সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে (Sheikh Hasina) দেশে ফেরানো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি আইনি প্রশ্নও ক্রমশঃ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঢাকা ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সেই অনুরোধ গ্রহণ করলেই যে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে, এমন কোনও সরল নিয়ম নেই। একইভাবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার একাধিক আইনি সুযোগও রয়েছে ভারতের হাতে।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানো নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের তরফে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগের কথা জানিয়ে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হয়েছে। সেই আবেদনের পর ভারত সরকারও বিষয়টি আইন এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) আগেই জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাওয়া প্রত্যর্পণের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করছে। প্রযোজ্য আইন এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মেনেই গোটা বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। অর্থাৎ, ঢাকা থেকে অনুরোধ আসার পরেই তা কার্যকর করার প্রশ্ন নেই। আবেদনটি পরীক্ষা করে তার আইনি ভিত্তি, অভিযোগের ধরন এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্তগুলি বিবেচনা করা হবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে দুই দেশ এই চুক্তিতে সই করে। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিতে সংশোধন আনা হয়। দুই দেশের মধ্যে অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে এই চুক্তিই মূল আইনি কাঠামো তৈরি করে। তবে চুক্তির অস্তিত্ব নিজে থেকে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করে না। আবেদন গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট একাধিক শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা -এর ক্ষেত্রে সেই আইনি যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রত্যর্পণের আবেদনে যে অভিযোগগুলি করা হয়েছে, সেগুলির প্রকৃতি কী, সেগুলি সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে গণ্য কি না এবং চুক্তির আওতায় ওই অভিযোগে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব কি না, প্রতিটি বিষয় আলাদা করে দেখা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রত্যর্পণ না করার জন্য চুক্তিতে যে ব্যতিক্রমগুলির কথা রয়েছে, সেগুলিও বিবেচনায় আসতে পারে। প্রত্যর্পণ আইনের ক্ষেত্রে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির যোগ রয়েছে কি না, অভিযোগটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা রয়েছে কি না, এ ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সব ধরনের গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধের আওতায় এনে প্রত্যর্পণ এড়ানোর সুযোগ থাকে না। হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন বা সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আলাদা আইনি বিবেচনা রয়েছে।
ফলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। ভারতীয় সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং আইনি কাঠামোর বিভিন্ন স্তর এতে যুক্ত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাঝেমধ্যে দাবি করা হচ্ছে যে, ভারতীয় আদালতই সরাসরি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবেন কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু বাস্তব প্রক্রিয়াটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সরকারের কাছে আসা প্রত্যর্পণের অনুরোধের আইনি পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, চুক্তির শর্ত এবং প্রয়োজনে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা ইত্যাদি সব কিছুর ভূমিকা থাকতে পারে। এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের আগে অভিযোগের ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের আইনি অবস্থান খতিয়ে দেখা হয়। যে অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে চুক্তির শর্তের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ধরন যদি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় না পড়ে, কিংবা চুক্তিতে উল্লিখিত কোনও ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হয়, সে ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পথ খোলা থাকতে পারে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিস্থিতিতে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি সামনে আসায় বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন দিল্লির সামনে তাই একদিকে রয়েছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ, অন্যদিকে রয়েছে ভারতের নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তির কাঠামো। একই সঙ্গে রয়েছে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের প্রশ্ন। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ভারতের জন্য সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জলবণ্টন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের বদলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই ভারতের অবস্থান বলে এখনও পর্যন্ত সরকারি বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অনুরোধ পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ফেরত পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কোনও দেশ অপর দেশের কাছে কোনও ব্যক্তিকে ফেরত চাইলে আবেদনটি নির্দিষ্ট আইনি মানদণ্ডের মধ্য দিয়ে যায়। তাই চুক্তি রয়েছে বলেই আবেদন মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক, এমন ধারণা ঠিক নয়। একই ভাবে আদালতই একমাত্র সিদ্ধান্ত নেবে, এমন ব্যাখ্যাও পুরো প্রক্রিয়াটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার বিষয়টি এখন তাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও আইনি ইস্যু। ঢাকার অনুরোধের পর নয়াদিল্লি কী সিদ্ধান্ত নেয়, প্রত্যর্পণ চুক্তির কোন ধারাগুলি প্রয়োগ করা হয় ও আইনি পরীক্ষার ফল কী দাঁড়ায়, সেদিকেই নজর রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগের আইনি চরিত্র, প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত এবং ভারতের প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ার উপর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sheikh Hasina return Bangladesh, Sheikh Hasina December return | ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা, বিচার হবে আইনের পথেই: তারেক রহমানের উপদেষ্টার দাবি




