West Bengal food safety raid, rotten meat in Madhyamgram food court | মধ্যমগ্রামের মলে কেজি কেজি পচা মাংস! বাদুড়িয়ার রেস্তোরাঁয়ও উদ্ধার, খাদ্য দফতরের অভিযানে চাঞ্চল্য

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ উত্তর ২৪ পরগণা, ১ সেপ্টেম্বর : উত্তর ২৪ পরগনায় খাদ্যসুরক্ষা নিয়ে প্রশাসনের অভিযানে (West Bengal food safety raid) ফের চাঞ্চল্যকর ছবি সামনে এল। বাদুড়িয়ার একটি রেস্তোরাঁর রান্নাঘর থেকে বিপুল পরিমাণ পচা মাংস উদ্ধারের পর এ বার মধ্যমগ্রামের যশোর রোডের ধারে একটি বহুতল শপিং মলের একাধিক ফুড কোর্টে হানা দিয়ে পচা ও ছত্রাক ধরা মাংস, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী ও নানা অনিয়মের সন্ধান পেল প্রশাসন। খাদ্য দফতর, পুরসভা এবং পুলিশের যৌথ উদ্যোগে চলা এই অভিযানে কয়েকটি খাবারের দোকানের ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কোথাও লাইসেন্সের নথি ঠিক ছিল না, কোথাও আবার খাবার সংরক্ষণ ও রান্নার পরিবেশ নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানান সরকারি আধিকারিকেরা।

আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on Bengal disaster response force | অর্জুন বাহিনী গড়ছে রাজ্য, থাকবেন প্রাক্তন সেনা ও অগ্নিবীর! বিপর্যয় মোকাবিলায় বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

বাদুড়িয়ার ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই উত্তর ২৪ পরগনার খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার দিদিমণি রোডের একটি পরিচিত রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় প্রশাসন। সেখানে রান্নাঘরের একটি অংশ থেকে প্রায় ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া মাংসের মধ্যে মুরগি ও খাসির মাংস ছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। মাংসগুলি কেন সেখানে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রেস্তোরাঁর কর্মীদের তরফে প্রথমে দাবি করা হয়, নষ্ট হয়ে যাওয়া মাংস রান্নায় ব্যবহার করার জন্য রাখা হয়নি। সেগুলি ফেলে দেওয়ার কথা ছিল বলেই আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তবে খাদ্য দফতরের আধিকারিকেরা ওই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। ফলে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে। প্রয়োজনে রেস্তরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাদুড়িয়া এলাকায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় ঘোষ অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কয়েকটি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিয়ম না মেনে ব্যবসা চলছে। তাঁর দাবি, সরকারের অবস্থান কঠোর হওয়ার পরও কিছু ব্যবসায়ী পুরনো পদ্ধতিতে কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘খাবারের গুণমান এবং বাজারদর নিয়ে প্রশাসন যখন নজরদারি বাড়িয়েছে, তখন বেআইনি ভাবে ব্যবসা চালানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।’ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

বাদুড়িয়ার এই ঘটনার মধ্যেই সামনে আসে মধ্যমগ্রামের একটি বড় শপিং মলের ফুড কোর্ট। যশোর রোডের পাশের ওই মলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণ নানা বয়সের মানুষ সেখানে কেনাকাটার পাশাপাশি ফুড কোর্টে বসে খাবার খান। ছুটির দিনে ভিড় আরও বাড়ে। সেই জায়গাতেই খাবারের গুণমান ও সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে একাধিক অভিযোগের ছবি প্রশাসনের অভিযানে ধরা পড়েছে। মলের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় থাকা একাধিক ফুড কোর্টে পরিদর্শন চালান খাদ্যসুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা। সেখানে কয়েকটি জায়গায় পচা ও ছত্রাক ধরা মাংসের সন্ধান মেলে। পাশাপাশি মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাবারের প্যাকেট ও পানীয়ের বোতলও নজরে আসে। সরকারি আধিকারিকেরা খাবারের নমুনা ও সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী পরীক্ষা করার সময় কিছু দোকানের কর্মীরা তড়িঘড়ি করে ওই সামগ্রী ডাস্টবিনে ফেলে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযানের সময় খাবার কী ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা কেমন, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা হচ্ছে কি না, খাদ্যসামগ্রীর মেয়াদ ঠিক আছে কি না প্রভৃতি একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। কয়েকটি ফুড কোর্টের ক্ষেত্রে ব্যবসা চালানোর প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিয়েও সমস্যা ধরা পড়ে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, অনিয়মের মাত্রা দেখে কয়েক জন ব্যবসায়ীর লাইসেন্স ঘটনাস্থলেই বাতিল করা হয়েছে।

