PM Narendra Modi Pezeshkian Meeting | পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদীর বৈঠক, হরমুজ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ প্রকাশ বিশকেকে

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিম এশিয়ায় ফের সামরিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের (Masoud Pezeshkian) সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (Shanghai Cooperation Organisation) সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার এই সাক্ষাৎ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মোদী ও পেজ়েশকিয়ান সরাসরি বৈঠকে বসলেন। পশ্চিম এশিয়ার চলতি পরিস্থিতি, হরমুজ় প্রণালীর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপরে সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে। সোমবার থেকেই বিশকেকে শুরু হয়েছে এসসিও-র রাষ্ট্রনেতাদের সম্মেলন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সম্মেলনের পাশাপাশি একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেই ধারাবাহিকতায় ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং সংঘাতের আঁচ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।

আরও পড়ুন : Northern Sea Route India, India Russia Maritime Trade | ২০২৭-এই রাশিয়ামুখী ভারতের নতুন সমুদ্রপথ! নর্দার্ন সি রুটে প্রথম কার্গো জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি

বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, পেজ়েশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান মোদী। দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লির অবস্থান হল, সংঘাতের বদলে আলোচনা ও কূটনৈতিক পথেই সমস্যার সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলতে থাকা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভারত সেই অবস্থানই ফের তুলে ধরেছে বলে সূত্রের খবর। বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ় প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণ হয়। ফলে ওই এলাকায় সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সেই কারণেই হরমুজ় প্রণালী দিয়ে অসামরিক জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের প্রয়োজনীয়তার কথা পেজ়েশকিয়ানের কাছে তুলে ধরেন মোদী।

পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ভারত মনে করে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা জরুরি। সংঘাতের পরিস্থিতিতে নাবিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পরিবহণ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই হরমুজ় প্রণালীর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তার দিকে নয়াদিল্লি জোর দিয়েছে। এর মধ্যেই সোমবার ভোরে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হরমুজ় প্রণালীর কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে আমেরিকা হামলা চালিয়েছে বলে তেহরানের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে। পাল্টা ইরানও পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠকের সময়ই সামরিক সংঘাতের আবহ আরও ঘনীভূত ছিল।

এর আগে জুলাই মাসেও ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়েছিল আমেরিকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei) নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয় বলে সূত্রের বর্ণনায় উঠে এসেছে। তার পর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়তে থাকে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থানও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান ওই জলপথে অবরোধের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্বের কারণে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি পরিবহণ, পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতেই এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে বিশকেকে পৌঁছেছেন পেজ়েশকিয়ান। কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে বিভিন্ন দেশের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। এসসিও-র মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, ভারতের অবস্থানও এই বৈঠকের মাধ্যমে আরও একবার সামনে এসেছে। নয়াদিল্লি কোনও পক্ষের সামরিক অবস্থানকে সমর্থন না করে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে। একই সঙ্গে ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজ, নাবিক এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তার বিষয়টিও দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালী নিয়ে মোদীর বক্তব্যে সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।

সোমবার ভোরে জর্ডনের কিং হুসেন এবং আল আজ়রাক এলাকায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলেও তেহরানের তরফে দাবি করা হয়েছে। ইরান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘আগ্রাসনের শাস্তি’। হামলায় জর্ডনে থাকা মার্কিন প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। যদিও সংঘাতের প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের ভূমিকার দিকে নজর বাড়ছে। এক দিকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক, অন্য দিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ দুই দিকই দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসে সংঘাত কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানেরই অংশ।

মোদী ও পেজেশকিয়ানের এই বৈঠকের পরে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অবস্থান ফের আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে হরমুজ় প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ আগামী দিনে কূটনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ভারত যে সক্রিয়ভাবে নিজের অবস্থান জানাচ্ছে, এই বৈঠক তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিশকেকের এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে পেজ়েশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর আরও কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক রয়েছে। তার মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) সঙ্গে আলোচনাও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে এসসিও সম্মেলন শুধু বহুপাক্ষিক আলোচনা নয়, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতারও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। মোদী-পেজ়েশকিয়ান আলোচনায় হরমুজ প্রণালী, অসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টি যে গুরুত্ব পেয়েছে, তা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও তাৎপর্য বহন করতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit 2026 India, Modi Pezeshkian meeting | সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে পেজেশকিয়ান, BRICS সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা! নজরে চবাহার-সহ ভারত-ইরান সম্পর্ক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন