনাঞ্চলের প্রবেশপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বিমান যোগাযোগ চালু হলে দূরের শহর থেকে পর্যটকদের ওই অঞ্চলে পৌঁছনোর সময় কমতে পারে। পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা বা দেশের অন্য বড় শহর থেকে সরাসরি বা সহজ সংযোগ তৈরি হলে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। বালুরঘাটের ক্ষেত্রেও বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ দিনাজপুরের এই জেলা ভৌগোলিক ভাবে রাজ্যের অন্য প্রান্ত থেকে কিছুটা দূরে। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি আকাশপথের সংযোগ তৈরি হলে প্রশাসনিক কাজ, ব্যবসা এবং জরুরি যাতায়াতে সময় সাশ্রয় হতে পারে। একই ভাবে পুরুলিয়ার ছড়রায় বিমানবন্দর হলে জঙ্গলমহল ও সংলগ্ন এলাকার সঙ্গে কলকাতা এবং অন্য শহরের যোগাযোগের নতুন পথ খুলতে পারে।
কলাইকুন্ডার ক্ষেত্রেও শিল্প ও প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই অঞ্চলকে বিমান যোগাযোগের আওতায় আনতে পারলে আশপাশের শিল্পাঞ্চল ও জনপদের যাতায়াত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে চারটি বিমানবন্দরকে শুধুমাত্র যাত্রী পরিবহণের প্রকল্প হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেই এগোতে চাইছে প্রশাসন। এর পাশাপাশি কল্যাণীতে গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির জন্য প্রায় ২,০০০ একর জমি চিহ্নিত করার কথাও জানিয়েছে রাজ্য সরকার। অর্থাৎ চারটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বড় পরিসরের বিমান পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। কলকাতাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিমান যোগাযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উড়ানের সংখ্যাও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
রাজ্যের বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কলকাতার উপর যাত্রী ও বিমান পরিষেবার চাপের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলি কার্যকর হলে জেলার মানুষকে প্রতিটি ক্ষেত্রে কলকাতায় এসে বিমান ধরতে হবে না। স্থানীয় বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বা সংযোগকারী উড়ানে দেশের অন্য শহরে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কলকাতা বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এগোতে পারে। কিন্তু, নতুন বিমানবন্দর তৈরি থেকে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালু, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগোবে। পরিকাঠামো নির্মাণ, বিমান চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পরিষেবা পরিচালনা এবং যাত্রী চাহিদা প্রভৃতি একাধিক বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। মউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ পার হল রাজ্য। আগামী দিনে চারটি বিমানবন্দরকে ঘিরে পরবর্তী কাজ কত দ্রুত এগোয়, তার উপরই নির্ভর করবে কবে থেকে সাধারণ যাত্রীরা এই পরিষেবা ব্যবহার করতে পারবেন। বাংলার আকাশপথে নতুন গন্তব্য যোগ করার এই উদ্যোগ তাই রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। এক দিকে পুরুলিয়া, বালুরঘাট, হাসিমারা ও কলাইকুন্ডার মতো অঞ্চল বিমান পরিষেবার আওতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে কলকাতা থেকে ইউরোপের সরাসরি উড়ান ফেরানোর দাবি উঠেছে। আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগের বিস্তার ও আন্তর্জাতিক রুট বাড়ানোর এই দুই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের বিমান পরিবহণের পরিসর আগামী দিনে আরও বড় হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill 223 Rohit Sharma century | India ODI series win : শুভমন গিলের ২২৩-এ লেখা হল নতুন রেকর্ড, ৪০৫ রান তাড়া করে গুয়াহাটিতে ভারতের রেকর্ড জয়




