সম্পাদকীয়
এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রায় অনেকেই কোনও না কোনওভাবে যেন একটি করে ফাটা জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছি। যে জমি একসময় বর্ষায় নরম থাকত, এখন খরায় চৌচির। বাইরে থেকে দেখলে শুধু ফাটল চোখে পড়ে, কিন্তু ভেতরে যে এখনও জলের স্মৃতি লেগে আছে, তা কেউ খুঁজি না! আমাদের সমাজ, আমাদের সম্পর্ক, আমাদের ইতিহাসবোধ, সবকিছুতেই এই চৌচির ভাবটা স্পষ্ট। একদিকে এমন মানুষেরা আছেন, যাঁদের নাম ইতিহাস লেখে না। যাঁরা নট, করনট, ভবঘুরে, মূক, ক্ষুধার্ত, প্রান্তিক। আর সমাজের মূলস্রোতের কাছে কেবল করুণার পাত্র, কিন্তু কখনও পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃত নন। তাঁদেরও ইচ্ছে আছে, দ্বন্দ্বও আছে, নৈতিক সঙ্কট আছে। তাঁরা ভুল করেন, ভালবাসেন, লজ্জা পান। অথচ আমরা তাঁদের একটি তকমা দিয়ে সরিয়ে রাখি। যেন সভ্যতার পতন গল্পে কেবল ইট কাঠ পাথরের ধ্বংসস্তূপই গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ না! কী অদ্ভুত! আবার উল্টোদিকে আছে ক্ষুধার মতো বাস্তবতা, যেখানে ক্ষুধা, শরীরের যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণাকে আমরা সংখ্যায়, প্রকল্পে বন্দী করে ফেলি, মানুষটিকে আর দেখি না।
একই বিচ্ছিন্নতা ঘরের ভেতরেও। একটি শিশু বড় হতে হতে কখন পাগল হয়ে যায়, তার খবর কেউ রাখে না। মা থাকেন, কিন্তু দরজার ওপারেই। স্নেহ থাকে, কিন্তু ভয়ও থাকে। বারান্দায় কাঁথা মুড়ে শুয়ে থাকা একটি শরীরের দিকে তাকিয়ে আমরা পাগল বলি, কিন্তু সেই শরীর যে ছুঁচোর সঙ্গে গল্প করে, বৃষ্টির সঙ্গে প্রেম করে, কদম ফুলের ভেতর আশ্রয় খোঁজে, সেই গল্পটা আমরা শুনি না। আমাদের কাছে স্বাভাবিকতা মানে ঘরের ভেতরে থাকা, আর অস্বাভাবিকতা মানে বারান্দায় থাকা। অথচ যে ছেলেটি ভোরে নদীর ধারের কদম গাছের নিচে গিয়ে হারিয়ে যেতে চায়, সে আসলে আশ্রয়ই খুঁজছে, পালাতে চাইছে না। তার যন্ত্রণাও যন্ত্রণা, তার ভালবাসাও ভালবাসা। তার প্রেমও প্রেম। আর এই যন্ত্রণার সর্বজনীনতাই আমাদের সত্যে নিয়ে যায়। এই পোড়া ধরণীতে কেউ যন্ত্রণাহীন নয়। তাই কাউকে পুরোপুরি অসজ্জন বলে দাগিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু সত্য না। প্রত্যেকের ন্যুব্জ ঘাড়ের পেছনে একটি অনটনের ইতিহাস আছে, প্রত্যেকের কাটা ডানার পেছনে একটি নিয়ম আছে, যেখানে ডানা ছেঁটে পোষাই দস্তুর।
এই প্রেক্ষাপটে সম্পর্কের অবনতি ও বিচ্ছেদের বিষয়টি দেখা জরুরি। আজকাল সম্পর্ক ভাঙা একটি অত্যন্ত পরিপাটি গালভরা ঘটনা। শুরুতে দু’জন মানুষ সমান্তরাল হাঁটতে চায়, তারপর একসময় বোঝে সমান্তরাল রেখা কখনও মেলে না। তাই বিচ্ছেদ! নিরপেক্ষভাবে দেখলে, বিচ্ছেদ কোনও পাপ নয়, কোনও পুণ্যও নয়, এটি শুধু ব্যবস্থাপনা। দু’টি মানুষ বুঝতে পারে, একসঙ্গে থাকার চেয়ে আলাদা থাকা কম কষ্টকর। সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হল আমাদের ভঙ্গিতে। আমরা বিচ্ছেদকে এখন একটি তীর্যক সাফল্যের মতো উদযাপন করি। যেন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সেকেলে, আর ভেঙে বেরিয়ে আসাই আধুনিকতা। বাজারে যাওয়ার আগেই সুখ কেনা হয়ে যাওয়ার মতো, বিয়ের আগেই ফোনবুকে বিচ্ছেদের আইনজীবীর নম্বর সেভ করা থাকে যেন। আসলে, নিজেকে ভালবাসা জরুরি। কথাটি সত্য, কিন্তু তার অর্থ প্রায়শই দাঁড়ায়, অন্যের যন্ত্রণাটা আর না দেখা। আমরা প্রত্যেকেই নিজের ফাটা জমি নিয়ে এত ব্যস্ত যে অন্যের ফাটলের দিকে তাকানোর সময় নেই। তাই ডিভোর্স আর কোনও যন্ত্রণার ফল না, অনেক সময় এটি একটি প্রি-প্ল্যানড প্রোজেক্ট! দু’জন মানুষ খুব ভদ্রভাবে, খুব নিরপেক্ষভাবে, একে অপরকে কালিমাখানো হয়ে গেলে তা প্রমাণ করে বেরিয়ে যায়। অথচ যদি মানতাম, কেউই পুরোপুরি অসৎ না! যদি মানতাম সবারই কোথাও যন্ত্রণা আছে, তবে হয়ত বিচ্ছেদও আরেকটু কম বাঙ্গাত্মক, আরেকটু বেশি মানবিক হতে পারত। সকাল সকাল গোধূলি নেমে আসার আগেই যদি একটু আলো থাকত? কথায় আছে, সম্পর্ক গড়া সহজ টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গণিত জানা আরও জরুরি। কিন্তু এখন সম্পর্ক শিশুর খেলনার মত! কিন্তু অত্যন্ত শীতল ও চতুর। প্রেম কোথায়? দেহ! লোভ, লালসা! কলির এমনই ঘোর যে আলো আসবে কোত্থেকে? 🍁
🍁মহামিলনের কথা
মন্ত্রার্থসন্ধানপূর্বক জপ, সুক্তস্তোত্রাদি পাঠ, হরিসঙ্কীর্ত্তন, অধ্যাত্মশাস্ত্রের অভ্যাস স্বাধ্যায়ের মধ্যে পরিগণিত। এই স্বাধ্যায় সাযুজ্যমুক্তি প্রদান করে।
শুধু পুরাণে ও তন্ত্রে বলেছ! পুরাণকে এখন রূপক বলে— উপধর্ম্ম বলে। শ্রুতিতে কিছু বলেছ কি? শ্রুতির প্রমাণ না হলে অনেকে বিশ্বাস করে না।
কেন শ্রুতিতেও নামে মুক্তি হয়, এ কথা বহুবার উল্লেখ করেছি। মুক্তিকোপনিষদে বলেছি—

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
আচ্ছা, মহাপাপী যদি নাম করে তারও কি মোক্ষ হয়?
শোন্,পদ্মপুরাণে বলেছি :—
পরদাররতো বাপি পরাপকৃতিকারকঃ।
স শুদ্ধো মুক্তিমাপ্নোতি হরিনামনুকীর্ত্তনাৎ।।
পরদাররত অথবা পরাপকারী ব্যক্তিও হরিনাম কীর্ত্তনে শুদ্ধ হইয়া মুক্তি লাভ করে। নামে মুক্তি হয় সমস্ত শাস্ত্রে ঘোষণা করেছি৷
বৈশম্পায়ন সংহিতায় বলেছি : —
সর্ব্বধর্ম্মবহির্ভূতঃ সর্ব্বপাপরতস্তথা।
মুচ্যতে নাত্র সন্দেহো বিষ্ণুনামানুকীর্ত্তনাৎ।।
সর্ব্বধর্ম্ম -বহির্ভূত সর্ব্বপাপরত হইলেও বিষ্ণুনাম কীর্ত্তনে মুক্ত হয়। শুনলি? বৃহন্নারদীয় পুরাণে বলেছি :—
যথা কথঞ্চিদ্ যন্নাম্নি কীর্ত্তিতে বা শ্রুতেহপি বা।
পাপিনোহপি বিশুদ্ধাঃ স্যুঃ শুদ্ধা মোক্ষমবাপ্নুয়ুঃ।।
যে কোন প্রকারে আমার যে কোন নাম কীর্ত্তনে পাপী শুদ্ধ হইয়া মুক্তি লাভ করে ৷
এত সব পুরাণের কথা বললে!
