সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ লখনউ: বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এবার জাপানের দিকে আরও বড় পদক্ষেপ উত্তর প্রদেশের (Uttar Pradesh) যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) সরকারের। রাজ্যের শিল্পোন্নয়নকে নতুন গতি দিতে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে অঞ্চলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ‘জাপান সিটি’ (Japan City) নামে একটি আধুনিক শিল্প ও আবাসন নগরী। প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তর প্রদেশে জাপানি সংস্থাগুলির ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি উৎপাদন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জেওয়ারের নরেন্দ্র মোদী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Noida International Airport) -এর কাছেই এই নগরী গড়ে তোলা হবে। বিমানবন্দর থেকে প্রকল্প এলাকার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার বলে জানানো হয়েছে। প্রায় ৫০০ একর জমিতে তৈরি হতে চলা এই প্রকল্পের লক্ষ্য বিদেশি সংস্থার কর্মী ও তাঁদের পরিবারের বসবাসের উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলাও। শিল্প, আবাসন, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং নাগরিক পরিষেবাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার মাধ্যমে উত্তর প্রদেশ সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে, যেখানে জাপানি সংস্থাগুলি দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গত আগস্টে নতুন দিল্লিতে আয়োজিত ইউপি-জাপান ইনভেস্টমেন্ট মিটে (UP-Japan Investment Meet) এই উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বৈঠকে জাপানের শিল্প সংস্থাগুলিকে উত্তর প্রদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। রাজ্যটিকে তাঁদের দ্বিতীয় শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও জাপানি সংস্থাগুলিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় জাপান সিটি এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কারখানা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক ও আবাসিক সুবিধাও পাবেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (Yamuna Expressway Industrial Development Authority বা YEIDA) -এর সেক্টর ৫এ -তে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের জমি, নির্মাণের সময়সীমা এবং পরিকাঠামো তৈরির বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সরকারি তথ্য প্রকাশিত হলে তার ভিত্তিতেই বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যাবে। উল্লেখ্য যে, জাপান সিটি প্রকল্পের গুরুত্ব বাড়িয়েছে জেওয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নৈকট্য। আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের সুবিধা থাকলে বিদেশি সংস্থার কর্মী, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ এবং পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল, গুদাম, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক পরিকাঠামো গড়ে উঠলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহও বাড়তে পারে। উত্তর প্রদেশ সরকার এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাইছে। বিমানবন্দরকে ঘিরে যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গে জাপান সিটিকেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এই প্রকল্প শুধু একটি নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে করিডোরের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, প্রকল্পের ঘোষিত পরিকল্পনা ও বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া কাজের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও সমস্ত পরিকাঠামো ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
প্রস্তাবিত জাপান সিটিতে শিল্প কারখানার পাশাপাশি আবাসন, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ শিল্পাঞ্চলে যেখানে মূলত উৎপাদন কেন্দ্র ও গুদাম তৈরি হয়, সেখানে এই প্রকল্পে বসবাসের উপযোগী পরিবেশকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জাপানি সংস্থার কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের জন্য স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যবস্থা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ভাবে কর্মীদের সেখানে থাকতে সুবিধা হতে পারে। বিদেশি সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে কর্মীদের বাসস্থান, যাতায়াত, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। সেই কারণেই শিল্প ও আবাসনকে একই পরিকল্পনার মধ্যে রাখার উদ্যোগকে বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও পরিষেবা, নির্মাণকাজ, পরিবহণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কতগুলি আবাসন, হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, তার নির্দিষ্ট বিবরণ প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা ও সরকারি ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে। জাপানের শিল্পক্ষেত্রে রোবোটিক্স, নির্ভুল যন্ত্রপ্রকৌশল, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও উন্নত কারখানা পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। উত্তর প্রদেশ সরকার সেই প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে রাজ্যের শিল্পোন্নয়নে কাজে লাগাতে আগ্রহী। বিশেষ করে অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। জাপানি সংস্থাগুলি নতুন কারখানা স্থাপন করলে শুধু উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনাই তৈরি হবে না, স্থানীয় কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও বাড়তে পারে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য তৈরির সুযোগ রাজ্যের শিল্পনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণের বাস্তব ফল নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং কারখানার কার্যক্রমের ওপর।
যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে অঞ্চলে ইতিমধ্যেই একাধিক শিল্পপ্রকল্প নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এসকর্টস কুবোটা (Escorts Kubota) এবং মিন্ডা করপোরেশন (Minda Corporation) -এর মতো সংস্থার বিনিয়োগের পরিকল্পনা এই অঞ্চলের শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাকে আরও বাড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংস্থাগুলির প্রকল্পের মাধ্যমে বহু কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক, প্রকল্পের নির্মাণের অগ্রগতি এবং বাস্তবে কত জনের কাজ হবে, তা সংস্থাগুলির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সরকারি নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। জাপান সিটি চালু হলে এই ধরনের শিল্পপ্রকল্পের সঙ্গে সরবরাহকারী সংস্থা, পরিবহণ পরিষেবা, যন্ত্রাংশ নির্মাতা এবং ছোট ব্যবসার সংযোগ বাড়তে পারে। বড় কারখানার আশপাশে সাধারণত প্যাকেজিং, মেরামত, গুদাম পরিচালনা, খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য পরিষেবার চাহিদা তৈরি হয়। ফলে প্রকল্পটির প্রভাব শুধু সরাসরি কারখানার চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। উত্তর প্রদেশ সরকার জাপানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে। এর জন্য রাজ্যের সড়ক যোগাযোগ, শিল্প জমি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উৎপাদন পরিকাঠামোকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ৭৫ হাজার একরের বেশি শিল্প জমির ব্যাংক রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শিল্প জমির ব্যাংক বলতে সাধারণত ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকারীদের জন্য চিহ্নিত বা সংরক্ষিত জমির তালিকাকে বোঝানো হয়। এই ধরনের ব্যবস্থা থাকলে নতুন প্রকল্পের জন্য জমি খোঁজা ও প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরির কাজ সহজ হতে পারে। পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ের পাশে শিল্পাঞ্চল ও লজিস্টিকস কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে পণ্য পরিবহণের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে জমির পরিমাণের পাশাপাশি জমির বাস্তব প্রাপ্যতা, অনুমোদন, বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ এবং অন্যান্য নাগরিক পরিকাঠামোর অবস্থাও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
জাপান সিটি প্রকল্পের আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে উত্তর প্রদেশের শিল্পক্ষেত্রকে কয়েকটি প্রচলিত খাতের বাইরে আরও বিস্তৃত করা। অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এলে রাজ্যের উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। জাপানি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদিও বিনিয়োগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন ও বাজারের পরিস্থিতির ওপর। স্থানীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পও বড় সংস্থার সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে নতুন ব্যবসা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রকল্পের সাফল্য বিচার করতে বাস্তব বিনিয়োগ, উৎপাদন শুরু এবং কর্মসংস্থানের তথ্যের দিকে নজর রাখতে হবে।
যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে করিডোরকে ঘিরে শিল্পনগরী, বিমানবন্দর, আবাসন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন উত্তর প্রদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। এই অঞ্চলে নতুন শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে। জাপান সিটি সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে প্রকল্প ঘোষণার পর জমি উন্নয়ন, নির্মাণ, বিনিয়োগকারীদের চুক্তি ও নাগরিক পরিষেবা চালুর মতো একাধিক ধাপ পেরোতে হবে। তাই এই উদ্যোগের প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য সরকারি অগ্রগতির তথ্য ও সংস্থাগুলির বিনিয়োগের ঘোষণা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আপাতত যোগী সরকারের লক্ষ্য, জাপানি সংস্থাগুলিকে উত্তর প্রদেশে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করা এবং শিল্পের পাশাপাশি কর্মীদের বসবাসের উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জেওয়ার বিমানবন্দর সংলগ্ন অঞ্চল নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal four new airport | UDAN airport project West Bengal, Kolkata Europe direct flight : কলকাতা থেকে ইউরোপের আকাশপথ ফের খোলার উদ্যোগ, বাংলার চার প্রান্তে নতুন বিমানবন্দর তৈরিতে বড় পদক্ষেপ




