সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বিশকে : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif) যখন একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত, ঠিক সেই সময় সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কঠোর অবস্থান জানালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত ২৬তম সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজ়েশন বা এসসিও (SCO) সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কোনও ধরনের দ্বিমুখী নীতি মেনে নেওয়া যায় না বলে জানালেন মোদী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল সীমান্ত-পারের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া ও সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রসঙ্গ। সম্মেলনের দর্শকাসনে অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। তাঁর উপস্থিতিতেই মোদীর সন্ত্রাসবাদবিরোধী বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত-পারের সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। ফলে এসসিও-র মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পাকিস্তান প্রসঙ্গ না থাকলেও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কোনও দ্বৈত মানদণ্ড চলতে পারে না।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে রাষ্ট্রগুলি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে আশ্রয় দেয় কিংবা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে একযোগে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদকে কোনও দেশের কৌশলগত হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করার কথাও তিনি বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে সন্ত্রাসবাদের পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও। তাঁর কথায়, ‘সন্ত্রাসবাদের গোটা কাঠামোকে ধ্বংস করার জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই ধরনের গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার ক্ষেত্রে দেশগুলির মধ্যে অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নীতিগত জায়গায় ঐক্য থাকা দরকার। ভারতের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা নীতির প্রেক্ষাপটেও মোদীর এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। সেই ঘটনার পরেও সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে। এই আবহে এসসিও সম্মেলনের মঞ্চে মোদীর বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়েও কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিম এশিয়া ও ইউক্রেনে চলা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের পক্ষে মত দেন। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধের মাধ্যমে কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংঘাতের অবসানে কথোপকথন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের পথেই এগোতে হবে। মোদী বলেন, ‘সঙ্ঘতের শেষ পরিণতি আলোচনার টেবিলেই খুঁজে নিতে হয়।’ ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের কথা বলে আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতির পাশাপাশি সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও উঠে আসে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ যে শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণ ও বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার উপর পড়ছে। ফলে একটি অঞ্চলের যুদ্ধের অভিঘাত বহু দূরের দেশগুলির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বিশ্বের দক্ষিণাংশের উন্নয়নশীল দেশগুলি আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে তুলনামূলক ভাবে বেশি চাপের মুখে পড়ছে বলেও জানান মোদী। জ্বালানির দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে। তাই সংঘাত দ্রুত বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি তুলে ধরেন। সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধের পাশাপাশি মাদক পাচারের বিরুদ্ধেও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে মাদক চোরাচালানকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসাবে না দেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় হিসাবেও দেখার কথা উঠে আসে। তরুণ প্রজন্মের উপর মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্র এক দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় ব্যবহার করে তারা নিজেদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। তাই এই ধরনের অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। বিশকেকের এসসিও সম্মেলনে ভারত ও পাকিস্তান ছাড়াও একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin), চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping), ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান (Masoud Pezeshkian), বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজ়ান্ডার লুকাশেঙ্কো (Alexander Lukashenko), কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাশিম-জোমার্ট তোকায়েভ (Kassym-Jomart Tokayev), উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজ়িয়োয়েভ (Shavkat Mirziyoyev) এবং তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমোন (Emomali Rahmon) সম্মেলনে যোগ দেন।
ফলে এসসিও মঞ্চে মোদীর বক্তব্য শুধু ভারতীয় নিরাপত্তা নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো বিষয়কে সামনে রেখে তিনি বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি ও আলোচনার পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরা ও একই বক্তৃতায় যুদ্ধের অবসানে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে মোদীর বক্তব্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। এক দিকে নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান, অন্য দিকে সংঘাতের সমাধানে কথাবার্তা এসসিও মঞ্চে ভারতের অবস্থান এভাবেই তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit 2026 India, Modi Pezeshkian meeting | সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে পেজেশকিয়ান, BRICS সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা! নজরে চবাহার-সহ ভারত-ইরান সম্পর্ক