কেন গৌতমীয় তন্ত্রে বলেছি:—-
স্বাধ্যায়ো নামমন্ত্রার্থসন্ধানপূর্ব্বকো জপঃ।
সূক্তস্তোত্রাদিপাঠস্তু হরিসংকীর্ত্তনং তথা।।
তত্ত্বাদিশাস্ত্রাভ্যাসশ্চ স্বাধ্যায়ঃ পরিকীত্তিতঃ।
মন্ত্রার্থসন্ধানপূর্বক জপ, সুক্তস্তোত্রাদি পাঠ, হরিসঙ্কীর্ত্তন, অধ্যাত্মশাস্ত্রের অভ্যাস স্বাধ্যায়ের মধ্যে পরিগণিত। এই স্বাধ্যায় সাযুজ্যমুক্তি প্রদান করে।
শুধু পুরাণে ও তন্ত্রে বলেছ! পুরাণকে এখন রূপক বলে— উপধর্ম্ম বলে। শ্রুতিতে কিছু বলেছ কি? শ্রুতির প্রমাণ না হলে অনেকে বিশ্বাস করে না।
কেন শ্রুতিতেও নামে মুক্তি হয়, এ কথা বহুবার উল্লেখ করেছি। মুক্তিকোপনিষদে বলেছি :—
দুরাচাররতো বাপি মন্নামভজনাৎ কপে।
সালোক্যমুক্তিমাপ্নোতি ন তু লোকান্তরাদিকম্।।
দুরাচাররত ব্যক্তিও আমার নাম ভজনে একলোকেবাসরূপ মুক্তিলাভ করে, লোকান্তর প্রাপ্ত হয়।
না।
কলিসন্তরণোপনিষদে বলেছি :—
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
এই ষোলটি নামই কলির পাপনাশক, ইহা হইতে শ্রেষ্ঠ উপায় আর সমস্ত বেদে দেখা যায় না। ইহার জপের কোন বিধি নাই—-
সর্ব্বদা শুচিরশুচির্বা পঠন্ ব্রাহ্মণঃ সলোকতাং সমীপতাং সরূপতাং সাযুজ্যতামেতি।
এই নাম সার্দ্ধত্রিকোটি বার জপ করলে ব্রহ্মহত্যা পাপ হইতে মুক্ত হয় ৷ স্বর্ণস্তেয় হইতে পূত হয়। পিতৃগণ, দেবগণ মনুষ্যগণের অপকার হইতে মুক্ত হয়। সর্বধর্ম্মত্যাগরূপ পাপ হইতে সদ্য শুচিত্ব প্রাপ্ত হয় ৷ সদ্য মুক্ত হয়— সদ্য মুক্ত হয় ৷
সর্ব্বশাস্ত্রে যদি এমন করে বলেছ, তবে নামে মুক্তি হয়— একথা স্বীকার করে না কেন?
ওরে এ কলিযুগ! এখন আমাকেই লোকে স্বীকার করতে চায় না, উড়িয়ে দিতে চায়; আমার নামকে উড়িয়ে দেবে— তা আর আশ্চর্য্য কি? অধুনা সবাই ব্রহ্ম :—
‘কলৌ ব্রহ্ম বদিষ্যন্তি ন করিষ্যন্তি কেচন৷’
তুই ত আমাকে উড়িয়ে দিতে চাস।
কৈ— কখন?
আচ্ছা, এবার দেখিয়ে দেব৷ শোন্— আমি উর্ধ্ববাহু হয়ে জগৎকে বলেছি— ওরে কলিপীড়িত জীব, তোরা দিবানিশি নাম -সুধারস পান কর্৷ নামে মুক্তি হয়! নামে মুক্তি হয়!! নামে মুক্তি হয়!!!
তুইও উর্ধ্ববাহু হয়ে নির্ভয়ে উচ্চকন্ঠে জগতে প্রচার কর্—
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্ ৷
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।
🍁মহারসায়ন | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
🍂সাময়িকী
১৯৪২ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘তুফানোঁ কে বীচ’ রিপোর্তাজ রচনা করেন। এই ঘটনাটি তাঁর সাহিত্যিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। তিনি কেবল বই পড়ে সমাজকে বুঝতে চাননি, বাস্তব মানুষের কাছে গিয়েছেন, তাঁদের দুর্দশা দেখেছেন, তারপর সেই অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। এই প্রত্যক্ষতার কারণে তাঁর লেখায় অনেক সময় কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি হয় না। ক্ষুধা তাঁর কাছে কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়, মানুষের শরীরের যন্ত্রণা।
ইতিহাসের পাতায় যাঁদের নাম নেই, রাংগেয় রাঘব তাঁদেরই কথাকার

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়
হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসে রাংগেয় রাঘবকে শুধু ‘বহুমুখী লেখক’ বলে চিহ্নিত করলে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্বের অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, সমালোচনা, রিপোর্তাজ প্রায় প্রতিটি সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল। কিন্তু তাঁর আসল শক্তি ছিল অন্যত্র। তিনি সাহিত্যের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সেই মানুষকে, যাকে ইতিহাস সাধারণত নথিভুক্ত করে না। রাজা, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, ক্ষমতা কিংবা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক গোষ্ঠীর বাইরে যে বিপুল মানবসমাজ নীরবে বেঁচে থাকে, রাংগেয় রাঘবের লেখায় তারাই বারবার ফিরে এসেছে। এই কারণেই তাঁর সাহিত্যকে কেবল একটি সময়ের দলিল হিসেবে পড়লে ভুল হবে। তাঁর রচনার ভিতরে ভারতীয় সমাজের ক্ষমতাকাঠামো, বঞ্চনা, শ্রেণিবিভাজন ও মানুষের অস্তিত্বসংগ্রামের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি আগ্রায় জন্ম রাংগেয় রাঘবের। ১৯৬২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তাঁর জীবন শেষ হয়ে যায়। জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু লেখক হিসেবে তাঁর পরিসর ছিল বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক রচনা সৃষ্টি করার ঘটনা নিজেই তাঁকে হিন্দি সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে নিয়ে যায়। কিন্তু, সংখ্যার বিচারে তাঁর মূল্যায়ন করলে তাঁর লেখার অন্তর্গত তীব্রতাকে ধরা যাবে না। তিনি যে সময়ে লিখছিলেন, সেই সময়ের ভারত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। ঔপনিবেশিকতার ক্ষত, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, সামাজিক বৈষম্য ও নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা সবকিছুর অভিঘাত তখন সমাজে। রাংগেয় রাঘব সেই সময়কে দূর থেকে দেখেননি; মানুষের জীবনযাপনের ভিতরে ঢুকে তার অভিঘাত ধরার চেষ্টা করেছেন।
মানুষকে বুঝতে হলে কী কেবল একটি সাহিত্যরীতি যথেষ্ট? রাংগেয় রাঘবের লেখালিখি যেন সেই প্রশ্নেরই কিছুটা উত্তর। কখনও তিনি ইতিহাসের ভিতরে প্রবেশ করেছেন, কখনও প্রান্তিক সমাজে, কখনও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতায়, কখনও মানুষের ব্যক্তিগত সংকটে। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল জীবনের বিচ্ছিন্ন অংশকে একত্রে দেখার একটি মাধ্যম।
‘কব তক পুকারুঁ’ (‘Kab Tak Pukarun’) তাঁর সাহিত্যিক অবস্থান বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নট-করনট সম্প্রদায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাসে যে সমাজ উঠে আসে, তা মূলধারার সামাজিক বয়ানের বাইরে। সুখরাম করনটের মতো চরিত্র কোনও রোমান্টিক প্রান্তিক উদাহরণ নয়। সে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক অবজ্ঞা, সম্পর্কের টানাপড়েন আর বেঁচে থাকার নির্মম বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়ানো একজন মানুষ। এখানেই রাংগেয় রাঘবের লেখার ধার। তিনি প্রান্তিক মানুষকে দূর থেকে করুণার চোখে দেখেননি। তাঁদের জীবনকে সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। ফলে একটি সম্প্রদায়ের গল্প ধীরে ধীরে বৃহত্তর ভারতীয় সমাজের শ্রেণীচরিত্রের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। এই উপন্যাসের গুরুত্ব এখানেই যে, সমাজের নিচুতলার মানুষকে কেবল দুঃখের চরিত্র বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। তাদের ইচ্ছা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, দ্বন্দ্ব আছে, নৈতিক সঙ্কট আছে, শরীর ও জীবনের দাবি আছে। অর্থাৎ তারা পূর্ণ মানুষ। সাহিত্যের পাতায় প্রান্তিক মানুষের এই পূর্ণ মানবিক উপস্থিতি রাংগেয় রাঘবের অন্যতম বড় কৃতিত্ব। আর ‘মুর্দোঁ কা টিলা’ (‘Murdon Ka Tila’) তাঁকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ অন্য এক সময়ে। সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারোকে পটভূমি করে লেখা এই উপন্যাসে ইতিহাস ভাঙা ইট, মৃত নগর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা কয়েক হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার অবশেষের মধ্যে তিনি খুঁজেছেন জীবন্ত মানুষকে। ইতিহাসের বই যেখানে একটি সভ্যতার উত্থান-পতনের তথ্য দেয়, সাহিত্য সেখানে প্রশ্ন তোলে, সেই সভ্যতার মানুষ কীভাবে বাঁচত? তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? ক্ষমতা কার হাতে ছিল? সাধারণ মানুষের জীবন কোথায় দাঁড়িয়েছিল?
