সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বিধানসভা উপনির্বাচন ঘিরে মঙ্গলবার দিনভর রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রে থাকল নন্দীগ্রাম (Nandigram) ও রেজিনগর (Rejinagar)। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সামনে এল দুই কেন্দ্রের প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদানের পরিসংখ্যান। নন্দীগ্রামে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৭৯.৩৯ শতাংশ, রেজিনগরে সেই হার ৭৮.৪২ শতাংশ। ভোটদানের হার নিয়ে একদিকে শাসক-বিরোধী শিবিরের নানা দাবি, অন্যদিকে একাধিক বুথে অনিয়ম, এজেন্টকে বের করে দেওয়া, বুথ দখল এবং ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দলগুলি। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর, দুই কেন্দ্রেই পুনর্নির্বাচনের দাবি পর্যন্ত উঠেছে। যদিও বিজেপি সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই হয়েছে। এই উপনির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রতীক, মনোনয়ন এবং দলীয় অবস্থান সহ একাধিক বিষয় নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চর্চার কেন্দ্রে ছিল নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে (Milan Pradhan) সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর (Mamata Banerjee) শিবির। অন্যদিকে, রেজিনগরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী নির্বাচন ঘিরেও নানা নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শুরু হলেও আগের কয়েক দিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের রেশ ছিল দুই কেন্দ্রেই।
নন্দীগ্রামে ভোট দিয়ে বিজেপি নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জয়ের ব্যবধান নিয়ে বড় প্রত্যাশার কথা জানান। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তাঁর প্রায় ৮২ হাজার ভোটের ব্যবধানের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এবারের ভোটে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ (Hasirani Rath) সেই ব্যবধান ছাপিয়ে যেতে পারেন। ভোটের হার নিয়েও আশাবাদী ছিলেন শুভেন্দু। উপনির্বাচনে সাধারণত ভোটের হার তুলনামূলক কম হলেও এবার নন্দীগ্রামে ভোটদানের হার অনেকটা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। দিনের শেষে ভোটের পরিসংখ্যানও সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ভোটের সিংহভাগ কার দিকে গিয়েছে, তা জানা যাবে গণনার পর।
ভোটগ্রহণ চলাকালীন অবশ্য নন্দীগ্রামে বিরোধীদের তরফে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। কংগ্রেসের দাবি, কয়েকটি বুথে তাদের পোলিং এজেন্টদের বসতে দেওয়া হয়নি। সোনাচূড়ার ভাঙাবেড়া এলাকার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর বুথে এজেন্ট বসানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার অভিযোগ ওঠে। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। তাঁর দাবি, দলীয় এজেন্টদের বুথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভোটপ্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছে। মিলনের অভিযোগকে ঘিরে বিজেপির পাল্টা বক্তব্যও সামনে আসে। বিজেপির স্থানীয় কর্মীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বুথগুলিতে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট থাকার মতো সংগঠনই ছিল না। সেই সূত্রেই কংগ্রেস প্রার্থীকে কটাক্ষ করে বলা হয়, ‘প্লেয়ারই নেই, খেলবেন কী?’ পাল্টা মিলনের বক্তব্য ছিল, ভোটের মাঠে প্রথম থেকেই সব জায়গায় কর্মী-সমর্থক থাকে না, সময়ের সঙ্গে সংগঠন তৈরি হয়। এই কথাকাটাকাটি ঘিরে কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর সামনে আসেনি।
নন্দীগ্রামের আরও কয়েকটি বুথ নিয়েও অভিযোগ করেছে কংগ্রেস। কালীচরণপুরের ২৪১ ও ২৪২ নম্বর বুথে অবৈধ জমায়েত সরাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নামতে হয়েছিল বলে অভিযোগ। স্থানীয় কয়েক জন মহিলা দাবি করেন, তাঁদের ভোটার স্লিপ নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কেন্দামারি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ২৩৪ নম্বর বুথ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। যদিও প্রশাসনের তরফে অভিযোগগুলির প্রতিটি বিষয়ে পৃথক করে কোনও সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। ভোটের দিন নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের এক ব্লক সভাপতিকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। কংগ্রেসের দাবি, আশরাফুল তুল্লাকে (Ashraful Tulla) অন্যায় ভাবে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকেও ভোটের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছে কংগ্রেস। অন্যদিকে, পুলিশি পদক্ষেপের কারণ নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্যই শেষ কথা হবে বলে বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে।
