সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কৃষ্ণনগর, ১৯ আগস্ট : ভারতীয় সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মহিলাদের পোশাক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় বড় আইনি ধাক্কা খেলেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra)। একাধিক বার সমন পাঠানোর পরেও আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে কৃষ্ণনগর আদালত। বুধবার কৃষ্ণনগরের জেএম তৃতীয় আদালতের বিচারক দিব্যেন্দু দাস (Dibyendu Das) এই নির্দেশ দিয়েছেন বলে মামলাকারীর আইনজীবী জানিয়েছেন। ফলে সাংসদের বিরুদ্ধে চলা মামলাটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিল।
মামলাটি দায়ের করেছিলেন কৃষ্ণনগরের নাজিরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা চয়ন নন্দী (Chayan Nandi)। তাঁর অভিযোগ, মহুয়া মৈত্র বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও জওয়ানদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah), মহিলাদের পোশাক ও ধর্মীয় প্রতীক নিয়েও তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে আপত্তি রয়েছে বলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। মামলাকারীর দাবি, ওই বক্তব্যগুলি সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং মহিলাদের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ণ করতে পারে। মামলাকারীর আইনজীবী শীর্ষেন্দু দাস (Shirsendu Das) জানিয়েছেন, এই মামলায় আগেও একাধিক বার মহুয়া মৈত্রের নামে সমন জারি করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে নির্দিষ্ট তারিখে সশরীরে হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ, কোনও শুনানির দিনই তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। শেষ পর্যন্ত আদালতে সশরীরে হাজিরার জন্য নির্ধারিত দিনেও সাংসদ না আসায় বিচারক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
মামলাকারীর আইনজীবীর বক্তব্য, ‘বার বার সমন পাঠানো হলেও কোনও তারিখে তিনি আদালতে হাজির হননি।’ তাঁর দাবি, মামলায় যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছে, তার মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও জওয়ানদের নিয়ে মন্তব্য ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে বক্তব্য, মহিলাদের তুলসীমালা, বোরখা ও হিজাব পরানো সংক্রান্ত মন্তব্য এবং নারীর শালীনতা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। মহুয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita) এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita) একাধিক ধারার উল্লেখ করা হয়েছে বলে মামলাকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ণ করা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ বা উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত, ভয় দেখানোর অভিযোগ এবং ঘৃণাভাষণের সঙ্গে সম্পর্কিত ধারাগুলি। তবে মামলার অভিযোগ এবং আদালতের প্রক্রিয়া এখনও বিচারাধীন; অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন কোনও সিদ্ধান্ত আদালত দেয়নি।
গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর স্বাভাবিক ভাবেই মহুয়া মৈত্রের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি কৃষ্ণনগরের লোকসভা সাংসদ। সংসদে ও সংসদের বাইরে নানা বিষয়ে সরব থাকার কারণে জাতীয় রাজনীতিতেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। এর আগে তাঁর একাধিক মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবার আদালতে অনুপস্থিতির কারণে সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেল। মামলাকারী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত বার বার সশরীরে হাজিরার নির্দেশ দিয়েছিল। সমনের পরেও হাজিরা না দেওয়ায় আদালতের হাতে শেষ পর্যন্ত পরোয়ানা জারির পথ খোলা থাকে। বুধবার সেই নির্দেশই দেওয়া হয়েছে। এখন মহুয়া আদালতে কী ভাবে হাজির হন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হয়, সে দিকে নজর থাকবে।
এই ঘটনার মধ্যে মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে চলা অন্য একটি সাম্প্রতিক ঘটনাও ফের আলোচনায় এসেছে। কিছু দিন আগে অন্য একটি মামলার সূত্রে নদিয়ার হোগলবেড়িয়া থানায় হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সেই মামলায় পুলিশি প্রক্রিয়া মেনে থানায় যাওয়ার পর রাতে কৃষ্ণনগরের সার্কিট হাউসে থাকার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেখানে রাত কাটানোর সময় তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন সাংসদ। মহুয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, রাতে তাঁকে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল। একই সময়ে বাইরে বিজেপি (BJP)-র কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সমাজমাধ্যমে একাধিক ভিডিয়ো প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিয়োগুলিতে নিজের অবস্থান আর রাতের ঘটনার বিবরণ দেন সাংসদ। পরে এই ঘটনা নিয়ে লোকসভার স্পিকারকেও তিনি চিঠি লিখেছিলেন।।দুই ঘটনার আইনি প্রেক্ষাপট অবশ্য আলাদা। একটি ঘটনায় থানায় হাজিরা ও সার্কিট হাউসে থাকার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ সামনে এসেছিল। অন্য দিকে, বর্তমান মামলাটি মহুয়ার বিভিন্ন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দায়ের হয়েছে। এই মামলাতেই আদালতে একাধিক বার সমন পাঠানোর পরেও হাজির না হওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মহুয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি কৃষ্ণনগর এলাকায় রাজনৈতিক ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি এই কেন্দ্রের নির্বাচিত সাংসদ এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে প্রায়ই বিরোধী দলগুলির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছে। তাঁর মন্তব্য নিয়ে আগে তৃণমূলের অভ্যন্তরেও আলোচনা হয়েছে। আবার বিরোধীরা তাঁর বক্তব্যকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক আক্রমণ করেছে। এবার সেই মন্তব্যের সূত্র ধরে দায়ের হওয়া মামলায় আদালতের পদক্ষেপ সামনে আসায় রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। কিন্তু, আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারাধীন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া মানেই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। আদালতের পরবর্তী শুনানিতে মামলার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হবে। মহুয়া মৈত্রের পক্ষ থেকেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি পরবর্তী সময়ে আদালতে হাজির হয়ে পরোয়ানা সংক্রান্ত বিষয়ে নিজের অবস্থান জানাতে পারেন।
মামলাকারী পক্ষ অবশ্য আদালতের এই পদক্ষেপকে নিজেদের অভিযোগের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখছে। তাঁদের বক্তব্য, আদালতের সমন উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় হাজির না হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিচারক শেষ হাজিরার দিন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এখন সাংসদের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, এই মামলার প্রভাব মহুয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কতটা পড়বে। কৃষ্ণনগরের সাংসদ হিসেবে তাঁকে এক দিকে সংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়, অন্য দিকে একাধিক মামলার আইনি প্রক্রিয়াতেও অংশ নিতে হচ্ছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর সেই আইনি বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণনগর আদালতের বুধবারের নির্দেশ তাই মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে চলা মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব যোগ করল। সেনাবাহিনী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মহিলাদের পোশাক থেকে ধর্মীয় অনুভূতি, বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় এখন আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষা। বহু বার সমনের পরেও হাজিরা না দেওয়ার অভিযোগের জেরে যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তার পর মহুয়া মৈত্র কী আইনি পথ নেন, সেটিই এখন নজরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mahua Moitra moves Calcutta High Court over FIR fears and security concerns | পুরনো এফআইআর ঘিরে আইনি চাপের আশঙ্কা, হাই কোর্টে জোড়া মামলা সাংসদ মহুয়া মৈত্রর, চাইলেন সুরক্ষা ও স্বাধীনভাবে কাজের নিশ্চয়তা