এই প্রশ্ন করার মধ্যেই রাংগেয় রাঘবের ইতিহাসচেতনার বিশেষত্ব। অতীত তাঁর কাছে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নয়। অতীতকে ব্যবহার করেছেন বর্তমানকে বোঝার এক উপায় হিসেবে। কয়েক হাজার বছরের পুরনো নগরসভ্যতার ভিতরে মানুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, সামাজিক বিভাজন ও সংঘাত খুঁজে নেওয়া আসলে নিজের সময়কেও প্রশ্ন করার একটি সাহিত্যিক কৌশল। অতীতের দিকে তাকিয়ে তিনি বর্তমানের মুখই যেন আরও কঠিনভাবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর গল্পগুলিতেও একই প্রবণতা কাজ করেছে। ‘গূঙ্গে’ গল্পের মূক কিশোরটি শুধু তার স্তব্ধতার মধ্যে একটি সমাজের নিষ্ঠুরতা ধরা পড়ে। যে মানুষ নিজের কথা বলতে পারে না, তার প্রতি সমাজের আচরণ কেমন? এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় গল্পটি। রাংগেয় রাঘবের সাহিত্য দুর্বল মানুষের আবেগকেই প্রকাশ্যে করে না, একইভাবে পাঠককে অস্বস্তিকর সামাজিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়ও করায়। ‘গদল’, ‘দেবদাসী’, ‘তুফানোঁ কে বীচ’, ‘জীবন কে দানে’, ‘অধূরি মূরত’, ‘সমুদ্র কে ফেন’, ‘ইনসান পয়দা হুয়া’, ‘পাঁচ গধে’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর বিষয়বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মানুষের প্রতি এক নিরন্তর কৌতূহল। তিনি কোনও একটি সামাজিক শ্রেণির লেখক হয়ে থাকতে চাননি। তাঁর চরিত্রেরা কখনও গ্রাম থেকে আসে, কখনও ইতিহাসের অন্ধকার থেকে, কখনও সামাজিক প্রান্ত থেকে, কখনও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাস্তবতা থেকে। ফলে তাঁর সাহিত্যকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা কঠিন।
১৯৪২ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘তুফানোঁ কে বীচ’ রিপোর্তাজ রচনা করেন। এই ঘটনাটি তাঁর সাহিত্যিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। তিনি কেবল বই পড়ে সমাজকে বুঝতে চাননি, বাস্তব মানুষের কাছে গিয়েছেন, তাঁদের দুর্দশা দেখেছেন, তারপর সেই অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। এই প্রত্যক্ষতার কারণে তাঁর লেখায় অনেক সময় কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি হয় না। ক্ষুধা তাঁর কাছে কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়, মানুষের শরীরের যন্ত্রণা। দারিদ্র্য কোনও পরিসংখ্যান নয়, জীবনের প্রতিদিনের লড়াই। রাংগেয় রাঘবের কবিতার ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তার বিস্তার লক্ষ করা যায়। ‘অজেয় খণ্ডহর’, ‘পিঘলতে পাথর’, ‘রাহ কে দীপক’, ‘রূপ কি ছায়া’, ‘মেধাবী’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর কাব্যসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। নাটক, একাঙ্ক, সমালোচনা ও গবেষণাধর্মী লেখাতেও তাঁর সক্রিয়তা ছিল। বাংলা, ইংরেজি, ব্রজ ও সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আগ্রহ তাঁকে শুধু কথাসাহিত্যিকের হিসেবে সীমাবদ্ধতায় আটকে রাখেনি। নানান জ্ঞানক্ষেত্রের মধ্যে যাতায়াত করার ক্ষমতা দিয়েছিল।
লেখকের এই বহুমুখিতার ভিতরে ছিল একটি বড় প্রশ্ন। মানুষকে বুঝতে হলে কী কেবল একটি সাহিত্যরীতি যথেষ্ট? রাংগেয় রাঘবের লেখালিখি যেন সেই প্রশ্নেরই কিছুটা উত্তর। কখনও তিনি ইতিহাসের ভিতরে প্রবেশ করেছেন, কখনও প্রান্তিক সমাজে, কখনও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতায়, কখনও মানুষের ব্যক্তিগত সংকটে। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল জীবনের বিচ্ছিন্ন অংশকে একত্রে দেখার একটি মাধ্যম। এইসময়ের পাঠকের কাছে রাংগেয় রাঘবকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন এখানেই। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের বাইরে থাকা মানুষের সমস্যা শেষ হয়নি। সামাজিক প্রান্তিকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ক্ষমতার অসম বণ্টন কিংবা চুপচাপ মানুষের কণ্ঠস্বর, এসব প্রশ্ন এখনও সমাজের ভিতরে রয়েছে। তাই ‘কব তক পুকারুঁ’ বা ‘মুর্দোঁ কা টিলা’ পড়লে সময়ের দিকে তাকানোর একটি নতুন জানলা খুলে যায়।
রাংগেয় রাঘবের সাহিত্য আমাদের আরও একটি কঠিন শিক্ষা দেয়, ইতিহাস কখনও বিজয়ীদের ইতিহাস নয়। যে মানুষটি পরাজিত, যে সম্প্রদায়টি সমাজের প্রান্তে, যে মানুষটির কথা বলার ক্ষমতা নেই, তার জীবনও ইতিহাসের অংশ। সাহিত্য সেই অদৃশ্য অংশকে দৃশ্যমান করতে পারে। রাংগেয় রাঘব সেই কাজটিই বারবার করেছেন। লেখকের মাত্র ৩৯ বছরের জীবন তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক অনুসন্ধানকে থামাতে পারেনি। তাঁর রচনাবলি পরবর্তী সময়ে সংকলিত ও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, পাঠ্যক্রমে তাঁর গল্প এসেছে, গবেষণায় তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর লেখা মনে করায়, কাদের জীবন আমরা ইতিহাস বলে মনে রাখি, আর কাদের জীবনকে নীরবে বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিই? রাংগেয় রাঘবের সাহিত্য সেই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক দীর্ঘ লেখকসাক্ষ্য। তাঁর কলম মৃত সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে যেমন মানুষের মুখ খুঁজেছে, তেমনই জীবিত সমাজের অন্ধকার প্রান্তেও কান পেতেছে। তাই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে হিন্দি সাহিত্যের একটি চ্যাপ্টার শুধু বলা যায় না। ইতিহাসের কেন্দ্রে না দাঁড়িয়ে, লেখক প্রান্তিক মানুষের জীবনকে দেখার যে দৃষ্টি তৈরি করেছিলেন, তার মূল্য অমূল্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৪২.
অঙ্গনের দিনরাত্রি
অম্লানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর হিরণ্য বুঝেছিল, কিছু মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব আসলে কোনো সিদ্ধান্ত নয়, এক ধরনের ধীরে ধীরে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় একটি বিকেলে, কথা হয় একটি অকারণ বিষয়ে, তারপর সেই কথার সূত্র ধরে আরও কথা, আরও দেখা, আরও সন্ধ্যা, আরও রাত এসে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে একদিন হঠাৎ মনে হয়, মানুষটি আর বাইরের কেউ নয়, নিজের জীবনেরই একটি অনুচ্ছেদ হয়ে গেছে। অম্লানও তেমনই ঢুকে পড়েছিল হিরণ্যর জীবনে। তার সঙ্গে প্রথম দিকে যে বিরক্তি ছিল, সেটি কবে যে অভ্যাসে, অভ্যাস কবে নির্ভরতায় এবং নির্ভরতা কবে এক অদ্ভুত আত্মীয়তায় বদলে গেল, তার কোনও হিসেব হিরণ্যর কাছে নেই। শুধু মনে আছে, কলেজের পর অম্লানকে না দেখলে দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হত এবং অম্লানের বাড়ির সামনের চাতালে গিয়ে বসলে সময়ের কথা মনে থাকত না। অম্লানের বাড়িতে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ত বই। ঘর দুটো খুব বড় ছিল না, কিন্তু বইয়েরা জায়গা দখল করে রাখত। তক্তপোষের এক কোণে বই, টেবিলের উপর বই, জানলার ধারে বই, বুক সেলফে বই, এমনকী কখনও চায়ের কাপের পাশেও বই। অম্লান বলত, “বইকে বেশি গুছিয়ে রাখলে বই রাগ করে।” হিরণ্য বলত, “বই আবার রাগ করে নাকি?” অম্লান উত্তর দিত, “যে মানুষ বই পড়তে পারে, সে জানে বই রাগ করে।” এই ধরনের কথার সত্যতা যাচাই করার কোনও উপায় ছিল না, কিন্তু অম্লানের কথার একটা নিজস্ব যুক্তি ছিল; সেই যুক্তি বাস্তবের আদালতে টিকবে কি না তা নিয়ে সে বিন্দুমাত্র চিন্তিত ছিল না। সে বিশ্বাস করত, মানুষের জীবন কেবল তথ্য দিয়ে তৈরি নয়, কিছু বিশ্বাস, কিছু ভুল, কিছু কল্পনা, কিছু অযৌক্তিক আনন্দ এবং অনেকটা গল্প দিয়ে তৈরি। তাই তার কাছে একটি বই ছিল না কেবল মুদ্রিত পৃষ্ঠা, বরং একটি দরজা। দরজা খুললেই অন্য সময়, অন্য মানুষ, অন্য শহর, অন্য জীবন। হিরণ্য কখনও কখনও ভাবত, অম্লান বই পড়ে না, বইয়ের ভিতর গিয়ে বসে থাকে।
