সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: কৃষি নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী এখনও কর্মসংস্থানের অপেক্ষায়। গত এক দশকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ পড়ুয়া পাশ করলেও তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮ লক্ষ এখনও কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাননি। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর কৃষি শিক্ষার সঙ্গে চাকরি ও পেশাগত ভবিষ্যতের যোগ আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দিল কেন্দ্রীয় সরকার। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিকে পড়াশোনার পাশাপাশি পড়ুয়াদের কর্মসংস্থানের দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান (Shivraj Singh Chouhan)। গত মঙ্গলবার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যদের ৩৬তম বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৃষি শিক্ষার পর কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান।
সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ পড়ুয়া শিক্ষা শেষ করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৭ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এখনও প্রায় ৮ লক্ষ পড়ুয়া কাজের অপেক্ষায় রয়েছেন। সংখ্যার বিচারে এই অংশটি ছোট নয় বলেই কৃষি শিক্ষার বর্তমান কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী মনে করেন, কোনও পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর তাঁর কর্মজীবনের গতিপথ সম্পর্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য থাকা দরকার। কতজন পড়ুয়া পাশ করলেন, তাঁদের মধ্যে কতজন চাকরি পেলেন, কতজন কৃষি ক্ষেত্রে যুক্ত হলেন, কতজন নিজের উদ্যোগে কাজ শুরু করলেন ও কতজন এখনও কর্মসংস্থানের সন্ধানে রয়েছেন, এই তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাঁদের প্রাক্তন পড়ুয়াদের সম্পর্কে অনুসরণমূলক তথ্য রাখার পরামর্শ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী।
শিবরাজ সিং চৌহানের বক্তব্য, শিক্ষা শেষ করার পর যদি একজন তরুণকে দীর্ঘ সময় ধরে শুধু চাকরির সন্ধানে ঘুরতে হয়, তা হলে শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কৃষি শিক্ষাকে এমন ভাবে সাজানো দরকার, যাতে পড়ুয়ারা ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্যও প্রস্তুত হতে পারেন। কৃষির সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত কাজের বাইরে বর্তমানে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন, কৃষি প্রযুক্তি, বীজ, মাটি পরীক্ষা, জল ব্যবস্থাপনা ও কৃষি-উদ্যোগের মতো একাধিক ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষেত্রগুলির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানোও জরুরি হয়ে উঠেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যদের এই সম্মেলনে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ বা আইসিএআর (Indian Council of Agricultural Research) -এর শীর্ষ আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় কৃষি প্রতিমন্ত্রী রামনাথ ঠাকুরও (Ramnath Thakur) কৃষি শিক্ষার পর কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যানেও গত এক দশকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা প্রায় ২৫ লক্ষ পড়ুয়ার মধ্যে প্রায় ১৭ লক্ষের কর্মসংস্থানের কথা উঠে এসেছিল।
কৃষি শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ার বিষয়েও সতর্ক করেছেন শিবরাজ সিং চৌহান। তাঁর বক্তব্য, দেশে একের পর এক বেসরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। কৃষি শিক্ষা দেওয়ার নামে কোনও প্রতিষ্ঠান যাতে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কাজ করতে না পারে, সে জন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। কৃষি শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, পরিকাঠামো এবং পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত লক্ষ্য থাকা দরকার বলে তিনি জানান। কৃষি শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন হলেও মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না, কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যে এমন দিকও উঠে এসেছে। বেসরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিক্ষার মান যাচাই ও স্বীকৃতির ব্যবস্থাও কার্যকর হওয়া দরকার। কারণ কৃষি ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা নেওয়া পড়ুয়ারা শুধু নিজেদের কর্মজীবনের জন্য নয়, ভবিষ্যতে দেশের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হবেন। তাঁদের প্রশিক্ষণের মানের উপর কৃষি গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের কাজের মানও অনেকটা নির্ভর করে।