রেজিনগরের পরিস্থিতি অবশ্য সকাল থেকেই আলাদা মাত্রা পায়। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান এবং নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir) ভোটগ্রহণের দিন পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। নিজের দলীয় অবস্থান থেকে বিজেপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি ছিল, রেজিনগরে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের জরুরি অবস্থার তুলনাও টানেন তিনি। পরে নির্বাচনী বিধিভঙ্গ, পুলিশকে হুমকি এবং সমর্থকদের উত্তেজিত করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। হুমায়ুনের গ্রেফতারির পরেও রেজিনগরের রাজনৈতিক উত্তাপ কমেনি। তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদ (Gholam Nabi Azad) এই উপনির্বাচনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই তিনি দাবি করেন, ফল নিয়ে তাঁর আর কোনও উদ্বেগ নেই। তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত ছিল, রেজিনগরের মানুষ কোন দিকে রায় দিয়েছেন, তা তিনি বুঝে গিয়েছেন। এমনকী ফলপ্রকাশের দিন তিনি গণনাকেন্দ্রে না যাওয়ার কথাও জানান।
রেজিনগরে দুপুর গড়াতেই বিরোধী দলগুলির অভিযোগ আরও জোরাল হয়। তৃণমূলের দুই শিবির, কংগ্রেস ও সিপিএম প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন বুথে অনিয়মের অভিযোগ তোলে। কোথাও পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়ার দাবি, কোথাও বুথে নির্দিষ্ট একটি দলের এজেন্টকেই বসতে দেওয়ার অভিযোগ এবং কোথাও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ওঠে। রেজিনগরের তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী (Rabiul Alam Chowdhury) একাধিক বুথে দলের এজেন্টদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি পুনর্নির্বাচনের দাবিও জানান। ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখও (Shafiuzzaman Sheikh) একই ধরনের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, বেশ কয়েকটি বুথে গিয়ে তিনি দেখেছেন, দলের এজেন্টদের সরিয়ে সেখানে শুধু বিজেপির এজেন্টদের বসতে দেওয়া হয়েছে। ওই অভিযোগের পাশাপাশি আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগের আঙুল তোলেন।
কংগ্রেসও রেজিনগরে ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি (Abdullahil Kafi) ভোটের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন। তাঁর দাবি, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট হচ্ছে না। সেই কারণে ভোট বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন করার দাবি জানান তিনি। পরে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury) -এর নেতৃত্বে জেলাশাসকের দফতরের সামনে প্রতিবাদ মিছিলও হয়। সিপিএমের তরফেও রেজিনগরের কয়েকটি বুথ নিয়ে অভিযোগ করা হয়। দলের দাবি, তাঁদের পোলিং এজেন্টদের বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট ও এজেন্ট সরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়। তবে ভোটের দিনের ঘটনাপ্রবাহে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সামনে আসেনি।
বিরোধীদের সমস্ত অভিযোগই অবশ্য খারিজ করেছে বিজেপি। দলের বক্তব্য, ভোটগ্রহণ অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে। বিরোধীরা পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে বিজেপির দাবি। দুই কেন্দ্রেই দল জিতবে বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। নন্দীগ্রামে হাসিরানি রথ বড় ব্যবধানে জিতবেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। রেজিনগর নিয়েও বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের প্রত্যাশা যথেষ্ট বেশি। ফলে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর থামেনি। একদিকে প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদানের হার, অন্যদিকে ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের একাধিক অভিযোগ, দুই কেন্দ্রের ফলাফল ঘিরে কৌতূহল আরও বেড়েছে। বিরোধীদের দাবি কতটা কার্যকর হয়, পুনর্নির্বাচনের কোনও সিদ্ধান্ত আসে কি না, এবং শেষ পর্যন্ত ইভিএমে ভোটারদের রায় কোন দলের পক্ষে যায়, তার উত্তর মিলবে গণনার দিন। আপাতত নন্দীগ্রামে বড় ব্যবধানে জয়ের দাবি করছে বিজেপি, আর রেজিনগরে ফল নিজেদের পক্ষে যাবে বলে প্রত্যাশা জানাচ্ছে একাধিক শিবির। ভোটের হার ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে, এবার লক্ষ্য গণনার ফলের দিকে।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Donald Trump | India US relations : নরেন্দ্র মোদী-ট্রাম্পের ফোনালাপে বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা থেকে প্রযুক্তি, আঞ্চলিক শান্তি নিয়েও আলোচনা