সেই নীরবতারও একটি শব্দ ছিল। আজ এত বছর পর হিরণ্য বুঝতে পারে, তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলো হয়তো কথার মধ্যে ছিল না। ছিল সেইসব বিরতিতে, যখন অম্লান কিছু বলত না এবং হিরণ্যও তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করত না। দুজনেই জানত, এই নীরবতাকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। বাইরে তখন মফসসলের রাত নামত। অন্ধকারে গলিগুলো লম্বা হত। দামোদরের জল কালো হয়ে যেত। চায়ের দোকানের শেষ আলো নিভে যেত। আর অম্লানের ঘরে একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বলত। বই খোলা থাকত। দু’জন বন্ধু বসে থাকত। কথা কখনও থামত, কখনও আবার শুরু হত। তখনও কেউ জানত না, এইসব রাত একদিন স্মৃতি হবে।
তার গল্প বলার ক্ষমতা ছিল আরও আশ্চর্য। অম্লান যখন কোনো গল্প বলতে শুরু করত, তখন সে কেবল গল্পের ঘটনাগুলো বলত না; গল্পের আবহও তৈরি করত। চরিত্রের কণ্ঠস্বর বদলাত, প্রয়োজনমতো গলা নামাত, আবার কোথাও এমনভাবে উচ্চারণ করত যে সাধারণ একটি বাক্যও অস্বাভাবিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হত। শীর্ষেন্দুর কোনো গল্প নিয়ে এক সন্ধ্যায় আলোচনা শুরু হয়েছিল। অম্লান বলেছিল, “এটা পড়িসনি? আশ্চর্য! জীবনে কী পড়িস তাহলে?” হিরণ্য প্রতিবাদ করেছিল, “সব বই কি পড়তে হবে?” অম্লান বলেছিল, “না, কিন্তু কিছু বই না পড়লে জীবনের কিছু দরজা খোলে না।” তারপর বই খুলে পড়তে শুরু করেছিল। পাঁচ মিনিটের জায়গায় প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গিয়েছিল। গল্প শেষ হওয়ার পর হিরণ্য বলেছিল, “তোর পাঁচ মিনিটের সংজ্ঞা বদলানো দরকার।” অম্লান হেসে বলেছিল, “সময়কে ঘড়ি দিয়ে মাপিস বলে তোর এই সমস্যা।” অম্লানের কাছে সময়ও যেন একটি সাহিত্যিক বস্তু ছিল; তাকে প্রয়োজনমতো টেনে লম্বা করা যায়, সংকুচিত করা যায়, অথবা কোনো একটি মুহূর্তের মধ্যে বহু বছর ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। অম্লানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটত শব্দ নিয়ে। শব্দের ব্যুৎপত্তি, উচ্চারণ, অর্থের পরিবর্তন, ভুল অর্থের সৌন্দর্য সবকিছু নিয়েই তার আগ্রহ। সে একটি শব্দকে মাঝখান থেকে ভেঙে অন্য শব্দ বানিয়ে ফেলতে পারত এবং সেই নতুন শব্দের এমন একটি ব্যাখ্যা দিত যে প্রথমে সবাই হাসলেও পরে কেউ কেউ সত্যিই অভিধান খুলে বসত। গবেষণা শব্দের ব্যাখ্যা তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাণ্ডগুলোর একটি। একদিন সে হিরণ্যকে জিজ্ঞেস করেছিল, “গবেষণা মানে কী?” হিরণ্য যথাসম্ভব বিদ্বৎভাব নিয়ে বলেছিল, “গভীর এষণা।” অম্লান বলেছিল, “ভুল। গরু অন্বেষণ।” হিরণ্য হেসে উঠেছিল। অম্লান গম্ভীর মুখে ব্যাখ্যা করেছিল, প্রাচীনকালে গরু ছিল সম্পদের চিহ্ন, গরু হারালে তার পায়ের চিহ্ন ধরে ধরে তাকে খুঁজে বের করতে হত, আর গবেষণাতেও অতীতের চিহ্ন অনুসরণ করে নতুন সত্য খুঁজে বের করতে হয়। হিরণ্য বলেছিল, “এই ব্যাখ্যা কোথায় পেয়েছিস?” অম্লান বলেছিল, “পাইনি, বানিয়েছি।” হিরণ্য বলেছিল, “তাহলে?” অম্লান হেসে বলেছিল, “সব বানানো কথা মিথ্যে নয়।” সেই কথাটা হিরণ্যর মনে গেঁথে গিয়েছিল। কারণ অম্লান তখনও জানত না, ভবিষ্যতে স্মৃতিই হবে তার সবচেয়ে বড় বানানো সত্য।
চাতালে সন্ধ্যা নামলে অম্লান যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠত। দিনের অম্লান আর সন্ধ্যার অম্লানের মধ্যে পার্থক্য ছিল। দিনের মানুষটি ছিল কলেজের, বন্ধুদের, পরিবারের, নানা কাজের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা একজন সাধারণ যুবক; কিন্তু সন্ধ্যার পর সে যেন নিজের আসল চেহারায় ফিরে আসত। তখন তার চারপাশে মানুষ জমত। কেউ চেয়ার পেত, কেউ তক্তপোষে বসত, কেউ মেঝেতে। কেউ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ দরজার চৌকাঠে বসত। বাড়ির লোকেরা প্রথম দিকে বিরক্ত হলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। অম্লানের আড্ডা কখন শেষ হবে তা কেউ জানত না। কখনও রাত বারোটা, কখনও একটা, কখনও আরও পরে। কোনো বিশেষ উপলক্ষ লাগত না। শুধু মানুষ চাই, কথা চাই ও একটু সময় চাই। সেই সময়টাকে এখন হিরণ্য যখন মনে করে, তার মনে হয়, মানুষের কাছে তখন সত্যিই সময় ছিল। অথবা মানুষ সময়কে এতটা বাজারি করে ফেলেনি। এখন একটি দেখা করার আগে সময় ঠিক করতে হয়, স্থান ঠিক করতে হয়, কতক্ষণ থাকা যাবে তা ঠিক করতে হয়; তখন একটি মানুষ আরেকজনের বাড়িতে গিয়ে শুধু বলত, “বসছি।” তারপর বসা মানে ছিল পৃথিবীর সঙ্গে সাময়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা। অম্লানের চাতাল ছিল সেই সাময়িক মুক্তির জায়গা। সেখানে চাকরি, পরীক্ষা, সংসার, ভবিষ্যৎ সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য বাইরে পড়ে থাকত। কেউ কবিতা পড়ত, কেউ গল্প বলত, কেউ রাজনীতি নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠত, কেউ প্রেমের ব্যর্থতা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। অম্লান সবকিছুর মধ্যে সেতু তৈরি করত। সে বলত, “রাজনীতি থেকে প্রেম আলাদা নয়, প্রেম থেকে রাজনীতি আলাদা নয়। মানুষ যেখানে আছে, সবকিছু সেখানেই আছে।” হিরণ্য বলত, “তোর মাথায় সবকিছু একসঙ্গে কী করে ঢোকে?” অম্লান বলত, “মাথা ছোট বলে আলাদা আলাদা করে রাখি না।” অম্লানের বন্ধুত্বের আরেকটি বড় দিক ছিল তার বয়সহীনতা। সে একই সঙ্গে কলেজের জুনিয়রদের বন্ধু, সমবয়সিদের সঙ্গী এবং বয়সে বড় মানুষদের আড্ডার মানুষ হতে পারত। বড় দাদাদের সঙ্গে তার আলাপ ছিল গভীর, অথচ তাদের সামনে কোনো সংকোচ ছিল না। কোনো শিক্ষককে সে শ্রদ্ধা করত, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য করত না। কোনও কবির সঙ্গে তর্ক করতে তার ভয় ছিল না। আবার রাস্তার চায়ের দোকানের ছেলেটির সঙ্গে এমনভাবে কথা বলত যেন বহুদিনের পরিচিত। হিরণ্য একবার বলেছিল, “তুই সবাইকে এত আপন করে ফেলিস কী করে?” অম্লান বলেছিল, “মানুষকে দূরে রাখার জন্য যত আয়োজন লাগে, কাছে টানতে তত কিছু লাগে না।” হিরণ্য তখন কথাটার সৌন্দর্য বুঝেছিল, কিন্তু তার ভিতরের সত্যিটা বুঝতে আরও বহু বছর লেগেছিল। এই সময়েই অম্লানের মাথায় ‘অঙ্গন’ -এর ভাবনা আসে। পত্রিকা করার ইচ্ছে তার আগে