প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : বলিউডের দুই তারকার নাম পাশাপাশি এলেই বহু পুরনো একটি অধ্যায়ের কথা মনে পড়ে যায়। এক দিকে সালমান খান (Salman Khan), অন্য দিকে বিবেক ওবেরয় (Vivek Oberoi)। দু’জনের সম্পর্কের ইতিহাসে রয়েছে তীব্র সংঘাত, প্রকাশ্য অভিযোগ ও দীর্ঘ সময় ধরে চলা নানা আলোচনা। সেই বিবেক ওবেরয়ই এ বার সলমন খানের একটি বক্তব্যের পাশে দাঁড়ালেন। তবে কোনও পুরনো ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে নয়, সমাজমাধ্যমে ট্রোলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে। আর সেই কারণেই নতুন করে চর্চায় ফিরেছে দুই অভিনেতার সম্পর্কের পুরনো পর্ব। সম্প্রতি ‘বিগ বস ২০’ (Bigg Boss 20) -এর মঞ্চে সমাজমাধ্যমে তারকাদের নিয়ে কটাক্ষের প্রবণতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সলমন। কারও অভিনয় পছন্দ না হলে তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করা এক বিষয়, কিন্তু চেহারা, বয়স, শরীর বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। নিজের চেহারা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে বলে জানান অভিনেতা। এমনকী নিজের শরীর নিয়ে করা মন্তব্যের জবাব দিতে অনুষ্ঠানের মঞ্চেই জামা খুলে নিজের শরীর দেখান সালমান।
সালমানের সেই বক্তব্যের পর বলিউডের আরও কয়েক জন তারকা তাঁর পাশে দাঁড়ান। বরুণ ধবন (Varun Dhawan), নেহা ধূপিয়া (Neha Dhupia), রোহিত শেট্টী (Rohit Shetty) এবং অন্য কয়েক জনও অনলাইনে কটাক্ষের বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। সেই তালিকায় বিবেক ওবেরয়ের নাম যুক্ত হওয়াই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, তাঁর সঙ্গে সালমনের সম্পর্কের অতীত বলিউডের বহুল আলোচিত ঘটনাগুলির একটি। মঙ্গলবার ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বিবেক। ক্যানসার পেশেন্টস এইড অ্যাসোসিয়েশন (Cancer Patients Aid Association) -এর আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে সমাজমাধ্যমে ট্রোলিং নিয়ে কথা হয়। সলমনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রসঙ্গ উঠতেই বিবেকের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, কাউকে ট্রোল করার প্রয়োজন নেই। জীবনে করার মতো ইতিবাচক কাজের অভাব নেই, তা হলে নেতিবাচকতার মধ্যে কেন আটকে থাকতে হবে?
বিবেকের এই মন্তব্যে সালমানের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থনের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক প্রবণতা নিয়ে তাঁর অবস্থানই সামনে এসেছে। তিনি সালমানের সঙ্গে নিজের পুরনো সম্পর্কের কথা তোলেননি, অতীতের ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্যও করেননি। ট্রোলিংয়ের প্রবণতাকে নেতিবাচক বলে উল্লেখ করে মানুষের মনোযোগ অন্য দিকে ঘোরানোর কথাই বলেছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যের পর স্বাভাবিক ভাবেই দুই অভিনেতাকে ঘিরে পুরনো আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে। সম্প্রতি ‘বিগ বস ২০’-এর একটি পর্বে সলমন যে প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল সমাজমাধ্যমে তারকাদের ব্যক্তিগত চেহারা নিয়ে মন্তব্য। নিজের বয়স, ওজন ও নতুন চেহারা নিয়ে নিয়মিত কটাক্ষের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাঁর নতুন ন্যাড়া মাথার লুক নিয়েও সমাজমাধ্যমে নানা আলোচনা হয়েছিল। সালমান জানান, সেটি তাঁর একটি ছবির চরিত্রের প্রয়োজনে তৈরি করা হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র বাহ্যিক পরিবর্তন দেখে কাউকে নিয়ে মন্তব্য করার প্রবণতাকেও তিনি প্রশ্নের মুখে আনেন।
এই আলোচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন ক্যাটরিনা কাইফ (Katrina Kaif)। সন্তান জন্মের পর তাঁর চেহারা ও ওজন নিয়ে সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ শুরু হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন সলমন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সন্তান জন্মের পর শরীরে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক ও কোনও নারীকে সেই পরিবর্তনের জন্য কটাক্ষ করা উচিৎ নয়। ক্যাটরিনা যখন আবার কাজ শুরু করবেন, তখন নিজের মতো করে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগও তিনি পাবেন, এমন কথাই বলেন সালমান। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েক জন অভিনেতা-অভিনেত্রীও সমাজমাধ্যমের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
সালমান খান -এর বক্তব্যের আর একটি দিক ছিল ট্রোলারদের উদ্দেশ্যে তাঁর ক্ষোভ। তাঁর মতে, অন্যকে ছোট করে বা কটাক্ষ করে সমাজমাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন থাকা দরকার। নিজের পরিবার ও পরিচিতদের নিয়েও কুরুচিকর মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে তাই শুধু অভিনেতাদের চেহারা নিয়ে মন্তব্য নয়, অনলাইন আচরণের বৃহত্তর সংস্কৃতিও উঠে আসে। আর এখানেই বিবেকের বক্তব্যটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ, সালমান নিয়ে তাঁর নিজের অতীত একেবারেই সাধারণ নয়। ২০০৩ সালে দুই অভিনেতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল তীব্র বিতর্ক। সেই সময় সামমানের প্রাক্তন প্রেমিকা ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন (Aishwarya Rai Bachchan) -এর সঙ্গে বিবেকের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১ এপ্রিল ২০০৩ সালে বিবেক সাংবাদিক বৈঠক করে সালমানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, সালিমান ফোন করে তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন। সালমান সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ঘটনাটি তখন বলিউডে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
সেই সাংবাদিক বৈঠকের পর দুই অভিনেতার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। বিবেকের অভিনয়জীবনেও ওই সময়ের ঘটনা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তী সময়ে তিনিও ওই সাংবাদিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মসমালোচনা করেছেন। অতীতের সেই সময়কে ফিরে দেখে তিনি জানিয়েছেন, তখনকার পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখন তাঁর ভিন্ন উপলব্ধি রয়েছে। ২০২৩ সালেও পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। তাই ২০২৬ সালে এসে বিবেক যখন সালমানের ট্রোলিং-বিরোধী মন্তব্যকে সমর্থন করলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই পুরনো ইতিহাস সামনে এসেছে। তবে বিবেকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কোনও ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশের ইঙ্গিত নেই। তিনি সালমানকে নিয়ে অতীতের বিরোধের প্রসঙ্গও তোলেননি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্র ছিল অনলাইনে কাউকে আক্রমণ না করার আহ্বান।
বলিউডে তারকাদের মধ্যে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়। অনেক সময় সেই বিরোধ বহু বছর ধরে জনস্মৃতিতে থেকে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের বিভিন্ন দিকও বদলে যায়। বিবেক ওবেরয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পরিবর্তনের আলোচনাই আবার সামনে এনেছে। এক সময় যাঁদের সম্পর্ক নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল, আজ তাঁদের একজনের বক্তব্য নিয়ে অন্য জনের সঙ্গে একই বিষয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু, বিবেকের বক্তব্যকে সালমানের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার মতো কোনও মন্তব্য তিনি নিজে করেননি। তিনি শুধু ট্রোলিংয়ের বিরোধিতা করেছেন। ফলে দুই অভিনেতার ব্যক্তিগত সমীকরণ নিয়ে নতুন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেয়ে তাঁদের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছে সমাজমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও তারকাদের নিয়ে মন্তব্যের ধরন।
এক সময়ে বলিউডের দুই তারকার সংঘাতের খবর সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করেছিল। দুই দশকেরও বেশি সময় পরে সেই একই দুই নাম আবার পাশাপাশি এল, কিন্তু এবার কারণ অন্য। সালমান খান ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন, আর বিবেক ওবেরয় বললেন, ‘নেতিবাচকতার মধ্যে পড়ে থাকার চেয়ে জীবনের ইতিবাচক কাজগুলিতে মন দেওয়া ভাল।’ ব্যক্তিগত অতীতের বাইরে গিয়ে একই সামাজিক বিষয়কে ঘিরে দুই অভিনেতার বক্তব্যের এই মিলই আপাতত বলিউডে নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rashmika Mandanna injury update, Vijay Deverakonda reaction | চোটে ঘরবন্দী রশ্মিকা, স্ত্রীকে কাছে পেয়ে বিজয়ের মজার আবদার! ‘পরের বার চোট ছাড়াই ছুটি নিও’




