সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor), যা ‘চিকেন নেক’ (Chicken’s Neck) নামে পরিচিত, সেই করিডোরকে ঘিরে প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। মাটির উপরে থাকা সামরিক পরিকাঠামোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা গড়ে তুলে গুরুত্বপূর্ণ মজুত, যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে আরও সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা এবং অন্য একটি ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো প্রকল্পে প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা খরচের কথা উঠে এসেছে। তবে এই পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার সব দিক নিয়ে এখনও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা প্রকাশ্যে আসেনি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে। উত্তরবঙ্গের এই সরু ভূখণ্ড দেশের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যের স্থল যোগাযোগের প্রধান পথ। সবচেয়ে সরু অংশে করিডোরটির প্রস্থ প্রায় ২২ কিলোমিটার। অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম এবং ত্রিপুরার সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগে এই পথের ভূমিকা রয়েছে। করিডোরের চারপাশের ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত সংবেদনশীল, একদিকে নেপাল ও ভুটান, অন্যদিকে বাংলাদেশ এবং উত্তরে হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল।

এই অবস্থার মধ্যে ভূগর্ভস্থ প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোর পরিকল্পনা সামনে আসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, পরিকল্পিত ব্যবস্থার মধ্যে ১২টি ভূগর্ভস্থ এয়ার ডিফেন্স গোলাবারুদ সংরক্ষণ পরিকাঠামো ও স্মার্চ (Smerch) ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘপাল্লার গোলাবারুদের জন্য একটি ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণস্থল রয়েছে। এর সঙ্গে ২১টি মাটির উপরের দীর্ঘপাল্লার গোলাবারুদ স্থাপনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু গোলাবারুদ সংরক্ষণ নয়, সামরিক যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেও ভূগর্ভস্থ কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে পাঁচটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ছয়টি যোগাযোগ কেন্দ্র, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ পরিকাঠামো এবং বোমা আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই অংশের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই প্রকল্পের ব্যয় একত্র করলে অঙ্কটি দাঁড়ায় প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকা।
ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো তৈরির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে সামরিক স্থাপনার সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়টি উঠে এসেছে। মাটির উপরের কোনও নির্দিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প সুরক্ষিত কাঠামোর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সংকীর্ণ করিডোরে পরিকাঠামোর স্থায়িত্ব ও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ। চিকেন নেক নিয়ে কেন্দ্রের পরিকল্পনা অবশ্য শুধু সামরিক স্থাপনা তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। রেল যোগাযোগকেও এই অঞ্চলে আরও নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) ২০২৬ সালের মার্চে জানিয়েছিলেন, শিলিগুড়ি করিডোরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ ডাবল-লাইন রেল করিডোরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রেল মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতেও যাতে যোগাযোগ সচল রাখা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই প্রকল্পের পরিকল্পনা।
এর আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় সরকারের এক ঘোষণাতেও উত্তরবঙ্গের চিকেন নেক অংশে ভূগর্ভস্থ রেল করিডোর তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল। রেল মন্ত্রকের তরফে এটিকে কৌশলগত ভাবে নিরাপদ পরিবহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত ও দুর্গম অঞ্চলে রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও এগোচ্ছে বলে কেন্দ্র জানিয়েছে। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিকল্প পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। গোরক্ষপুর-শিলিগুড়ি করিডোরের বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন বা ডিপিআর তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে বলে ২০২৪ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক জানিয়েছিল। ফলে উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একাধিক সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
শিলিগুড়ি করিডোরের গুরুত্ব শুধু সেনা চলাচল বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজার, পণ্য পরিবহণ, পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন বাণিজ্যিক যোগাযোগের সঙ্গেও এই পথের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনও কারণে এই করিডোরের যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে তার প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সাধারণ পরিবহণ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে। সরকারি ও নীতিগত আলোচনায় তাই এই অঞ্চলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির বিষয়টি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। চিকেন নেককে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগের আরও একটি দিক হল সামরিক উপস্থিতি ও পরিকাঠামোর বিস্তার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শিলিগুড়ি করিডোরের আশপাশে নতুন সামরিক গ্যারিসন তৈরির বিষয়টি সামনে এসেছিল। সেখানে করিডোরকে ঘিরে সেনার উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগের কথা বলা হয়।
আরও পড়ুন : Richa Ghosh | বিশ্বজয়ী রিচা ঘোষে শিলিগুড়িতে পদার্পণ, মেয়েদের খেলাধুলায় তাঁর আহ্বান
২০২৬ সালের আগস্টেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়। ওই বৈঠকে করিডোর এলাকায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির উপস্থিতি বাড়ানো, দখলদারি রোধ এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির প্রতিনিধিরাও বৈঠকে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে শিলিগুড়ি করিডোরকে ঘিরে যে পরিকাঠামোগত ভাবনা সামনে আসছে, তার পরিসর বেশ বড়। ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা, ভূগর্ভস্থ রেলপথ, বিকল্প সড়ক যোগাযোগ, রেল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিকাঠামো, বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে ২৯৭ কোটি ও ২৩৭ কোটি টাকার নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন, সময়সীমা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত প্রকল্পগুলির চূড়ান্ত রূপ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
শিলিগুড়ি করিডোরের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে পরিণত করেছে। এখন সেই পথকে ঘিরে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিকল্প যোগাযোগের পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা এগোচ্ছে। রেল মন্ত্রকের ৩০ কিলোমিটারের ভূগর্ভস্থ ডাবল-লাইন প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং সড়ক যোগাযোগের নতুন করিডোরের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের সংযোগকে একটিমাত্র পথের উপর নির্ভরশীল না রেখে একাধিক স্তরে শক্তিশালী করার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। চিকেন নেকের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন এই পরিকল্পনাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত রূপ পায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিকল্প রেল-সড়ক যোগাযোগের কাজ সম্পূর্ণ হলে উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ কাঠামোয় তার প্রভাব পড়বে। আপাতত কেন্দ্রের পরিকল্পনায় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হল, শিলিগুড়ি করিডোরকে শুধু পাহারা দিয়ে নয়, বহুমুখী পরিকাঠামোর মাধ্যমে আরও স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Raiganj to Siliguri Greenfield Corridor | রায়গঞ্জ থেকে শিলিগুড়ি যেতে আর কিষাণগঞ্জ নয়! বাংলার বুকেই তৈরি হচ্ছে ২৫ কিমির ৪ লেন গ্রিনফিল্ড করিডোর