থেকেই ছিল, কিন্তু নামটি নিয়ে সে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। একদিন হিরণ্যকে বলেছিল, “বাড়ির সবচেয়ে দরকারি জায়গা কোনটা?” হিরণ্য বলেছিল, “রান্নাঘর।” অম্লান মাথা নেড়ে বলেছিল, “না, উঠোন।” হিরণ্য হেসে বলেছিল, “উঠোন আবার দরকারি কী?” অম্লান বলেছিল, “ঘরের ভিতর মানুষ আলাদা থাকে। উঠোনে এসে মানুষ একসঙ্গে হয়।” কথাটা শুনে হিরণ্য কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। অম্লানের চোখে তখন অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। সে যেন পত্রিকার নাম নয়, একটি পৃথিবীর নাম বলছিল। “অঙ্গন” তার কাছে কাগজের নাম ছিল না। ছিল একটি ধারণা, একটি স্বপ্ন, একটি সামাজিক আকাঙ্ক্ষা। এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য মানুষের কাছে আসবে, নিজের কথা বলবে, অন্যের কথা শুনবে এবং কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজের ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন মানুষ হয়ে থাকবে। পত্রিকা বেরল। খুব বড় কিছু নয়। রোগা সংখ্যা। সীমিত লেখা। সীমিত অর্থ। কিন্তু অম্লানের উচ্ছ্বাসে তার কোনো অভাব ছিল না। লেখকদের লেখা চাইতে সে এমনভাবে ফোন করত যেন সাহিত্যসভা তার হাতে। কেউ লেখা দিতে দেরি করলে অভিমান করত। কেউ ভালো লেখা দিলে রাত জেগে আলোচনা করত। কোথাও বানান ভুল হলে প্রুফ নিয়ে উত্তেজিত হত। আবার কোনো সংখ্যার প্রচ্ছদ পছন্দ না হলে পুরো রাত ধরে তার বিকল্প ভাবত। হিরণ্য তাকে দেখে হাসত। অম্লান বলত, “হাসিস কেন?” হিরণ্য বলত, “এই পত্রিকা দিয়ে কী হবে?” অম্লান বলত, “সবকিছুর ফল হয় না।” হিরণ্য বলত, “তাহলে?” সে বলত, “কিছু কাজ শুধু মানুষকে একসঙ্গে করে। সেটাই ফল।”
‘অঙ্গন’-এর অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ এসেছিল। গল্প, কবিতা, প্রতিযোগিতা, আলোচনা সব মিলিয়ে ছোট শহরের মধ্যে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। অম্লান সেদিন সারাদিন দৌড়েছিল। কখনও মাইক ঠিক করছে, কখনও চেয়ার, কখনও অতিথিকে আনছে, কখনও কাউকে কবিতা পড়তে বলছে। অনুষ্ঠানের শেষে সবাই যখন ক্লান্ত, অম্লান তখনও থামেনি। হিরণ্য তাকে বলেছিল, “তুই ক্লান্ত হোস না?” অম্লান বলেছিল, “মানুষ এলে ক্লান্তি থাকে?” তারপর হঠাৎ দূরে তাকিয়ে বলেছিল, “দেখিস, একদিন এই শহরে এরকম আরও অনেক অঙ্গন হবে।” হিরণ্য হেসেছিল। সে জানত না, ভবিষ্যৎ শহরটি ঠিক উল্টো দিকে হাঁটছে। তখনও শহরের রাস্তাগুলো ছিল ছোট, কিন্তু সম্পর্কগুলো ছিল বড়। অভিরামপুরের গলি থেকে কলেজ, কলেজ থেকে মাঠ, মাঠ থেকে দামোদর সবকিছুর মধ্যে দূরত্ব ছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা ছিল না। একটি বাড়ির জানলা থেকে অন্য বাড়ির উঠোন দেখা যেত। কারও বাড়িতে অসুখ হলে খবর পৌঁছতে সময় লাগত না। কারও বিয়ে হলে পাড়ার মানুষ নিজেদের কাজ ফেলে হাজির হত। কোনো শিশুর জন্ম হলে সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান থাকত না, পাড়ারও হয়ে উঠত। অম্লান এই সামাজিকতার সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিনিধি ছিল। সে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও ঢুকে পড়ত, কখনও কখনও বিরক্তিকর মাত্রায়; কিন্তু তার ভিতরে কোনো কৌতূহলী হস্তক্ষেপের বদলে ছিল এক ধরনের মমতা। বন্ধুর বিয়েতে সে রাতভর হইচই করত, শিশুর জন্ম হলে তার সঙ্গে খেলত, কারও অসুখ হলে পাশে বসে থাকত। নিজের জন্য তার কোনো বিশেষ দাবি ছিল না।
হিরণ্য মাঝে মাঝে ভাবত, অম্লান কি সত্যিই সংসারবিমুখ, নাকি তার সংসারের ধারণাটা অন্যরকম? সে যে স্কুলের কথা বলত, বাগানের কথা বলত, লাইব্রেরির কথা বলত, বড় উঠোনের কথা বলত, সেখানে কি আসলে তার নিজের জন্যই কোনো ঘর ছিল? নাকি সে এমন একটা পৃথিবী বানাতে চাইত যেখানে তার মতো মানুষের জন্যও জায়গা থাকবে? অম্লান এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনও সরাসরি দেয়নি। বরং প্রশ্ন শুনলে হাসত। একদিন সন্ধ্যায় হিরণ্য তাকে বলেছিল, “তুই কি সুখী?” অম্লান একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, “সুখী মানুষরা কি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়?” হিরণ্য বলেছিল, “তাহলে তুই অসুখী?” অম্লান বলেছিল, “না। শুধু পুরো সুখী নই।” তারপর চা খেতে খেতে বলেছিল, “মানুষ পুরো সুখী হলে গল্প লেখা বন্ধ হয়ে যাবে।”
হিরণ্য তখন হেসেছিল। অম্লানও হেসেছিল। কিন্তু কথাটা তার মনে থেকে গিয়েছিল। সেই বয়সে কেউ জানত না, মানুষের ভিতরে কিছু অন্ধকার জায়গা থাকে, যেখানে বন্ধুরাও সবসময় পৌঁছতে পারে না। অম্লানের মধ্যেও ছিল। তার হাসির ভিতর, শব্দের খেলায়, অকারণ বাউণ্ডুলেপনায়, এক জায়গা ছিল যেখানে সে একা থাকত। হিরণ্য মাঝে মাঝে সেই জায়গার দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াত, কিন্তু দরজা খুলত না। তবু বন্ধুত্বে সব দরজা খুলতে হয় না। কিছু দরজা বন্ধ রেখেই মানুষ একে অন্যের খুব কাছের হয়ে থাকে।
রাত বাড়লে অম্লানের চাতাল ফাঁকা হয়ে যেত। সবাই একে একে চলে যেত। হিরণ্য কখনও একটু বেশি সময় থাকত। তখন অম্লান বই গুছাত না। বরং বইগুলো আরও ছড়িয়ে রাখত। যেন রাতের জন্য তাদের নতুন করে জায়গা করে দিচ্ছে। কখনও জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। বাইরে শহর তখন অন্ধকার। দূরে কোনো চায়ের দোকান বন্ধ হচ্ছে। কোনো সাইকেলের ঘণ্টি। কোনো কুকুরের ডাক। অম্লান হঠাৎ বলত, “হিরণ্য, জানিস, রাতের একটা ভালো দিক আছে?”
“কী?”
“রাতে মানুষ নিজের সঙ্গে মিথ্যে বলতে পারে না।”
হিরণ্য বলত, “দিনে পারে?”
“অনেক সহজে।”
“আর তুই?”
অম্লান হেসে বলত, “আমি তো সারাদিনই মিথ্যে বলি।”
হিরণ্য বলত, “তোর সব কথাই তাহলে মিথ্যে?”
অম্লান বলত, “না। তাই তো বিপদ।”
তারপর দুজনেই হাসত।
কখনও অনেকক্ষণ চুপ করে থাকত। সেই নীরবতারও একটি শব্দ ছিল। আজ এত বছর পর হিরণ্য বুঝতে পারে, তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলো হয়তো কথার মধ্যে ছিল না। ছিল সেইসব বিরতিতে, যখন অম্লান কিছু বলত না এবং হিরণ্যও তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করত না। দুজনেই জানত, এই নীরবতাকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। বাইরে তখন মফসসলের রাত নামত। অন্ধকারে গলিগুলো লম্বা হত। দামোদরের জল কালো হয়ে যেত। চায়ের দোকানের শেষ আলো নিভে যেত। আর অম্লানের ঘরে একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বলত। বই খোলা থাকত। দু’জন বন্ধু বসে থাকত। কথা কখনও থামত, কখনও আবার শুরু হত। তখনও কেউ জানত না, এইসব রাত একদিন স্মৃতি হবে। কেউ জানত না, যে শহরটিকে এত স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, তারও একদিন মৃত্যু হবে। কেউ জানত না, অম্লানের বলা কথাগুলো একদিন হিরণ্যকে ধরে রাখতে হবে, যেন বন্যার পরে ভেসে যাওয়া ঘরের শেষ কাঠের দরজা।শুধু অম্লান হয়তো একটু জানত। কারণ এক রাতে বই বন্ধ করে সে হিরণ্যকে বলেছিল, “সব কথা লিখে রাখিস।” হিরণ্য হেসে বলেছিল, “কেন?”
অম্লান বলেছিল, “মানুষ ভুলে যায়।”
“তুই ভুলিস?”
