সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ স্টকহোম: কখনও দ্রুত বাড়ে অর্থনীতি, কখনও আবার মন্দার ধাক্কায় কমে যায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের খরচ করার ক্ষমতা। এই উত্থান-পতন সামলাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক কীভাবে সঠিক সময়ে পদক্ষেপ করবে, তার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি পেলেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ। ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার (Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel) দেওয়া হয়েছে রবার্ট ই. হল (Robert E. Hall) ও মাইকেল উডফোর্ডকে (Michael Woodford)। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয়, ব্যক্তিগত পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কীভাবে গোটা অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে এবং সেই বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়ে মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। ১২ অক্টোবর রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস (Royal Swedish Academy of Sciences) এই পুরস্কার ঘোষণা করেছে। দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণার জন্য যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তার মূল কথা হল সামষ্টিক অর্থনীতির বড় ছবিকে বুঝতে হলে ব্যক্তিগত স্তরের সিদ্ধান্তগুলিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কোনও দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন, সুদের হার, সঞ্চয় ও ভোগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানগুলির পারস্পরিক যোগসূত্র দেখলেই অর্থনীতির প্রতিটি পরিবর্তনের কারণ জানা যায় না। পরিবার কীভাবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে খরচ কমায় বা সঞ্চয় বাড়ায়, ব্যবসায়িক সংস্থা কীভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে ও সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ঘোষণায় তাদের সিদ্ধান্ত কতটা বদলায়, এই বিষয়গুলি বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা বোঝার নতুন পথ তৈরি হয়েছে।
রবার্ট ই. স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (Stanford University) অধ্যাপক। ১৯৪৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টোতে তাঁর জন্ম। ১৯৬৭ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Massachusetts Institute of Technology বা MIT) থেকে তিনি পিএইচডি করেন। অন্য দিকে, মাইকেল উডফোর্ডের জন্ম ১৯৫৫ সালে ম্যাসাচুসেটসের চিকোপিতে। ১৯৮৩ সালে এমআইটি থেকেই তিনি পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (Columbia University) অধ্যাপক। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে তাঁদের গবেষণাকে পুরস্কারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি। উল্লেখ্য, অর্থনীতির ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes) মন্দা মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় আর অর্থনৈতিক চাহিদা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাধারণভাবে মন্দার সময় সুদের হার কমানো, সরকারী ব্যয় বাড়ানো কিংবা করের চাপ কমানোর মতো পদক্ষেপ মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ বাড়াতে পারে। তার ফলে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ও কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ হয়। বিপরীতে, অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মূল্যবৃদ্ধি বাড়তে থাকলে সুদের হার বৃদ্ধি বা সরকারি ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি তৈরি করা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার ফল নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের উপর। ১৯৭০ -এর দশকে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও একাধিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে পশ্চিমের বহু দেশে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও দুর্বল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সমস্যা দেখা দিয়েছিল। প্রচলিত কেইনসীয় মডেল দিয়ে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মধ্যে নীতিগত টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অর্থনৈতিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ে। রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সামষ্টিক অর্থনীতির মডেল তৈরির ক্ষেত্রে পরিবার ও সংস্থার আচরণকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া। অর্থনীতির সামগ্রিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজার পাশাপাশি তাঁরা দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলির পিছনে থাকা যুক্তি বোঝা জরুরি। পরিবার আজ কতটা খরচ করবে, কতটা সঞ্চয় করবে, ভবিষ্যতে আয় বাড়বে না কমবে বলে মনে করছে, এসব প্রত্যাশা তাদের বর্তমান সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একইভাবে কোনও সংস্থা ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ, চাহিদা এবং সুদের হার কী হতে পারে, সেই ধারণার ভিত্তিতে পণ্যের দাম ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই প্রত্যাশার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি ভবিষ্যতের করনীতি বা ব্যয় পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য ঘোষণা করে, কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুদের হার নিয়ে নিজের অবস্থান জানায়, তা পরিবার ও ব্যবসায়িক সংস্থার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যদি মনে করে ভবিষ্যতে আয় ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি উন্নত হবে, তবে তারা খরচ বাড়াতে পারে। অন্য দিকে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবার সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে ও সংস্থা নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে দিতে পারে। ফলে নীতিনির্ধারকদের ঘোষণার পাশাপাশি সেই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অর্থনৈতিক ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই ধরনের গবেষণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নতুন কেইনসীয় মডেল (New Keynesian Models) বর্তমানে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ও অর্থ মন্ত্রকের নীতি নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়। সুদের হার পরিবর্তন, সরকারী ব্যয় বৃদ্ধি বা হ্রাস এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিশ্লেষণে এই মডেলগুলি সহায়তা করে। অবশ্য মডেল কোনও দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে না। বাস্তব পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানির দাম, যুদ্ধ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো ঘটনাও অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। তবে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিচার করে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই গবেষণা কার্যকর তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে।
পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার (John Hassler) জানিয়েছেন, দুই বিজয়ীর গবেষণা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ও সরকারের হাতে অর্থনীতির আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর জন্য আরও কার্যকর বিশ্লেষণী কাঠামো তুলে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হল, জ্বালানির বাজারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা পরিবারের ভোগব্যয়ে হঠাৎ ওঠানামার মতো ঘটনা অর্থনীতিকে দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নীতি নির্ধারণের আগে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি বিচার করা জরুরি। বিশ্ব অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অতিমারি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। এই ধরনের সঙ্কটে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। হল ও উডফোর্ডের গবেষণার গুরুত্ব এখানেই, অর্থনীতির বিভিন্ন অংশের আচরণ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা বিচার করে নীতির প্রভাব আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁদের গবেষণার অর্থ এই নয় যে মন্দা বা মূল্যবৃদ্ধি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। বরং যথাযথ সময়ে পদক্ষেপ করে অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা এবং স্থায়িত্ব কমানোর সম্ভাবনা বাড়ানো যায়।
২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ডের মধ্যে এই অর্থ সমান ভাগে বণ্টন করা হবে। উল্লেখ্য, অর্থনীতির এই পুরস্কারটি আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে থাকা পাঁচটি পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের উদ্যোগে ১৯৬৮ সালে এটি প্রবর্তিত হয় আর ১৯৬৯ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে। তবু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গবেষণায় অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে এর গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু, রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ডের সম্মানপ্রাপ্তি তাই শুধু দুই গবেষকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে মানুষের আচরণ, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের পারস্পরিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে এই পুরস্কার। মন্দার সময়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা কিংবা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে চাহিদার চাপ কমানো, এই দুই ক্ষেত্রেই নীতির সময় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের গবেষণা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করার তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nobel Peace Prize 2026 Awarded to Navi Pillay Indian Origin South African Jurist for International Law | নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৬ পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার নবমীতম নবি পিল্লাই, আন্তর্জাতিক আইনে অবদানের স্বীকৃতি




