সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা ★ ১০ অক্টোবর ২০২৬ : আজ মহালয়া (Mahalaya)। ভোরের আকাশে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (Birendra Krishna Bhadra) -এর কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী (Mahishasuramardini) শুনে বাঙালির ঘুম ভাঙল। পিতৃপক্ষের (Pitri Paksha) অবসান আর দেবীপক্ষের (Devi Paksha) সূচনার এই পুণ্য তিথিতেই শুরু হল দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আনুষ্ঠানিক ক্ষণ গণনা। শাস্ত্রমতে আজই দেবী দুর্গা (Devi Durga) মহিষাসুর (Mahishasura) বধের জন্য মর্ত্যে আবির্ভূতা হন, তাই এই দিনটিকে দেবীর আবাহনের দিন হিসাবেও ধরা হয়।
পুরাণ অনুযায়ী, মহালয়া শব্দটি এসেছে ‘মহৎ আলয়’ থেকে। এই দিন পিতৃপুরুষেরা মর্ত্যে আসেন উত্তরপুরুষের হাতে জল পাওয়ার আশায়। তাই ভোর থেকে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে তর্পণ (Tarpan) করার ভিড়। কলকাতার বাগবাজার (Bagbazar), আহিরীটোলা (Ahiritola), বাবুঘাট (Babughat) থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন নদীর ঘাটে আজ সকাল থেকেই পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জলদানের দৃশ্য দেখা গিয়েছে। ধুতি পরে, গঙ্গায় নেমে, কুশ হাতে মন্ত্রপাঠ করে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন অগণিত মানুষ। অনেকের বিশ্বাস, ‘এই দিনে তর্পণ করলে পিতৃদোষ কেটে যায়।’ অন্যদিকে, মহালয়া মানেই বাঙালির কাছে এক আবেগ। রেডিওতে চণ্ডীপাঠ (Chandi Path) ছাড়া এই দিন অসম্পূর্ণ। ১৯৩১ সাল থেকে আকাশবাণী কলকাতা (All India Radio Kolkata) কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত হচ্ছে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠ, পঙ্কজকুমার মল্লিক (Pankaj Kumar Mullick) -এর সুর এবং বাণীকুমার (Banikumar) -এর রচনা আজও অক্ষয়। প্রযুক্তি বদলেছে, টেলিভিশন, মোবাইল, ইউটিউব (YouTube) এসেছে, কিন্তু ভোর চারটেয় রেডিও চালিয়ে ওই কণ্ঠ শোনার ঐতিহ্য বদলায়নি। অনেক পরিবারে আজও ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে শোনে সেই সম্প্রচার।
আরও পড়ুন : Mahalaya live Akashvani | মহালয়ার ভোরে আবারও বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে কালজয়ী মহিষাসুরমর্দিনী
শাস্ত্র অনুযায়ী, আজ সর্বপিতৃ অমাবস্যা (Sarva Pitri Amavasya)। পিতৃপক্ষের শেষ দিন। এই পক্ষে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধ করা হয়। মহালয়ার দিনে তার সমাপ্তি ঘটে। এর পরের দিন প্রতিপদ (Pratipada) থেকে শুরু হয় দেবীপক্ষ। শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন রামচন্দ্র (Ramchandra), এই কারণে একে অকালবোধন (Akalbodhan) বলা হয়। রামায়ণ (Ramayana) মতে, রাবণ (Ravana) বধের আগে রাম দেবীর অকালবোধন করেছিলেন। সেই থেকেই শরৎকালে দুর্গাপুজোর প্রচলন। আবার, আজ থেকেই পুজোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। কুমোরটুলিতে (Kumartuli) চলছে দেবীর চক্ষুদান (Chakshudan)। শিল্পীরা দেবী প্রতিমার চোখ আঁকছেন। কথিত আছে, চক্ষুদানের পরেই প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। কুমোরটুলির এক শিল্পী বলেন, ‘মহালয়ার দিন চক্ষুদানের আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। এই দিন চোখ আঁকা মানেই মা জেগে উঠলেন।’ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আজ থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা আনা শুরু হবে।
মহালয়ার পর থেকেই বাতাসে পুজোর গন্ধ। বাজারে ভিড় বেড়েছে। নতুন জামাকাপড় কেনার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) ও প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যে যান নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। রেল (Rail) এবং মেট্রো (Metro) পরিষেবায় ভিড় সামলানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি আচার। অনেক বাড়িতে আজ নিরামিষ আহার করা হয় ও দেবীর নামে সংকল্প নেওয়া হয়। দুর্গাপুজোর বাকি আর মাত্র ছয় দিন। আগামী ষষ্ঠী (Shashthi) থেকে শুরু হবে মূল পুজো। কিন্তু বাঙালির কাছে পুজো শুরু হয়ে যায় আজ থেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সকাল থেকেই মহালয়ার শুভেচ্ছা, পুরোনো দিনের রেডিয়োর ছবি, গঙ্গার ঘাটের তর্পণের ছবি ভাইরাল হয়েছে। আসলে, মহালয়া শুধু একটি তিথি নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বড় অনুভূতি। পিতৃপুরুষকে স্মরণ করা ও একই সঙ্গে শক্তিরূপিণী দেবীকে আবাহন করা, এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই মহালয়ার তাৎপর্য। ভোরের শিউলি, কাশফুলের দোলা, ঢাকের বাদ্যির অপেক্ষা, এসব মিলিয়ে আজ থেকেই শুরু হল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Durga Puja 2025, Punya Mati | দুর্গাপুজো ২০২৫: দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরিতে কেন লাগে যৌনকর্মীর উঠোনের মাটি?



