সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি ১১ সেপ্টেম্বর : গালওয়ান সংঘর্ষের পর কেটে গিয়েছে ছ’বছরেরও বেশি সময়। ভারত-চিন সম্পর্কের সেই তিক্ত অধ্যায়ের পর এবার ফের দিল্লির মাটিতে পা রাখতে চলেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার দিল্লিতে আসার কথা তাঁর। দীর্ঘ ব্যবধানের পর চিনা প্রেসিডেন্টের এই ভারত সফর ঘিরে তাই কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কোন কোন বিষয় উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর।
২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনা সেনার সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়েছিল। সীমান্তে সেনা মোতায়েন, মুখোমুখি অবস্থান এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) নিয়ে তৈরি হওয়া টানাপড়েনের প্রভাব পড়েছিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেও। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ধীরে ধীরে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। এবার দিল্লিতে মোদী-শি মুখোমুখি বসলে সেই প্রক্রিয়া কতটা এগোয়, সেটিই বড় প্রশ্ন। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে মামল্লাপুরমে মোদী ও শি জিনপিংয়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর এই প্রথম ভারতে আসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ প্রায় সাত বছর পর তাঁর ভারত সফর। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের চেহারা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। একদিকে সীমান্তে উত্তেজনা, অন্যদিকে বাণিজ্যিক নির্ভরতা দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের কাছে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে শি জিনপিংয়ের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই আলোচনায় প্রথম সারিতেই থাকতে পারে সীমান্ত পরিস্থিতি। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, সেনা সংঘাতের সম্ভাবনা কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য আলোচনার পথ কী ভাবে এগোনো যায়, তা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হতে পারে। গালওয়ান-পরবর্তী সময়ে সীমান্তে পরিস্থিতি সামলাতে একাধিক দফায় সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে। তার ফলে কিছু এলাকায় উত্তেজনা কমলেও ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। তাই মোদী-শি বৈঠকে সীমান্ত নিয়ে কোনও নতুন বোঝাপড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। অরুণাচলকে নিয়ে চিনের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই নতুন দিল্লির সঙ্গে বেজিংয়ের মতবিরোধের অন্যতম কারণ। ভারতের উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে চিন। নয়াদিল্লি অবশ্য বার বার জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনায় সীমান্তের পাশাপাশি এই বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। জলসম্পদ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। ব্রহ্মপুত্র নদের উপর চিনের বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা ভারতের নজরে রয়েছে। তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশ করা এই নদীর জলপ্রবাহের উপর চিনের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। নদীর উজানে বড় বাঁধ বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হলে নীচের দিকে থাকা দেশগুলির জলসম্পদ ও পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জলসম্পদ ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
সীমান্তের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কও মোদী-শি বৈঠকের বড় বিষয় হতে পারে। ভারত ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই বাণিজ্যে ভারতের ঘাটতি বিপুল। দুই দেশের মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলেও, চিনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি ও রফতানির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য। চিন থেকে আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যের জন্য চিনের বাজারে আরও সুযোগ তৈরি করা নিয়েও নয়াদিল্লির আগ্রহ রয়েছে। বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা গিয়েছে। সরাসরি বিমান পরিষেবা পুনরায় চালু করা ও ভিসা সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার মতো পদক্ষেপ দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। কূটনৈতিক যোগাযোগও ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি কতটা স্থায়ী হয়, তার বড় পরীক্ষা হতে পারে দিল্লির বৈঠক। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিও এই সাক্ষাৎকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমেরিকার সঙ্গে ভারত ও চিন দুই দেশেরই সম্পর্কের নিজস্ব সমীকরণ রয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চিন দুই দেশই নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখতে আগ্রহী।
কিন্তু, মোদী-শি বৈঠক থেকে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন প্রত্যাশা নেই। সীমান্ত বিরোধ, অরুণাচল প্রদেশ, ব্রহ্মপুত্রের জলসম্পদ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং চিনের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত নির্ভরতার মতো একাধিক জটিল বিষয় রয়েছে। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনা অন্তত সেই সমস্যাগুলি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। গালওয়ানের পর ভারত-চিন সম্পর্কে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সেটি কাটানোই সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন ভারসাম্যে নিয়ে যাওয়া এবং পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলি চিহ্নিত করা, আগামী দিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তিনটি দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফর তাই নিছক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়া নয়। মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক ভারত-চিন সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে। সীমান্তে স্থিতাবস্থা, বাণিজ্যের ভারসাম্য, ব্রহ্মপুত্রের জল, অরুণাচল এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা দিল্লির বৈঠকে কোন ইস্যুতে কতটা অগ্রগতি হয়, এখন সেদিকেই নজর ভারত-চিন দুই দেশের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS | Programme for Economic Cooperation 2030, Modi Putin meeting Delhi : বিষকেকে বৈঠকের দু’সপ্তাহের মধ্যেই দিল্লিতে মোদী-পুতিন সাক্ষাৎ, বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা, আলোচনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়