খাদ্য দফতরের আধিকারিকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু পচা মাংস উদ্ধারই নয়, খাবার তৈরির জায়গার পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম মানার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গাফিলতি রয়েছে। মলের মতো জনবহুল জায়গায় এমন পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ফুড কোর্টে খাবার খেতে আসা সাধারণ ক্রেতারা রান্নাঘরের ভিতরে কী হচ্ছে, তা নিজেরা যাচাই করার সুযোগ পান না। ফলে খাদ্যসামগ্রীর গুণমান বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপরই থাকে। উল্লেখ্য, এই অভিযানের সঙ্গে আট বছর আগের বহুল আলোচিত ভাগাড়ের মাংস-কাণ্ডের স্মৃতিও ফিরে এসেছে। ২০১৮ সালে কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পচা মাংস নিয়ে ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়েছিল। তদন্তকারীদের হাতে উঠে এসেছিল মৃত পশুর মাংস সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন জায়গায় সংরক্ষণ এবং পরে খাদ্য হিসেবে বাজারে পাঠানোর অভিযোগ। সেই সময় মাংস দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছিল।

তদন্তের সূত্র ধরে বাদুড়িয়া-সহ একাধিক জায়গায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ পচা মাংস উদ্ধার করেছিল পুলিশ ও প্রশাসন। একাধিক হোটেল ও রেস্তরাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় বহু মানুষ গ্রেফতার হন ও কয়েকটি খাবারের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই কারণে এ বার বাদুড়িয়ার একটি রেস্তরাঁ থেকে প্রায় ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধারের ঘটনায় পুরনো আতঙ্ক নতুন করে ফিরে এসেছে। কিন্তু, বর্তমান অভিযানের সঙ্গে ২০১৮ সালের ঘটনার সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও সামনে আসেনি। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য আপাতত খাদ্যসুরক্ষা আইন মেনে ব্যবসা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা এবং অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া। খাদ্যসামগ্রীর উৎস, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও প্রয়োজনে পরীক্ষা করা হতে পারে।

এদিকে পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়েও খাদ্যসুরক্ষা দফতরের অভিযান চালানো হয়েছে। জনপ্রিয় ল্যাংচা হাবের একাধিক মিষ্টির দোকান, হোটেল, ধাবা ও রেস্তোরাঁয় তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে খাবার তৈরি, সংরক্ষণ এবং ক্রেতাদের পরিবেশনের পদ্ধতিতে নানা ধরনের ত্রুটি সামনে আসে। কিছু খাদ্যসামগ্রী ও রান্নার উপকরণ নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় সেগুলি ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, রাজ্যজুড়ে খাদ্যের গুণমান যাচাইয়ের এই অভিযান এমন সময়ে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে, যখন বাজারে খাবারের দাম এবং খাদ্যসুরক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। কলকাতা থেকে জেলা রেস্তোরাঁ, হোটেল, মিষ্টির দোকান, ফুড কোর্ট ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। ক্রেতাদের অভিযোগের ভিত্তিতেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হতে পারে। প্রশাসনের এই ধারাবাহিক অভিযানে একটি বিষয় সামনে আসছে, শুধু খাবারের স্বাদ বা দাম নয়, রান্নার জায়গার পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যসামগ্রীর মেয়াদ, সংরক্ষণের নিয়ম এবং বৈধ লাইসেন্সও ক্রেতার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মধ্যমগ্রামের শপিং মল থেকে পচা মাংস ও মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার উদ্ধারের ঘটনায় তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, জনবহুল ফুড কোর্টগুলিতে নিয়মিত নজরদারি কতটা জরুরি। একই সঙ্গে বাদুড়িয়ায় পচা মাংস উদ্ধারের ঘটনাও দেখিয়ে দিল, খাদ্যসুরক্ষা নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি আরও কড়া না হলে সাধারণ ক্রেতাদের ঝুঁকি থেকেই যেতে পারে।

‘ক্রেতা সুরক্ষা সপ্তাহ’-কে সামনে রেখে রাজ্যজুড়ে চলা অভিযানে আগামী দিনে আরও প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের নজরে আসতে পারে। খাদ্যসামগ্রীতে অনিয়ম, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না কিংবা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা, কোনও ক্ষেত্রেই নিয়মভঙ্গ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন। ফলে মধ্যমগ্রাম, বাদুড়িয়া ও শক্তিগড়ের সাম্প্রতিক অভিযান শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়, বরং রাজ্যে খাদ্যসুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নজরদারির আওতায় আনার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Uzbekistan Visit 2026: উজবেকিস্তানে যোগের প্রসারে নতুন নজির, তাশখন্দে যোগাসনে প্রধানমন্ত্রী মোদী

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন