সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : যে পদকটির জন্য এক যুগ ধরে অপেক্ষা, বার বার ধাক্কা খেয়েও যে মঞ্চের স্বপ্ন ছাড়েননি, শেষ পর্যন্ত সেই এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামেই উঠলেন মীরাবাই চানু (Mirabai Chanu)। বুধবার আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস (Aichi-Nagoya Asian Games 2026)-এর ভারোত্তোলনে মহিলাদের ৪৯ কেজি বিভাগে রুপো জিতে নিজের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন ভারতের তারকা ভারোত্তোলক। মোট ১৯৮ কেজি ওজন তুলে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন তিনি। এর ফলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পদক-সংগ্রহই পূর্ণ হল না, এশিয়ান গেমসে ভারতীয় ভারোত্তোলনের দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষাও শেষ হল।
মীরাবাইয়ের সামনে এদিন শুরু থেকেই কঠিন লড়াই ছিল। স্ন্যাচ পর্বে প্রথমে ৮৩ কেজি ওজন তোলেন তিনি। পরের প্রয়াসে ৮৫ কেজি এবং তার পরে ৮৭ কেজি সফল ভাবে তোলেন। প্রথম পর্বের শেষে তিনি তৃতীয় স্থানে ছিলেন। ফলে রুপোর লড়াইয়ে জায়গা করে নিতে ক্লিন অ্যান্ড জার্কে তাঁকে বড় উত্তোলন করতে হত। সেই জায়গাতেই নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান মণিপুরের এই ভারোত্তোলক। ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১১ কেজি তুলে মোট ওজন ১৯৮ কেজিতে নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সেই পারফরম্যান্সই তাঁকে রুপো এনে দেয়। সোনা অবশ্য ভারতের নাগালের বাইরে চলে যায় উত্তর কোরিয়ার রি সং গামের (Ri Song Gum) দুরন্ত পারফরম্যান্সে। ৪৯ কেজি বিভাগে তিনি মোট ২১৫ কেজি ওজন তোলেন।
স্ন্যাচে ৯৪ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১২১ কেজি তুলে শুধু সোনা নিশ্চিতই করেননি, তিনটি বিশ্বরেকর্ডও গড়েছেন। এই জয়ের সঙ্গে এশিয়ান গেমসে টানা তৃতীয় বার সোনা জয়ের নজির গড়লেন রি। অন্যদিকে, মীরাবাইয়ের ১৯৮ কেজির পারফরম্যান্স ও রি-র ২১৫ কেজির মধ্যে ব্যবধান যথেষ্ট বড় হলেও ভারতের জন্য এ দিনের রুপোর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। কারণ ১৯৯৮ সালের পর এশিয়ান গেমসে ভারোত্তোলন থেকে আর কোনও ভারতীয় পদক পাননি। ১৯৯৮ সালের ব্যাংকক এশিয়াডে কর্ণম মালেশ্বরী (Karnam Malleswari) পদক জিতেছিলেন। দীর্ঘ সময় পরে সেই ধারায় ফের পদক এল মীরাবাইয়ের হাত ধরে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মীরাবাইয়ের এই রুপোকেই ২৮ বছর পর এশিয়ান গেমসে ভারতের ভারোত্তোলন পদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মীরাবাইয়ের নিজের কাছেও তাই এই রুপো স্রেফ আর একটি পদক নয়। তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে অলিম্পিক্স, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পদক থাকলেও এশিয়ান গেমসের পোডিয়াম এত দিন অধরাই ছিল। ২০১৪ সালের এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে তিনি নবম স্থানে শেষ করেছিলেন। ২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসে চোটের কারণে নামতে পারেননি। তার পরে ২০২৩ সালের এশিয়ান গেমসে আবার সুযোগ এলেও চতুর্থ হয়ে পদক থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে থামতে হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার পর এ বার আর খালি হাতে ফিরতে হল না তাঁকে।
মীরাবাইয়ের আন্তর্জাতিক পদকের তালিকা ইতিমধ্যেই দীর্ঘ। টোকিয়ো অলিম্পিক্সে (Tokyo Olympics) রুপো জেতার পাশাপাশি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি পদক রয়েছে তাঁর, যার মধ্যে সোনাও আছে। কমনওয়েলথ গেমস এবং কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপেও একাধিক পদক রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেও পদক এসেছে। কিন্তু এত সাফল্যের পরেও একটি বড় ঘাটতি থেকে গিয়েছিল, এশিয়ান গেমসের পদক। নাগোয়ার মঞ্চে রুপো জিতে সেই জায়গাটিও পূর্ণ করলেন তিনি। এই পদকের জন্য মীরাবাইয়ের অপেক্ষা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। ২০১৪ সালের এশিয়ান গেমস থেকেই তিনি এই