সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার রাতে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিত উদ্যাপনের ছবিটা একটু বদলে যায়। হাতে সিরিজ জয়ের ট্রফি, সামনে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস এ সব কিছুই ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে ভারতীয় অধিনায়ক শ্রেয়াস আয়ার (Shreyas Iyer) এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা মাঠের লড়াইকে ছাপিয়ে উঠে এল সৌহার্দ্যের বার্তা হিসেবে। ট্রফি গ্রহণের সময় শ্রেয়াস ডেকে নিলেন আফগানিস্তানের অধিনায়ক ইব্রাহিম জাদরানকে (Ibrahim Zadran)। দু’জন একসঙ্গে ট্রফি হাতে দাঁড়ালেন। পরে ভারতীয় দলের জয়ের ছবি তোলার সময়ও জাদরানকে পাশে রাখলেন শ্রেয়াস।

তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে আফগানিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে ট্রফি জিতেছে ভারত। বৃহস্পতিবার তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে ১২৭ রানের বড় ব্যবধানে জয়ের পরই সিরিজের শেষ পর্বে পৌঁছয় ভারত। ম্যাচের ফল ভারতের পক্ষে একতরফা হলেও পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে শ্রেয়সের আচরণ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে অন্য এক বার্তা বহনকারী। সাধারণত কোনও দল সিরিজ জিতলে পুরস্কার বিতরণের সময় ট্রফি হাতে নেন সেই দলের অধিনায়ক। এরপর তিনি সতীর্থদের কাছে ফিরে গিয়ে দলের সঙ্গে ছবি তোলেন। বহু বছর ধরে ক্রিকেটে এটাই পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু ‘ফ্রেন্ডশিপ কাপ’-এর এই সিরিজে সেই পরিচিত ছবিতে নতুন সংযোজন করলেন শ্রেয়স। দিল্লি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (DDCA) সভাপতি রোহন জেটলির (Rohan Jaitley) হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার সময় আফগান অধিনায়ককে মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। পরে ট্রফি নিয়ে যখন ভারতীয় দল ছবি তুলছিল, তখনও জাদরানকে সেই উদ্যাপনের অংশ করে নেন ভারতীয় অধিনায়ক। ম্যাচের লাইভ আপডেটেও এই মুহূর্তকে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের ছবি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ক্রিকেটের ময়দানে জয়-পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। একটি দল জিতবে, অন্য দল হারবে। কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার পর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান দেখানোই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি। শ্রেয়সের এই আচরণ সেই জায়গাটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তিনটি ম্যাচেই ভারত নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছিল। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছিল তারা। শেষ ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ শেষ করে ভারত।
এই সিরিজের আরও একটি আলাদা দিক রয়েছে। ম্যাচগুলি ভারতের মাটিতে হলেও ভারত ছিল সফরকারী দল। সিরিজের আয়োজক ছিল আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (Afghanistan Cricket Board)। আফগানিস্তানের হোম সিরিজ হিসেবেই দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে তিনটি টি-টোয়েন্টি আয়োজন করা হয়। ১৩, ১৫ এবং ১৭ সেপ্টেম্বর তিনটি ম্যাচই একই মাঠে হয়েছে। আফগানিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিজেদের হোম ম্যাচের একটি অংশ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি কিংবা ভারতের মতো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজন করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার দিল্লিতে ভারতের বিরুদ্ধে তারাভসিরিজ আয়োজন করে। ফলে দিল্লির মাঠে দাঁড়িয়েও কাগজে-কলমে ভারত ছিল অ্যাওয়ে দল। ভারতীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন শ্রেয়াস, আর আফগানিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাদরান। সিরিজ শুরুর আগেই দুই অধিনায়ক ‘ফ্রেন্ডশিপ কাপ’ ট্রফি উন্মোচন করেছিলেন। শেষ ম্যাচের পরে সেই ট্রফিই দুই অধিনায়কের হাতে একসঙ্গে ওঠা এই সিরিজের নামের সঙ্গে যেন অন্য মাত্রা যোগ করেছে।
