সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক, নতুন দিল্লি : এশিয়ান গেমসে (Asian Games) পদক জয়ের আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছে গেল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানকে কার্যত একতরফা ম্যাচে ৮ উইকেটে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করলেন হরমনপ্রীত কৌরেরা (Harmanpreet Kaur)। প্রথমে বল হাতে জাপানকে মাত্র ৫৭ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পরে রান তাড়া করতে নেমে ভারতকে খেলতে হল মাত্র ৫ ওভার। ৫ ওভারেই ২ উইকেট হারিয়ে ৫৯ রান তুলে ম্যাচ শেষ করে দেয় ভারত।

আরও পড়ুন : IPL 2027 Auction India | তিন বছর পর ভারতেই IPL নিলাম? ডিসেম্বরেই বড় আয়োজন! কোন শহর পাবে দায়িত্ব?
ফলে ব্যাট হাতে নামার প্রয়োজনই পড়ল না অধিনায়ক হরমনপ্রীত ও সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana)। ভারতের এই জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বোলারদের। বিশেষ করে শ্রী চরণী (Sree Charani) একাই জাপানের ব্যাটিং অর্ডারে বড় ধাক্কা দেন। ১০ রান খরচ করে তাঁর ঝুলিতে আসে চারটি উইকেট। তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন শেফালি বর্মা (Shafali Verma)। ১৩ রানে দু’টি উইকেট তুলে নিয়ে জাপানের রান তোলার গতি আটকে দেন ভারতীয় অলরাউন্ডার। শ্রেয়াঙ্কা পাটেল (Shreyanka Patil) এবং দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma) একটি করে উইকেট নিয়ে জাপানের ইনিংস দ্রুত গুটিয়ে দেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ করেন।

টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হরমনপ্রীত। ভারতের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে শুরু থেকেই সমস্যায় পড়ে জাপান। ইনিংসের কোনও পর্যায়েই বড় জুটি গড়ে উঠতে পারেনি তাদের ব্যাটিং। ওপেনার আয়াকা কাতো স্ট্যাফোর্ড (Ayaka Kato Stafford) ৪৭ বল খেলে ২৫ রান করেন। তিনিই জাপানের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। অন্য ওপেনার হারুনা ইওয়াসাকি (Haruna Iwasaki) করেন ১০ রান। তাঁদের বাইরে আর কোনও জাপানি ব্যাটার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছতে পারেননি। ভারতের বোলিং আক্রমণের সামনে জাপানের ব্যাটারদের রান করার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে তারা। শেষ পর্যন্ত ১৯.৫ ওভারে মাত্র ৫৭ রানে অলআউট হয়ে যায় জাপান। অর্থাৎ ভারতের সামনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৮ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই দ্রুত ম্যাচ শেষ করার পরিকল্পনা নেয় ভারত।
কিন্তু, রান তাড়ার শুরুতেই একটি অপ্রত্যাশিত ধাক্কা আসে। গুনালান কমলিনী (G. Kamalini) কোনও রান না করেই ফিরে যান। এরপর ভারতী ফুলমালি (Bharti Fulmali) ৬ রান করে আউট হন। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য হওয়ায় অবশ্য সেই দুই উইকেটও ভারতের জয়ের পথে কোনও বড় বাধা তৈরি করতে পারেনি। শেফালি বর্মা আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ম্যাচকে আরও দ্রুত ভারতের দিকে নিয়ে যান। শেফালির ব্যাটে যেন কোয়ার্টার ফাইনালের রান তাড়ার হিসাবটাই ছোট হয়ে যায়। মাত্র ১৫ বলে অপরাজিত ৪০ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ছয়টি চার এবং দু’টি ছক্কা। অর্থাৎ ৪০ রানের মধ্যে ৩৬ রানই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। মাত্র পাঁচ ওভারের মধ্যে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেওয়ার পিছনে শেফালির এই বিধ্বংসী ব্যাটিং ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। অন্য প্রান্তে রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) ৬ বলে ১২ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ব্যাট থেকেও আসে দু’টি চার।