প্রতিযোগিতায় পদক জয়ের চেষ্টা করে আসছিলেন। একবার চোট, একবার প্রত্যাশামতো ফল না পাওয়া, বিভিন্ন কারণে তাঁর এশিয়াড অভিযান বার বার থমকে গিয়েছে। ২০২৩ সালে চতুর্থ হওয়ার পরে আরও এক বার প্রশ্ন উঠেছিল, আদৌ কি এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে উঠতে পারবেন মীরাবাই? বুধবারের পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। এদিনের প্রতিযোগিতায় আরও একটি দিক মীরাবাইয়ের পারফরম্যান্সকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। স্ন্যাচের পরে তৃতীয় স্থানে থাকা অবস্থায় তাঁকে পরের পর্বে নিজের সেরাটা দিতে হয়েছে। ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১১ কেজি ওজন তুলে মোট ১৯৮ কেজিতে পৌঁছে রুপো নিশ্চিত করেন মীরা। অর্থাৎ প্রথম পর্বে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় পর্বে নিজের অবস্থান বদলে পোডিয়ামে জায়গা করে নেন ভারতের অভিজ্ঞ ভারোত্তোলক।
অন্য দিকে, রি সং গামের পারফরম্যান্সও প্রতিযোগিতার মানকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ৯৪ কেজির স্ন্যাচের পরে ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১২১ কেজি তোলেন উত্তর কোরিয়ার ভারোত্তোলক। মোট ২১৫ কেজির এই উত্তোলন আগের বিশ্বরেকর্ডের তুলনায় ৭ কেজি বেশি। তাঁর এই সাফল্যের ফলে উত্তর কোরিয়াও এ বারের এশিয়ান গেমসে প্রথম সোনা পেল। উল্লেখ্য, মীরাবাইয়ের কাছে অবশ্য প্রতিযোগিতার পরে ভবিষ্যতের হিসাবের চেয়ে বর্তমান মুহূর্তটাই বড় হয়ে উঠেছে। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সের (Los Angeles Olympics 2028) দিকে তাঁর যাত্রা কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে এখনই কোনও চূড়ান্ত পরিকল্পনা করতে চাইছেন না তিনি। অলিম্পিক্সের যোগ্যতা অর্জন পর্ব ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা। আপাতত এশিয়ান গেমসের বহু প্রতীক্ষিত পদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান ভারতের তারকা ভারোত্তোলক।
মীরাবাইয়ের এই সাফল্যের পরে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তাঁর তরফে মীরাবাইয়ের এশিয়ান গেমসের রুপো জয়ের প্রশংসা করা হয়েছে ও তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সাফল্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও (Droupadi Murmu) মীরাবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মীরাবাইয়ের এ দিনের রুপো জয় ব্যক্তিগত অপেক্ষার সমাপ্তির পাশাপাশি ভারতীয় ভারোত্তোলনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ১৯৯৮ সালে কর্ণম মালেশ্বরীর পদকের পরে যে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়েছিল, তা ভাঙলেন মীরাবাই। নিজের কেরিয়ারের যে একমাত্র বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে এত দিন পদক ছিল না, সেখানেও এবার জায়গা করে নিলেন মীরা।
মীরা কেরিয়ারের দিকে তাকালে এই অপেক্ষার দৈর্ঘ্য আরও ভাল ভাবে বোঝা যায়। অলিম্পিক্সের পোডিয়াম, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সাফল্য, কমনওয়েলথের একাধিক পদক অর্জনের পরও এশিয়ান গেমসের পদকটি থেকে গিয়েছিল অধরা। ২০১৪-তে নবম, ২০১৮-তে চোটের কারণে অনুপস্থিতি এবং ২০২৩-এ চতুর্থ স্থান, তিনটি আলাদা অধ্যায় পেরিয়ে অবশেষে ২০২৬-এর নাগোয়া তাঁকে সেই কাঙ্ক্ষিত পদক দিল। সামনে এখন নতুন লক্ষ্য। ডিসেম্বরে শুরু হতে চলা অলিম্পিক্স যোগ্যতা অর্জন পর্ব মীরাবাইয়ের পরবর্তী বড় পরীক্ষা। তবে সেই লড়াইয়ের আগে তাঁর হাতে রয়েছে এমন একটি পদক, যার জন্য দীর্ঘ ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছেন তিনি। এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে রুপো হাতে দাঁড়িয়ে মীরাবাই যেন নিজের কেরিয়ারের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের শেষ টানলেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women vs Japan Asian Games 2026, India women semi final Asian Games | ব্যাট হাতে নামতেই হল না হরমনপ্রীত-স্মৃতিকে, ৫ ওভারে জাপানকে উড়িয়ে এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ভারত