অম্লান জানলার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল, “মানুষ ভুলে যায় বলেই তো শব্দদের কাজ শুরু হয়।”
সেদিন হিরণ্য কথাটার মানে বুঝতে পারেনি।বহু বছর পরে, অম্লান যখন আর থাকবে না, শহর যখন তার পুরনো মুখ হারিয়ে ফেলবে, তখন সেই একটি বাক্যই হিরণ্যর কাছে বারবার ফিরে আসবে। মানুষ ভুলে যায়। শব্দেরা ভুলে না। তারা শুধু অপেক্ষা করে, কোনও এক দীর্ঘ রাত্রির জন্য। 🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
অরুণ কুমার চক্রবর্তী-এর অপ্রকাশিত কবিতা

ভুল ভালোবেসে
সঠিক চলেছে সব,
ঋতুদের শব্দ- গন্ধ- ভাষা, আকাশের বুক, কোল, ডানার বিস্তার, আলোদের হামাগুড়ি পূব থেকে পশ্চিমের দিকে
বহতা জলের গান, মৌসুমী বাতাসের রঙিন উৎসব, গন্ধ, ফোলাপেট পালের স্বীকৃতি, আর হাসি হাসি ফুলের পুলক,
শুধু ভুল ভালোবেসে মানুষেরা বেঠিক মাতাল
গাছ, কথা বলো
জল, কথা বলো
হে রোদ্দুর-হাওয়া-ফুল,
নির্জনশব্দময়তা ছিঁড়ে কথা বলো, কথা বলে ওঠো, মানুষেরা আশ্চর্য বধির
সঠিক চলেছে সব, অণুতে অণুতে প্রেম
পরমাণু তমোঘ্ন তনিমা, তবু ভুল
শুধু ভুল ভালোবেসে মানুষেরা বেঠিক মাতাল।
আশিস সরকার -এর একটি কবিতা

সামান্য কিছু কথা
যাদের নিজস্ব কোনো ইউ-এন-ও নেই
যাদের নিজস্ব কোনো বিশ্ব ব্যাংক নেই
যাদের নিজস্ব কোনো টেবিল চেয়ার নেই
যাদের এক টুকরো জমি নেই
যারা কোনো জাদু জানে না
তাদের জন্য কী পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে থাকে
তাদের ভালোবাসার কোনো আন্তর্জাতিকতার
অধিকারও নেই।
এই তারাই হলো বাংলা ও বাঙালি।
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

ঘুম পাড়ানী
জেগে আছি জেগে সবাই
জেগে জেগে খেজুর গাছে ওঠা
সমুদ্র পার হতে হবে সারা জীবন সাঁতার শেখা।
মরীচিকার জাল ফেলেছে পথঘাট বাসা
জালকাটা এক দায়।
তবু নিদ্রাহীন চোখে জাল কাটতে হয়।
বিরামহীন বাতাস সেও তো নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে।
কুটির থেকে অট্টালিকা স্বপ্ন দেখা
এভাবেই দেখতে দেখতে
কখন ঘুমিয়ে পড়ি? কারাই বা ঘুমিয়ে দেয়
জানে শুধু অন্তর্যামী।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
২৯.
সকাল থেকেই বুবুনের মনে কেমন যেন একটা উচ্ছ্বসিতভাব ছিল। সকাল থেকে রাখি রাখি করে পাগল করে দিয়েছে। পবিত্র বাজার থেকে খুব সুন্দর দুটো রাখি কিনে এনেছে। রাখি দুটো পেয়ে বুবুন এত খুশি কিন্তু ওর প্রশ্ন দুটো রাখি কেন তার বাপি এনেছে। হাজারও প্রশ্ন শেষে পবিত্র বলেছে কেন তুমি কাকে রাখি বাঁধবে, বলো তো বাবা।
কেন বাপি আমি তো পুচু বুনুকে বাঁধব।
—তাহলে পুচুও তো তোমাকে একটা বাঁধবে না।
—হ্যাঁ বাপি, একদম ঠিক কথা।
আর পুচু পাশে থেকে কী বুঝেছে কে জানে, আপন মনে লেজ নেড়ে যাচ্ছে। ওকেও খুব খুশি খুশি লাগছে।
তিথি আর এক কাপ চা নিয়ে আসে।
কাগুজে মাসি হাসতে হাসতে বাসনগুলো নিয়ে চলে গেল। আর তিথি ছুটল চা নিয়ে শাশুড়ি মার ঘরের উদ্দেশ্যে ভাবতে ভাবতে গেল সত্যি অন্ধকারের গুহাতে আলো প্রবেশ খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কবে যে ঈশ্বর একটু করুণা করবেন তবে সেই অন্ধকার দূরীভূত হবে। নারীদের জীবন এরকমই কখনও রোদ কখনও বৃষ্টি কখনও কুয়াশা।
কুয়াশা জীবন থেকে কাটতে কাটতে আবার এসে যায় শীতের দাপট কুয়াশার পর্দা ছিন্ন করতে সূর্যদেব যদি প্রসন্ন হন, যদি মুখ তুলে তাকান তবেই সম্ভব।
পবিত্রর এটা স্বভাব ও বাইরে থেকে আসলে একটু চা পেলে খুব খুশি হয়। একটা আলাদা এনার্জি যেন কাজ করে। তিথি এটা জানে, তাই তিথি চা ধরিয়ে দেয়। তারপর বলে,
—কি এমন শলা পরামর্শ চলছে তোমাদের?
—আর বোলো না আজকে তো রাখি পূর্ণিমা। রাখি নিয়েই চলছে।
বুবুনের হাতে রাখি দুটো আর ওদের এমন আনন্দ উল্লসিত মুখ দেখে তিথিও খুব খুশি হয়।
—তা তুমি দুটো রাখি কেন এনেছ?
পবিত্র তিথির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। বুবুন বলে,
—মাম মাম, আমি তো একটা পুচুকে বাঁধব। আর পুচুও তো আমাকে বাঁধবে। না হলে ওর মন খারাপ হবে না বলো?
—হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা। তাই তো আমার পুচুও তো তোমার হাতে বাঁধবে।
পুচু বুঝল কে জানে? ও-তো আপন মনে লেজ নেড়েই যাচ্ছে। কাগুজি মাসি হাঁক দিল,
—ও বৌমা।
এতক্ষণে হুশ হল তিথির। আরে যা মাংসটা বসিয়েছে, খেয়ালই নেই! রাখিটা কোনও রকমে বুবুনের হাতে দিয়ে ছুটল।
—কী হয়েছে মাসি?
—না কিছু হয়নি, মানে মাংসটা তো অনেক আগে কষাতে দিয়েছ, আমি আবার গ্যাসটা একটু কমিয়ে দিয়েছি!
—হাঁক দেবে তো…
—হ্যাঁ, সেই জন্যই তো ডাকলাম।
—-তোমাকে দেখতে হবে।
—ও হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ দেখি। ঢাকাটা সরিয়ে খুন্তি দিয়ে নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ, হয়েই গেছে।
—আচ্ছা মাসি তারপর লতাদির কী হল? ও-কাস্টমারের সঙ্গে মিট করল?
—হ্যাঁ।
—তারপর…
—তারপর আর কি! একথা ওর কাছ থেকেই শোনা। ও বলে, ওর ভীষণ শরীর খারাপ তা সত্ত্বেও যখন কাস্টমারের কাছে যায়। কাস্টমার তাকে কাছে বসিয়ে বোন বলে সম্বোধন করে।
—কী বলছ মাসি!
—হ্যাঁ গো, ঠিকই বলছি।
—বোন! এরকম হয়?
—হ্যাঁ হয়তো। দেখো বৌমা, সবাই যে শুধু শরীরটাকে উপভোগ করতে আসে এমন কিন্তু নয়।
—আমি তো এই প্রথম জানলাম।
—হ্যাঁ মানুষের মনের ভেতরে যে কার কীরকম যন্ত্রণা কাজ করে সে ঈশ্বর ছাড়া কেউ বলতে পারেন না!
—হ্যাঁ, তাই তো দেখছি।
—তারপর …
—তিথি তিথি তিথিইইই…
—ওই দেখো ছেলে মনে হয় ডাকছে তোমাকে।
—সত্যি একটা কথা শুনতে আমি ঠিক করে পারবই না। হয় ও-ডাকবে না হয় ওর মা ডাকবেন। মাসি একটু ঝোলটা টেস্ট করে দেখো তো কেমন হয়েছে নুন ঝাল…
কাগুজে মাসি হাত বাড়ায়।
—তুমি পাগল হয়েছ?
সঙ্গে সঙ্গে মাসির হাত সরিয়ে নেয়।
—হাত পুড়ে যাবে না, আমি তোমাকে বাটিতে দিচ্ছি।
—মাম মাম মাম…
—ওই দেখো এখন ছানা ডাকছে…
তিথি রান্নাঘর থেকে সাড়া দিল
—হ্যাঁ যাচ্ছি বাবা।
—তাড়াতাড়ি এসো।
তিথি বাটিতে মাংসটা দিয়ে আঁচলে হাত মুছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলছে কী হয়েছে এত চেঁচাচ্ছে কেন তোমরা বাপ বেটা মিলে?
—ও-বাবা আমার পুচুরানী রাখিটা নিয়ে বসে আছে দেখো এইটা দেখার জন্য আমাকে ডেকেছ।
পবিত্র আর বুবুন হাসতে থাকে।
—হ্যাঁ মাম্ মাম।
—পচু, তোমার রাখিটা খুব পছন্দ হয়েছে মা।
তিথি পুচুকে একটু আদর করে আবার নিচে চলে আসলো।
—ও বৌমা, আর একটু ঝাল আর একটু নুন দাও।
—আচ্ছা দেখো, এইটুকু নুন দেব। তিথি নুনের পরিমাণটা দেখায়।
—হ্যাঁ, ওর বেশি দিও না যেন।
আর ঝাল ওই তো ছোট চামচের এক চামচ মত দাও। —বাকি সব ঠিক আছে?
—হ্যাঁ, ঠিক আছে। সিমে দিয়ে দাও।
—আচ্ছা বল মাসী তারপর?
—তারপর আর কি বোন শব্দটা শুনে লতার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। ওর দেশের বাড়ির ভাইবোনদের কথা মনে পড়ে যায়। চোখ দুটো ছল ছল করে ওঠে। অন্যদিকে, ওই কাস্টমারেরও লতাকে দেখে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।
—কেন ওই কাস্টমারের কি বোন নেই?
