সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বন্যা, হড়পা বান, পাহাড়ি ধস কিংবা সুন্দরবনের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে নতুন বাহিনী গড়ার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে চলেছে বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী ‘অর্জুন বাহিনী’। মঙ্গলবার এই বাহিনী গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। প্রথম পর্যায়ে রাজ্য সৈনিক বোর্ডের মাধ্যমে ২০০ জন প্রাক্তন সেনাকর্মীকে নিয়ে বাহিনী তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বয়স ৪০ বছরের মধ্যে থাকা অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীদেরই প্রথম দফায় এই বাহিনীতে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে সাধারণ প্রশাসনিক পরিকাঠামোর পাশাপাশি দ্রুত প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই নতুন বাহিনী তৈরির সিদ্ধান্ত বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। সেনাবাহিনীতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের বিপর্যয় মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হবে। ভবিষ্যতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অগ্নিবীর প্রকল্পের অধীনে চার বছরের মেয়াদ শেষ করে বেরিয়ে আসা কর্মীদেরও এই বাহিনীতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, সুন্দরবন ও পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এই বাহিনীকে কাজে লাগানো হবে। তাঁর কথায়, ‘সুন্দরবন, পাহাড়ের মতো জায়গা, যেখানে বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে, সেখানে এই বাহিনীকে মোতায়েন করা হবে।’ ফলে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস কিংবা অন্য কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে ‘অর্জুন বাহিনী’।
প্রথম পর্যায়ে ২০০ জনকে নিয়ে বাহিনী গঠনের কথা বলা হলেও বাহিনীর সম্ভাব্য মোতায়েন কাঠামো নিয়ে প্রশাসনিক মহলে আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্রের খবর। কলকাতায় ১০০ জন, পাহাড়ি এলাকায় ১০০ জন ও সুন্দরবনে ৫০ জনকে রাখার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। সেই হিসাবে পরবর্তী পর্যায়ে বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে। কোন এলাকায় কত জনকে রাখা হবে, বিপর্যয়ের ধরন অনুযায়ী তাঁদের কী ভাবে কাজে লাগানো হবে, সেই পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে। ‘অর্জুন বাহিনী’কে শুধু নামমাত্র উদ্ধারকারী দল হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে না রাজ্য। কেন্দ্রীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফের (NDRF) ধাঁচে তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম এলাকা, জলবন্দি অঞ্চল কিংবা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি আধুনিক সরঞ্জাম ও পরিকাঠামোর ব্যবস্থাও করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে সময়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোনও এলাকায় বন্যার জল ঢুকে গেলে বা পাহাড়ি এলাকায় ধস নামলে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় স্তরে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। রাজ্যের পরিকল্পনায় ‘অর্জুন বাহিনী’ সেই কাজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বাহিনীতে থাকা প্রাক্তন সেনাকর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে দুর্যোগ মোকাবিলার কাজে ব্যবহার করাই রাজ্য সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি অগ্নিবীরদের ভবিষ্যতে এই বাহিনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকায় সেনা-অভিজ্ঞ তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের একটি ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। বাহিনীর সদস্যদের জন্য আর্থিক সুবিধার কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘অর্জুন বাহিনী’র প্রধানকে ‘বীর নায়ক’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর মাসিক সাম্মানিক হবে ৪০ হাজার টাকা। বাহিনীর অন্যান্য সদস্য, অর্থাৎ ‘বীর’দের প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। তাঁদের সাম্মানিক প্রতি বছর ৩ শতাংশ হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলার কাজে ঝুঁকিও কম নয়। বন্যা, পাহাড়ি ধস, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে উদ্ধারকর্মীদের নিজেদের জীবন বিপন্ন করে কাজ করতে হয়। তাই বাহিনীর সদস্যদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনও সদস্যের প্রাণহানি হলে তাঁর পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। গুরুতর আঘাতের কারণে কোনও সদস্য শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময়ে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে সুন্দরবন এবং পাহাড় দুই এলাকাই আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। অন্য দিকে, পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি হলে ধস নামার আশঙ্কা থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে উদ্ধারকারী দলের ঘটনাস্থলে পৌঁছনোও কঠিন হয়। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্তরে প্রশিক্ষিত বাহিনী থাকলে উদ্ধারকাজ দ্রুত শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কলকাতাকেও এই বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র হিসাবে রাখা হচ্ছে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ড, জলমগ্নতা, ভবন ধস কিংবা অন্য কোনও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজের প্রয়োজন হয়। কলকাতায় প্রস্তাবিত ১০০ সদস্যের দল সেই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে সহায়তা করতে পারে। অন্য দিকে, অগ্নিবীরদের এই বাহিনীতে ভবিষ্যতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চার বছরের সামরিক পরিষেবা শেষ করার পর অগ্নিবীরদের দক্ষতা যাতে অন্য ক্ষেত্রেও কাজে লাগে, সেই সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ কার্যকর হলে সেনা-অভিজ্ঞ কর্মীদের বিপর্যয় মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্ত করার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হবে।
মঙ্গলবারের ঘোষণায় তাই শুধু একটি নতুন বাহিনী গঠনের কথাই নয়, তার প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, মোতায়েন, সাম্মানিক এবং ক্ষতিপূরণ— একাধিক বিষয় সামনে এসেছে। এখন নজর থাকবে প্রথম দফার ২০০ সদস্য কী ভাবে বাছাই করা হয়, তাঁদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং কোন কাঠামোয় ‘অর্জুন বাহিনী’কে মাঠে নামানো হয় তার দিকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও ধরন বদলাচ্ছে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও বন্যা, কখনও পাহাড়ি ধস আবার কখনও ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সময়ে প্রশিক্ষিত প্রাক্তন সেনা ও অগ্নিবীরদের নিয়ে তৈরি একটি বিশেষ বাহিনী কতটা কার্যকর হয়, আগামী দিনে তার দিকেই নজর থাকবে। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘অর্জুন বাহিনী’ ধীরে ধীরে দুর্যোগ মোকাবিলার রাজ্য কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mohan Bhagwat Muslim Remark, RSS Centenary, Hindutva and Muslims | ‘মুসলিমকে ভারতে থাকতে দেওয়া যাবে না’ ভাবলে তিনি হিন্দুই নন, নিউ ইয়র্কে মোহন ভাগবতের মন্তব্য ঘিরে নতুন রাজনৈতিক চর্চা




