সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ সাশ্রয় নিউজ : কলকাতা পুরসভায় (Kolkata Municipal Corporation) ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়তে চলেছে। ১৪৪টি ওয়ার্ড থেকে এবার কলকাতা পুরসভার মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা বেড়ে হতে চলেছে ২০৯। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশনের (Delimitation) প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই আরও এক ধাপ এগিয়েছে। সংশোধনী বিল বিধানসভায় পাস হয়ে গিয়েছে। এখন অপেক্ষা রাজ্যপালের অনুমোদনের। সেই অনুমোদন মিললেই নতুন কাঠামো কার্যকর করার পথে এগোবে রাজ্য সরকার। তার পর গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০৯টি ওয়ার্ডের সীমানা-সহ নতুন খসড়া প্রকাশ করা হবে। সেই খসড়া প্রকাশের পর সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতামত ও আপত্তি জানানোর সুযোগ পাবেন। পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর সূত্রে খবর, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। নতুন খসড়া সামনে এলে কলকাতার কোন পুরনো ওয়ার্ডের কোন অংশ ভেঙে নতুন কোন ওয়ার্ড তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান হতে পারে। একই সঙ্গে জানা যাবে নতুন ওয়ার্ডগুলির ক্রমিক নম্বর, সীমানা ও সংশ্লিষ্ট অংশের বিন্যাস। ফলে শুধু পুর প্রশাসন নয়, আসন্ন পুরভোটের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এই পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।
বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় ১৪৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনসংখ্যা ও ভোটারের সংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোথাও তুলনামূলক কম ভোটার, আবার কোনও কোনও ওয়ার্ডে জনসংখ্যা ও ভোটারের চাপ অনেক বেশি। সেই ভারসাম্যহীনতা কমাতেই ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে পুর প্রশাসন সূত্রে খবর। নতুন ব্যবস্থায় বড় ওয়ার্ডগুলির একটি অংশ ভাগ হয়ে একাধিক ছোট ওয়ার্ড তৈরি হতে পারে। এই পুনর্বিন্যাসের প্রভাব শুধু ভোটের অঙ্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কলকাতা পুরসভার নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থার উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে বড় আয়তনের বা বেশি জনসংখ্যার ওয়ার্ডগুলিতে পুরকর্মী ও আধিকারিকদের উপর পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তুলনামূলক বেশি। রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলো, স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা অন্যান্য পুর পরিষেবা, এসব ক্ষেত্রেই জনসংখ্যার চাপ প্রশাসনিক কাজে প্রভাব ফেলে। ওয়ার্ড ছোট হলে নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে কাজ করার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে বলে মনে করছে পুর প্রশাসনের একাংশ।
নতুন ডিলিমিটেশন নিয়ে অবশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি প্রশ্নও রয়েছে। ১৪৪টি পুরনো ওয়ার্ডের মধ্যে কোন কোন ওয়ার্ড ভাগ হবে, একটি পুরনো ওয়ার্ড ভেঙে কতগুলি নতুন ওয়ার্ড তৈরি হবে, নতুন ওয়ার্ডগুলির নম্বর কী হবে, এই তথ্য এখনও সাধারণ মানুষের সামনে পুরোপুরি আসেনি। নতুন খসড়া প্রকাশিত হলেই সেই ছবিটা অনেকটাই পরিষ্কার হবে। একই সঙ্গে কোন এলাকার কোন বুথ বা ভোটকেন্দ্র নতুন ওয়ার্ডের আওতায় পড়ছে, তা নিয়েও ধারণা পাওয়া যাবে। পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রাথমিক কাজের ক্ষেত্রে ভোটারের সংখ্যা অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন পুরনো ওয়ার্ডের অংশকে চিহ্নিত করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজি অক্ষর ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে সেই অংশগুলিকে নতুন ওয়ার্ডের ক্রমিক নম্বরের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ হয়েছে। ফলে নতুন মানচিত্র প্রকাশিত হলে পুরনো ওয়ার্ডের সঙ্গে নতুন কাঠামোর তুলনা করার সুযোগও থাকবে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের সীমানা বদলালে ভোটের সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। একটি পুরনো ওয়ার্ডের যে অংশে কোনও একটি দলের সংগঠন শক্তিশালী, সেই অংশ নতুন ওয়ার্ডে অন্য এলাকার সঙ্গে যুক্ত হলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্ক বদলাতে পারে। একই ভাবে নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে নতুন করে প্রার্থী বাছাই, সংগঠন সাজানো ও ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর পরিকল্পনাও করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলিকে। তবে এখনই কোনও ওয়ার্ডে রাজনৈতিক সমীকরণ কী ভাবে বদলাবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। কারণ নতুন সীমানার সরকারি খসড়া প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোন এলাকা কোন ওয়ার্ডে যাচ্ছে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য ছবি পাওয়া যাবে না। প্রশাসনের তরফে খসড়া প্রকাশের পর নাগরিক এবং রাজনৈতিক দলগুলির আপত্তি ও মতামত গ্রহণ করা হবে। সেই প্রক্রিয়ায় কোনও পরিবর্তনের দাবি উঠলে তা পর্যালোচনা করা হতে পারে।
পুর প্রশাসনের একাংশের মতে, নতুন কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হল পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীকৃত করা। ছোট এলাকার জন্য আলাদা প্রশাসনিক নজরদারি থাকলে স্থানীয় সমস্যার দিকে দ্রুত নজর দেওয়া সম্ভব হতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় নিকাশি সমস্যা, রাস্তার বেহাল দশা, পানীয় জলের সমস্যা বা বর্জ্য অপসারণ নিয়ে অভিযোগ থাকলে তুলনামূলক ছোট ওয়ার্ড কাঠামোয় তা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলেই নাগরিক পরিষেবার মান রাতারাতি বদলে যাবে, এমন নয়। পরিষেবা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত পুরকর্মী, পরিকাঠামো, বাজেট ও প্রশাসনিক সমন্বয়ও প্রয়োজন। ওয়ার্ডের আয়তন কমলেও যদি প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো না বাড়ে, তা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই নতুন ডিলিমিটেশনের পাশাপাশি পুর প্রশাসনের সামনে পরিষেবা পরিকাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কলকাতার রাজনৈতিক মানচিত্রেও এই পরিবর্তন নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। নতুন ওয়ার্ডের সংখ্যা ২০৯ হলে ভবিষ্যতের পুর নির্বাচনে প্রার্থী সংখ্যা বাড়বে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যেও নতুন করে সমীকরণ তৈরি হতে পারে। বহু এলাকায় বর্তমান কাউন্সিলরের ওয়ার্ডের সীমানা বদলে গেলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে নতুন ওয়ার্ডে নতুন মুখকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে দলগুলির কাছে। এখন নজর রাজ্যপালের অনুমোদনের দিকে। সংশোধনী বিল ইতিমধ্যেই বিধানসভায় পাস হওয়ায় পরবর্তী প্রশাসনিক ধাপ অনেকটাই নির্ভর করছে সেই অনুমোদনের উপর। অনুমোদন পাওয়ার পর গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ২০৯টি ওয়ার্ডের নতুন সীমানার খসড়া সামনে আনার প্রক্রিয়া এগোবে। তারপরই নাগরিক এবং রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য শোনা হবে।
কলকাতা পুরসভার এই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস তাই শুধু সংখ্যা বাড়ানোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নাগরিক পরিষেবা, ভোটার বিন্যাস, পুরভোটের সমীকরণ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ১৪৪ থেকে ২০৯, এই বড় পরিবর্তনের পরে কলকাতার কোন এলাকা কোন ওয়ার্ডে যাচ্ছে, কার পুরনো ওয়ার্ড ভাগ হচ্ছে এবং নতুন সীমানায় কোন রাজনৈতিক অঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তার উত্তর মিলবে নতুন খসড়া প্রকাশের পরেই। সেই কারণেই এখন কলকাতার পুর প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল—সকলের নজর নতুন ডিলিমিটেশন তালিকার দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Urea subsidy in India, Urea price for farmers | ৩ হাজার টাকার ইউরিয়া কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ টাকায়! মোদী সরকারের সার ভর্তুকিতে কতটা সুরাহা কৃষকের, জানুন পুরো হিসাব