—হ্যাঁ। পরে লতার কাছ থেকেই শুনেছি, ওই কাস্টমারের যে বোনটা ছিল তাকে একদল দুষ্কৃতী ধর্ষণ করে মেরে ফেলে।
আর লতাকে দেখেই তার বোনের কথা মনে পড়ে যায়। তাই লতাকে বোন হিসেবে পাবার জন্যই রাখি বাঁধতে আসে। কিন্তু বোন হিসেবে আসলে তো মাসি সেটা মেনে নিত না।
—দিয়ে তারপর কী হল, মাসি?
—সে আর এক কাণ্ড,
ওই কাস্টমার লতাকে বলেছে ওকে এখান থেকে উদ্ধার করবে তার বাড়িতেই নিয়ে যাবে। বোন হিসেবে রাখবে।
—তারপর?
—কিন্তু…
—কিন্তু কেন মাসি, এ তো ভাল প্রস্তাব। ওই অন্ধকার গলি থেকে মুক্তির আলো পাবে।
—কিন্তু লতা যে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—কেন?
—আসলে ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। ওভাবে বোনের নাম করে যদি তাকেও এভাবে অন্য কোথাও পাচার করে দেয়।
—তাই আবার করবে নাকি?
—সে তো তুমি আমি বলছি। যে একবার ওই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তাকে বোঝানো খুব কঠিন।
—দিয়ে তারপর?
—তারপর আর কি লতার মনে তখন ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে মনের দোলাচল।
—তারপর…
—রাজি হয় না কিছুতেই লতা।
এভাবে কয়েক মাস কাটল। ব্যাপারটা জানাজানি হতেই মাসি এক হাত নিল।
—কী রকম?
তিথি বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠল।
—আরে মাসির কানে দিয়েছে তো, বাকি মেয়েরা যে লতা এখান থেকে পালাবে।
—সত্যি মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু
হ্যাঁ গো মাসি…
—আর আমাদের ওই গলিতে সব রেষারেষি, একে তো লতা সুন্দর দেখতে ওর জন্য কাস্টোমারের ভিড়। মেয়েদের মধ্যে হিংসা। এই হচ্ছে সুযোগ ওকে বুঝে নেবার।
—তারপর…
—ডাক পড়ল। লতার মাসিক টেবিলে।
—মানে!
মানে মাসি বাসনগুলো জড়ো করতে করতে বলল,
—এবারে উত্তম মধ্যম হবে।
—কী বলছ মাসি! আবার মার!
—আগে ওকে বোঝাবে। তাতে যদি রাজি থাকে তাহলে সে যাত্রায় বেঁচে যাবে।
—বাবা কি জীবন গো!
—হ্যা গো বৌমা, অন্ধকারের গলিতে গেলে সেখান থেকে বেরনো খুব মুশকিল।
—ও-বৌমা বৌমা…
—দেখলে মাসি এ মা আর ছেলের কি কানেকশন আছে কি সুন্দর বোঝে গো।
—আমি দু’টো কথা বলতে গেলে এদের এত জ্বালা। ভাল লাগে না।
—ঠিক আছে যাও শোনো কি বলে, আমি বাসনগুলো মেজে নিই।
—সেই ভাল, যাই শুনে আসি কী হল!
—ও বৌমা, দেখো বোধহয় চা খাবেন।
—কটা বাজে?
এই যা ঘড়িতে বারোটা বাজে, চা খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে তো ওই জন্যই ডাক পড়েছে ঠিকই বলেছ মাসি। তোমার দিনকে দিন বুদ্ধি বাড়ছে বয়সের সাথে সাথে।
হ্যাঁ তোমার যা কথা, কাগুজে মাসি হাসতে হাসতে বাসনগুলো নিয়ে চলে গেল।
আর তিথি ছুটল চা নিয়ে শাশুড়ি মার ঘরের উদ্দেশ্যে ভাবতে ভাবতে গেল সত্যি অন্ধকারের গুহাতে আলো প্রবেশ খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কবে যে ঈশ্বর একটু করুণা করবেন তবে সেই অন্ধকার দূরীভূত হবে। নারীদের জীবন এরকমই কখনও রোদ কখনও বৃষ্টি কখনও কুয়াশা।
কুয়াশা জীবন থেকে কাটতে কাটতে আবার এসে যায় শীতের দাপট কুয়াশার পর্দা ছিন্ন করতে সূর্যদেব যদি প্রসন্ন হন, যদি মুখ তুলে তাকান তবেই সম্ভব। ঈশ্বর কবে এই অবলা নারীদের প্রতি প্রসন্ন হবেন কতকাল নারীরা এভাবে অন্ধকারের গহন তলে তলিয়ে থাকবে।🍁 (ক্রমশঃ)
🍂গল্প
মজনু বলল – শোন, এই যে চুল-দাড়ি, হাত-পায়ের নখ এগুলো যে বড় হয়, তা তো আমার ইচ্ছেয় হয় না। হয় উপরওয়ালার ইচ্ছেয়। আর উপরওয়ালার ইচ্ছের কাছে আর কারও ইচ্ছে চলে?
এক অদ্ভুত ভ্রমণ দৃশ্য

রেহানা বীথি
জ্বরটা কি বাড়ল আবার? মজনুর গা শিরশির করে উঠল। অন্ধকারে হাতড়ে কাঁথাটা টেনে জড়িয়ে নিল সারা শরীরে। গুড়গুড় করে আওয়াজ দিতে দিতে হঠাৎ কড়কড় শব্দে আছড়ে পড়ল মেঘ।
তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির ছাঁট ছিটে ছিটে এসে ভিজিয়ে দিতে লাগল মজনুর কাঁথা। কাঁথার বাইরে থাকা মুখ-মাথাও ঢেকে ফেলল এবার ও। তারপর কাঁপতে লাগল থরথর করে। এই থরথর কাঁপুনির মধ্যেও থেমে থেমে গান গাইতে লাগল মজনু –
“মা গো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা…।”
খুশি হয়ে উঠে বসে পড়ল। আর বসেই বুঝতে পারল জ্বর নেই। শরীর হালকা লাগছে অনেক। মাথার দপদপে ব্যথাটাও নেই। বৃষ্টিও থেমে গেছে। কিন্তু চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসছে। জ্বরের তাপে যে ঘুম এতক্ষণ লুকিয়ে ছিল, তা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেঙে ফেলতে চাইছে মজনুকে। কিচকিচ করে মৃদু আলো চিবিয়ে মজনুর দিকে তাকিয়ে থাকা ছুঁচোদের থেকে ছুটি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ও।
গান শুনে ঘরের দরজা খুলে গেল নাকি? বোধহয়। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে মায়ের ঘরের কাঠের পুরোনো দরজাটাই তো খোলে। যে রাতগুলোতে মজনু বাড়িতে থাকে, সেই রাতগুলোতে দুই একবার এই শব্দটা পাওয়া যায়। দরজা খুলে মা বেরোয়, তারপর ধীরে ধীরে মজনুর কাছটিতে এসে বসে, কখনও কখনও মাথায় হাত বোলায়। কিন্তু কখনও বলে না, ঘরে গিয়ে শো। কেন বলে না, তা অবশ্য মজনু জানে। পাগল ছেলেকে ঘরে ঢুকতে দিলে যদি মায়ের গলা টিপে ধরে! একবার তো ধরেওছিল। এমন শক্ত করে ধরেছিল যে মায়ের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তারপর মায়ের স্বামী আর দুই ছেলে মিলে বেদম মেরেছিল মজনুকে। মার খেয়ে গড়াগড়ি দিতে দিতে মজনু শুধু হো-হো করে হেসেছিল। হাসি দেখে আরও মেরেছিল ওরা।
কিন্তু কি করবে মজনু? সারাক্ষণ ওর যে শুধু হাসিই পায়। তবে তারপর থেকে মা আর তার স্বামী-ছেলেদের সামনে পড়লেই মনে মনে হাসে। কিংবা খুব বেশি গম্ভীর হয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাতে থাকে।
শুধু রাতের বেলা মা যখন ওর কাছে আসে, তখন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ময়লা দাঁতগুলো বের করে নিঃশব্দে হাসে। কিন্তু কখনও বলেনি – মা, বারান্দায় শুয়ে থাকতে আমার ভয় করে, গায়ের ওপর ছুঁচো দৌড়ে বেড়ায়। এই না বলতে বলতেই ছুঁচো ওর বন্ধু হয়ে গেছে। এখন রোজ রাতেই গল্প হয় ছুঁচোদের সঙ্গে। আজও কিছুক্ষণ আগে গল্প করতে করতেই জ্বরটা বেড়ে কাঁপুনি উঠে গেল। মজনুর কাঁপুনিতেই বোধহয় ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল ওরা। তারপর মা বেরোলো, মাথায় হাত দিয়ে দেখে ওষুধ খাওয়ালো। তবে মজনু জানে, ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে সবটাই দেখেছে এবং আবার আসবে। আসুক, মজনু তো ওদের অপেক্ষাতেই আছে।
বৃষ্টির একটানা শব্দের ছন্দে ছন্দে পা নাচাতে নাচাতে কাঁথার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দিল মজনু। ঠিক এ-সময়ই বিদ্যুৎ চমকাল বিকট শব্দে। কয়েক সেকেন্ডের আলোয় চারপাশটা কেমন ভূতুড়ে পথহীন-দেশের মতো মনে হল ওর। সেই চেনা উঠোন, উঠোনের পশ্চিমে দেয়ালের গা ঘেঁষে কামিনী গাছ, তারপাশে কলপাড় সব যেন একঝলক দাঁত বের করে হেসে নিল। কলপাড়ের ওই জায়গাটায় আগে একটা কুয়ো ছিল। সে অনেক বছর আগে। তখনও কি মজনু পাগল ছিল? বোধহয় ছিল না। এখনও কি মজনু পাগল? কে জানে! সবাই তো ওকে পাগলই বলে। এমনকি ওর মা-ও তো পাগল বলে। কিন্তু পাগল হলে এতবছর আগের কথা মনে আছে কী করে?
সেই কুয়ো। কী গভীর! মিশমিশে কালো জল। দড়ি বেঁধে ছোট্ট বালতিটা যখন ফেলা হতো, ঝপাৎ করে একটা শব্দ হতো না? তারপর কালো জলে তুমুল ঢেউ। দড়ি টেনে বালতি ওঠানোর সময় ছলকে ছলকে একটু একটু করে পড়তে থাকত তো সেই জল। জলে থালাবাসন ধোও, হাত-মুখ ধোও, গোসল করো, খাও। বরফ ঠাণ্ডা জলে যা ইচ্ছে তা-ই করো। মজনুর অবশ্য নদীতে গোসল করতেই ভালো লাগতো। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো বৃষ্টির দিনে। নদীর জলে সাঁতার কাটছে, আবার বৃষ্টিতেও ভিজছে, কী যে আনন্দ! এমনই এক আনন্দ মেখে একদিন বাড়ি ফিরে দেখে বাপটা মরে গেছে। বারান্দায় যে জায়গাটায় এখন মজনুর শোওয়ার জায়গা, ঠিক ওখানটাতেই রাখা হয়েছিল বাপের লাশ। বৃষ্টির মধ্যেও এত মানুষ এসেছিল বাড়িতে! আর মজনু অবাক হয়ে ভেবেছিল, এত মানুষ কখন জানলো যে আমার বাপ মারা গেছে? আমি কি অনেক অনেক সময় ধরে নদীতে গোসল করছিলাম? নদীর জলে বৃষ্টির ফোঁটা গুনতেই যা একটু দেরি হয়েছে, তাই বলে সেই ফাঁকে বাপই মরে যাবে! মাত্র তো সাতদিনের জ্বর। সাতদিনের জ্বরেও মানুষ মরে যায়, বাপ মরে যায়!
নিভে যাওয়া কারেন্টের আলো জ্বলে উঠল। উঠোন ভরে গেল ঝাপসা আলোর লুকোচুরিতে। সেই আলো গড়িয়ে গড়িয়ে মজনুকে আলোকিত করছে কিছুটা। ছুঁচোরাও বোধহয় হামাগুড়ি দিতে দিতে এসে পড়েছে আবারও। মজনুর কাঁথার ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে। কাতুকুতু লাগছে ওর। কাতুকুতুতে গা মুচড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল মজনু। একটা ছুঁচো ওর মুখের কাছে মুখ এনে দাড়িতে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। মজনু হাসতে হাসতে বলল –
তোদের জ্বালায় দেখছি দাড়ি কেটে ফেলতে হবে!
উত্তরে ছুঁচোটাও কিছু বলল।
তার উত্তরে মজনু বলল – আগে তো কেটেছিই, কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় তো কাটিনি। মা জোর করে কেটে দিয়েছে। মায়েরও দোষ নেই। দাড়ি তো দাড়ি, গোঁফেও যে ঠোঁটজোড়া ঢেকে যায়। খাওয়ার জায়গাটা তো খালি রাখতে হবে, নাকি?
ওর মুখের কাছে এখন সবগুলো ছুঁচো জড়ো হয়েছে। ওরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে কিচকিচ শব্দ করতে লাগল। মনে হল, দাড়ি কাটার গূঢ় কারণ অনুধাবন করেই ওদের এই কিচমিচ।
মজনু বলল – শোন, এই যে চুল-দাড়ি, হাত-পায়ের নখ এগুলো যে বড় হয়, তা তো আমার ইচ্ছেয় হয় না। হয় উপরওয়ালার ইচ্ছেয়। আর উপরওয়ালার ইচ্ছের কাছে আর কারও ইচ্ছে চলে?
ছুঁচোরা একযোগে মাথা ঝাঁকাল। মানে, চলে না।
ওদের মাথা ঝাঁকানো উত্তরে খুশি হল মজনু। খুশি হয়ে উঠে বসে পড়ল। আর বসেই বুঝতে পারল জ্বর নেই। শরীর হালকা লাগছে অনেক। মাথার দপদপে ব্যথাটাও নেই। বৃষ্টিও থেমে গেছে। কিন্তু চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসছে। জ্বরের তাপে যে ঘুম এতক্ষণ লুকিয়ে ছিল, তা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেঙে ফেলতে চাইছে মজনুকে। কিচকিচ করে মৃদু আলো চিবিয়ে মজনুর দিকে তাকিয়ে থাকা ছুঁচোদের থেকে ছুটি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ও। কিংবা বোধহয় ঘুমিয়েও পড়ল না। বেরিয়ে পড়ল এক অদ্ভুত ভ্রমণে। এই ভ্রমণে ওর মা বউ সেজে বসে আছে। পুরোনো কাঠের দরজায় দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছে মজনু। দেখছে, এক ভুঁড়িওয়ালা বেঁটে লোক কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে উঠোন থেকে উঠে এল বারান্দায়। বারান্দায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে মজনুকে বলল – এই, এখানে কি করিস? যা, যাহ্! ওদিকে যাহ্!
বলে তার ভারি হাত দিয়ে টেনে দরজা থেকে সরিয়ে দিল। তখন রাত। ভীষণ রাত। মজনু কোথায় যাবে? মাকে ছাড়া এই রাতে কোথায় যাবে ও? ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল! ভোরে যখন ঘুম ভাঙল, দেখল উঠোনের তারে মায়ের খয়েরি রঙ শাড়ি মেলে দেয়া। তার পাশে বোধহয় ভুঁড়িওয়ালা লোকটার লুঙ্গি। তারপর মজনু একা একা ঘুরতে লাগল এদিক-ওদিক। স্কুলে না গিয়ে কোথায় কোথায় যে যায় ও! মা আর আগের মতো হদিস করে না। আবার করেও। যখন লোকটা কয়েকদিনের জন্যে বাড়িতে আসে না, তখন খুব যত্ন করে। তারপর একসময় লোকটা না থাকলেও যত্ন করে না। মানে, যত্ন করার সময় পায় না। কারণ, তারপর যে মায়ের আরও দুজন মজনু হয়েছে!
আর তারপর তার আগের মজনু কোথায় যায়, কি করে, কি খায়, সবকিছুই যেন তার হদিস থেকে বেরিয়ে যায়। মজনু যে একা একা হাঁটে আর গল্প করে, গল্প করে আর হাসে, গল্প করতে করতে হাসতে হাসতে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পড়ে, ধীরে ধীরে পাড়ার সবার কাছে পাগল বলে পরিচিত হয়, মা যেন কিছু জানতেই পারে না। মায়ের খেয়ালেই নেই ওসব। অথচ মা একটু খেয়াল করলেই তো মজনু পাগল হতো না, তাই না?
কিন্তু এখন তো করারও কিছু নেই। একবার পাগল হয়ে গেলে সত্যিই তো করার কিছু থাকেও না।
অদ্ভুত ভ্রমণ দৃশ্যে বৃষ্টি নামল আবার। পুরো শরীর আবারও কেঁপে উঠল মজনুর। আবারও জ্বর? কিন্তু কেন? একটু আগেই না শরীর কত হালকা লাগছিল! ঘুমুতে ঘুমুতে যখন একটার পর একটা দৃশ্যের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, মনে মনে বলছিল – আর কখনও এসব দৃশ্যের ভেতরে ঢুকবে না ও। ও-শুধু ভোরবেলায় উঠে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে নদীর ধারের কদম গাছটার নিচে। ওই গাছের কয়েকটা ফুল নিয়ে ঢুকে যাবে গাছের দেহের ভেতর। তারপর আর বের হবে না। কোনোদিনই না।
কিন্তু ভোর হতে হতে যদি দেরি হয়ে যায়! এখনই যাবে নাকি? এই বৃষ্টিতেই?
আবারও কারেন্ট নিভে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাতে কী? পথ তো মুখস্ত মজনুর।
উঠে বৃষ্টিতে নেমে গেল মজনু। সাঁইসাঁই বৃষ্টির তোড় যেন ওকে ঠেলতে ঠেলতে উঠোন পার করে রাস্তায় এনে ফেলল। তারপর চালিত করল নদীর দিকে। পুরো শরীরে এবং পুরো চরাচরে প্রবহমান বৃষ্টির ধারা নিয়ে মজনু এসে দাঁড়াল কদম তলায়। ছিঁড়ে নিল কয়েকটা কদম। তারপর চলে গেল। চলে গেল হয়তো কদমের দেহের ভেতরেই। তবে, চলে যাওয়ার সময়ও ওর মুখে একফালি হাসি লেগেই ছিল।🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