শেষ পর্যন্ত ৫ ওভারে ভারতের রান দাঁড়ায় ৫৯/২। প্রয়োজনের তুলনায় দু’রান বেশি তুলে নিয়েই ম্যাচ শেষ করে দেয় ভারত। ফলে অধিনায়ক হরমনপ্রীত এবং অভিজ্ঞ ওপেনার স্মৃতি মন্ধানাকে ব্যাটিংয়ের জন্য মাঠে নামতেই হয়নি। দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারের বিশ্রাম নিয়েই ম্যাচ জিতে নেওয়ার ঘটনা ভারতের দাপটের ছবিটাই সামনে এনেছে। এই জয় ভারতের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এশিয়ান গেমসের মহিলা ক্রিকেটে তারা গতবারের সোনাজয়ী দল। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসের জন্য ঘোষিত ভারতীয় দলে হরমনপ্রীতকে অধিনায়ক ও স্মৃতি মন্ধানাকে সহ-অধিনায়ক করা হয়েছিল। বিসিসিআইয়ের ঘোষণাতেও ভারতকে আগের এশিয়ান গেমসের চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কোয়ার্টার ফাইনালে এমন দাপুটে জয় তাই ভারতের পদক-যাত্রাকে আরও এগিয়ে দিল। সেমিফাইনালে ভারতের সামনে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে জয় এলেই অন্তত রুপোর পদক নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ আর একটি ম্যাচ জিতলেই ভারতীয় মহিলা দলের হাতে উঠবে পদক। তবে তার রং কী হবে, তা নির্ভর করবে পরের ম্যাচ এবং পরবর্তী ফলের উপর। ভারত-বাংলাদেশ সেমিফাইনাল ঘিরে তাই ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহ ইতিমধ্যেই বেড়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতের সামনে জাপানের মতো ছোট লক্ষ্য থাকবে না, এমন সম্ভাবনাই স্বাভাবিক। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্রুত জয় পিছনে ফেলে এবার ব্যাটিং, বোলিং এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতার পূর্ণ পরীক্ষা দিতে হবে হরমনপ্রীতদের।
ভারতের জন্য স্বস্তির জায়গা অবশ্যই বোলিং বিভাগ। জাপানের বিরুদ্ধে শ্রী চরণীর চার উইকেট ভারতীয় দলের স্পিন আক্রমণের কার্যকারিতা দেখিয়েছে। ১০ রানে চার উইকেট তাঁর ম্যাচের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স। শেফালির ১৩ রানে দুই উইকেটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীপ্তি শর্মা এবং শ্রেয়াঙ্কা পটেলের একটি করে উইকেট জাপানের ইনিংসকে বড় স্কোরের দিকে যেতে দেয়নি। জাপানের ইনিংসের দিকে তাকালে ভারতের বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ২০ ওভার খেলার সুযোগ থাকলেও ১৯.৫ ওভারের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় তাদের ইনিংস। ওপেনার আয়াকা কাতো ২৫ রান করলেও সেই রানকে বড় ইনিংসে পরিণত করার মতো সঙ্গী পাননি। একের পর এক ব্যাটার দ্রুত ফিরে যাওয়ায় স্কোরবোর্ডে রান জমা হয়নি। ৫৭ রানেই থেমে যায় জাপানের লড়াই। ভারতের রান তাড়ায় অবশ্য দ্রুত ম্যাচ শেষ করার আরেকটি সুবিধা হয়েছে। ছোট লক্ষ্য হওয়ায় প্রথম সারির ব্যাটারদের বড় ইনিংস খেলার প্রয়োজন পড়েনি। শেফালি মাত্র ১৫ বলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। রিচা ঘোষও তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত রান করেন। ফলে ভারতের রান রেট নিয়ে কোনও চাপ তৈরি হয়নি।
এশিয়ান গেমসের মতো বহু-ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব আলাদা। এখানে একটি জয় শুধু পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে না, পদকের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। ভারতের সামনে এখন সেই পদক নিশ্চিত করার সুযোগ। বাংলাদেশকে হারাতে পারলেই অন্তত রুপোর পদক হাতে আসবে। এরপর ফাইনালে উঠতে পারলে সোনা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবেন হরমনপ্রীতেরা। অন্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। অর্থাৎ টুর্নামেন্টের শেষ চারটি দলের মধ্যে এশিয়ার পরিচিত ক্রিকেট শক্তিগুলিই জায়গা করে নিয়েছে। ফলে সেমিফাইনালের লড়াইও যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের জন্য আপাতত লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের পারফরম্যান্সে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ম্যাচের দুই ইনিংসেই নিয়ন্ত্রণ। প্রথমে বল হাতে জাপানকে ৫৭ রানে থামিয়ে দেওয়া, পরে ব্যাট হাতে মাত্র পাঁচ ওভারে সেই রান পেরিয়ে যাওয়া, দলের ভারসাম্যকে সামনে এনেছে। হরমনপ্রীত ও স্মৃতির মতো দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে ব্যবহার না করেই জয় এসেছে। ফলে পরের ম্যাচের আগে তাঁদের শারীরিক ভাবে সতেজ রাখার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

কিন্তু, সেমিফাইনালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাধিক ম্যাচ খেলেছে। ফলে দুই দলের খেলোয়াড়দের একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। ভারতের জন্য বোলিং বিভাগের ধার বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যাটিংয়ের প্রথম সারিকেও দায়িত্ব নিতে হতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতি ও হরমনপ্রীতের অভিজ্ঞতা নকআউট ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।শেফালি বর্মার জন্যও জাপানের বিরুদ্ধে এই ইনিংস আলাদা করে নজর কেড়েছে। মাত্র ১৫ বলে ৪০ রান করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ছোট লক্ষ্য হলেও ম্যাচ দ্রুত শেষ করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। তবে পরের ম্যাচে তাঁকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হতে পারে। রিচা ঘোষের দ্রুত ১২ রানও ভারতের রান তাড়াকে সহজ করেছে। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে ভারতের লক্ষ্য যে শুধু সেমিফাইনাল নয়, তা আগের সাফল্য থেকেই বোঝা যায়। গতবার সোনা জেতা ভারত এবারও শীর্ষ পদকের লড়াইয়ে রয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের বিরুদ্ধে ৮ উইকেটের জয় সেই যাত্রার পরের ধাপ তৈরি করেছে। এখন বাংলাদেশ বাধা পেরতে পারলেই নিশ্চিত হবে অন্তত রুপো। এই ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে ভারতীয় মহিলা দলের দাপট, বোলারদের দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ, শেফালির দ্রুত রান, রিচার অবদান ও প্রথম সারির দুই ব্যাটারকে ব্যাটিংয়ে নামার প্রয়োজন না হওয়া, এসব মিলিয়ে ম্যাচটি শেষ হয়েছে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক আগেই। সামনে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচই ঠিক করবে ভারত ফাইনালের মঞ্চে উঠতে পারে কি না।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women Asia Cup Final | Shafali Verma fastest fifty, Smriti Mandhana 59 I শেফালি-স্মৃতির ব্যাটের ঝড়, স্পিনে শ্রীলঙ্কা ধ্বংস! অষ্টমবার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন ভারত