তৃতীয় টি-টোয়েন্টির ফলও ভারতের দাপটের ছবি তুলে ধরে। প্রথমে ব্যাট করে ভারত বড় রান তোলে। অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) মাত্র ৩০ বলে শতরান করে নতুন নজির গড়েন। তাঁর বিধ্বংসী ইনিংসের উপর ভর করে ভারত বড় সংগ্রহ গড়ে। পরে আফগানিস্তানের রান তাড়ার পথ আটকে দেয় ভারতের বোলিং আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত ১২৭ রানে ম্যাচ জিতে নেয় শ্রেয়সের দল। এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের সিরিজে ৩-০ চুনকাম সম্পূর্ণ হয়। তবে স্কোরবোর্ডের বাইরে ম্যাচ শেষের দৃশ্যটিও ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। কারণ শ্রেয়াস চাইলে শুধু নিজের দলের সতীর্থদের নিয়েই ট্রফি উদ্যাপন করতে পারতেন। তার বদলে তিনি প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে ডেকে নেন। জাদরানও সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং দুই অধিনায়ক একসঙ্গে ট্রফি হাতে দাঁড়ান। পরে ভারতীয় দলের ছবি তোলার সময়ও তাঁকে পাশে দেখা যায়। ফলে সিরিজের শেষ মুহূর্তে জয়ী এবং পরাজিত দলের সীমারেখার বদলে দেখা যায় দুই অধিনায়কের একসঙ্গে দাঁড়ানোর ছবি। এই দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক সুনীল গাওস্কর (Sunil Gavaskar)। তাঁর বক্তব্য, প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিজয়ী দলের ছবি তোলার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গাওস্করের মতে, চ্যাম্পিয়ন দলের ছবিতে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে জায়গা দেওয়া ক্রিকেটের সৌন্দর্যকে তুলে ধরে।
শ্রেয়াসের এই আচরণের প্রেক্ষাপট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ পুরো সিরিজটি ‘ফ্রেন্ডশিপ’ ভাবনাকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হয়েছিল। আফগানিস্তানের জন্য এটি ছিল হোম সিরিজ। কিন্তু ম্যাচের ভেন্যু ছিল দিল্লি। ফলে আয়োজক ও সফরকারী দলের পরিচিত কাঠামো কিছুটা বদলে গিয়েছিল। ভারতীয় দল নিজেদের দেশের মাঠেই খেললেও সিরিজের সরকারি কাঠামোয় ছিল অ্যাওয়ে দলের ভূমিকায়। উল্লেখ্য, সিরিজ শুরুর আগে থেকেই দুই দলের অধিনায়কের মধ্যে সৌহার্দ্যের ছবি দেখা গিয়েছিল। প্রথম ম্যাচের টসের সময়ও শ্রেয়স ও জাদরানকে একসঙ্গে দেখা যায়। সিরিজের শুরুতেই ‘ফ্রেন্ডশিপ কাপ’ ঘিরে যে আবহ তৈরি হয়েছিল, শেষ ম্যাচে ট্রফি হাতে দুই অধিনায়কের ছবি সেই আবহকেই আরও জোরালো করে।
ভারতীয় ক্রিকেটে শ্রেয়াসের নেতৃত্বের মেয়াদ এখনও তুলনামূলক ভাবে নতুন। ২০২৬ সালের একাধিক টি-টোয়েন্টি সিরিজে তাঁকেই অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছে নির্বাচক কমিটি। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য ঘোষিত ভারতীয় দলেও শ্রেয়সকে অধিনায়ক করা হয়েছিল। পরে তৃতীয় টি-টোয়েন্টির আগে ভারতীয় একাদশে একটি পরিবর্তন করা হয় এবং যশ ঠাকুর (Yash Thakur) দলে আসেন। তখনও শ্রেয়সই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। তবে নেতৃত্বের মূল্যায়ন শুধু রান, উইকেট কিংবা ম্যাচের ফল দিয়ে হয় না, মাঠের বাইরে আচরণও একটি অধিনায়কের ভাবমূর্তির অংশ হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ৩-০ জয়ের পর শ্রেয়সের সিদ্ধান্ত তাই আলাদা করে নজর কেড়েছে। প্রতিপক্ষকে হারানোর পরে তাঁকেই উদ্যাপনের ছবিতে ডেকে নেওয়া হয়েছে, এমন ঘটনা ক্রিকেটে বিরল নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক সিরিজের ট্রফি মঞ্চে তা দর্শকদের কাছে আলাদা তাৎপর্য তৈরি করে।
বিশেষ করে আফগানিস্তানের মতো দলের ক্ষেত্রে এই সৌহার্দ্যের ছবি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আফগান ক্রিকেট গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ক্রমশ বেড়েছে। ফলে মাঠে লড়াই যতই কঠিন হোক, ম্যাচের পরে দুই দলের খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সম্মান ক্রিকেটের বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ। তৃতীয় ম্যাচের আগে আফগানিস্তান সিরিজ হেরে গিয়েছিল। তবু জাদরান জানিয়েছিলেন, শেষ ম্যাচে জয় দিয়ে সিরিজ শেষ করার লক্ষ্য তাঁদের ছিল। ভারতীয় দল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও আফগান অধিনায়ক দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভারত ম্যাচটি বড় ব্যবধানে জিতে নেয়।
আর সেই ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। এক দিকে ভারতের ৩-০ সিরিজ জয়, অন্য দিকে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে পাশে রেখে ট্রফি উদ্যাপন। মাঠের লড়াইয়ে ভারত যতটা এগিয়ে ছিল, পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে শ্রেয়স ততটাই গুরুত্ব দিলেন প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানোর বিষয়টিকে। ‘ফ্রেন্ডশিপ কাপ’-এর নামের সঙ্গে তাই সিরিজের শেষ ছবিটিও মিলে গেল। ক্রিকেটে পরিসংখ্যান, রেকর্ড এবং ট্রফিই সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু দিল্লির এই ম্যাচের পরে আরও একটি ছবি সামনে এল, জয়ী দলের অধিনায়ক একা ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে নেই, পাশে রয়েছেন পরাজিত দলের অধিনায়কও। শ্রেয়াস আয়ার ও ইব্রাহিম জাদরানের সেই মুহূর্ত তাই ভারত-আফগানিস্তান সিরিজের স্কোরকার্ডের বাইরে আলাদা করে জায়গা করে নিল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kranti Goud fined 10 percent | এশিয়া কাপ জিতেও শাস্তি ভারতের বোলারের! ব্যাটারকে আউট করে কী করেছিলেন ক্রান্তি, হল জরিমানা