সম্মেলনে কৃষি গবেষণা ও কৃষকের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও একাধিক প্রস্তাব সামনে আসে। কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র বা কেভিকে (Krishi Vigyan Kendra)-গুলিকে আরও শক্তিশালী করার দাবি ওঠে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠে পৌঁছে দেওয়ার কাজে কেভিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই কেভিকে-গুলির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ এবং তাদের পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির গবেষণা যাতে শুধু গবেষণাগার বা প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। মাঠের কৃষকের সমস্যা, স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির ধরন, জলাভাব, ফসলের বৈচিত্র্য ও বাজারের চাহিদাকে সামনে রেখে গবেষণার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। গবেষণা থেকে পাওয়া ফল দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের খরচ কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রাকৃতিক কৃষি নিয়েও সম্মেলনে প্রস্তাব এসেছে। দেশে প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে প্রথম বিশেষায়িত কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ব্লক স্তরে ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার ইউনিট তৈরির প্রস্তাবও সামনে এসেছে। কৃষি শিক্ষায় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কৃষি শিক্ষার স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ চলছে। কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা দফতরের সচিব এবং আইসিএআরের ডিরেক্টর জেনারেল মাঙ্গি লাল জাত (Mangi Lal Jat) জানিয়েছেন, কৃষি শিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাক্রেডিটেশন পদ্ধতিকে নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত সমমান বা ইকুইভ্যালেন্স ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমমান নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে।
সম্মেলনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। কৃষি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক কৃষি পর্যবেক্ষণ, উন্নত বীজ, জল ব্যবস্থাপনা ও কৃষিপণ্যের ডিজিটাল বিপণনের মতো নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ফলে কৃষি শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে। পড়ুয়ারা যদি নতুন প্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হন, তা হলে পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁদের সামনে পেশার পরিধিও বাড়তে পারে। এদিকে কৃষিপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেছেন শিবরাজ সিং চৌহান। সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষক যে দাম পান ও সাধারণ ভোক্তা যে দামে পেঁয়াজ কেনেন, তার মধ্যে ব্যবধান কমানো সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষককে উৎপাদনের ন্যায্য দাম দেওয়ার পাশাপাশি বাজারে ক্রেতার উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি বলে তিনি জানান। শিবরাজ সিং চৌহান জানান, কৃষকদের যাতে অত্যন্ত কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে না হয়, তার জন্য সরকার মার্কেট ইন্টারভেনশন স্কিম বা এমআইএস (Market Intervention Scheme) -এর আওতায় পেঁয়াজ সংগ্রহ করেছিল। কৃষকের হাতে দাম না থাকলে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আবার বাজারে সরবরাহ কমে গেলে সাধারণ ক্রেতার উপরও চাপ বাড়ে। তাই উৎপাদক ও ভোক্তা, দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় কাজ বলে তিনি জানিয়েছেন।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সম্মেলনে কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গকে সামনে এনে কৃষিমন্ত্রীর এই বক্তব্য তাই শুধু চাকরির সংখ্যা নিয়ে নয়, গোটা কৃষি শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। প্রায় ২৫ লক্ষ পড়ুয়ার মধ্যে ৮ লক্ষের কর্মসংস্থান না হওয়ার পরিসংখ্যান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সামনে বড় প্রশ্ন রেখেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে যদি নিয়মিত ভাবে প্রাক্তন পড়ুয়াদের কর্মজীবনের তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, তা হলে আগামী দিনে কোন ধরনের পাঠ্যক্রম পড়ুয়াদের জন্য বেশি কার্যকর হচ্ছে, কোন ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে ও কোথায় শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেতরের দূরত্ব রয়ে যাচ্ছে তার একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, কৃষি শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক জোরদার করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা আর কৃষিভিত্তিক শিল্পের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। শুধু ডিগ্রি অর্জনই না, পড়ুয়ারা যাতে চাকরি, গবেষণা, কৃষি-উদ্যোগ কিংবা নিজস্ব ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজগতে প্রবেশ করতে পারেন, সেই প্রস্তুতিও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হওয়া দরকার। ৮ লক্ষ কৃষি স্নাতকের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন সামনে রেখে কেন্দ্র যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছে, আগামী দিনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কাজের মূল্যায়নে সেই কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Solar Energy Agriculture India, Narendra Modi | সৌরশক্তিতে কৃষির বদল, ভারতের মডেল বিশ্বে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




