সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বিজেপির নতুন কেন্দ্রীয় টিমে ফের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন সুনীল বনসল (Sunil Bansal)। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন (Nitin Nabin) দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পর সোমবার প্রকাশ করা হল নতুন জাতীয় পদাধিকারীদের তালিকা। সেই তালিকায় জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখা হয়েছে বনসলকে। ফলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সংগঠনে তাঁর গুরুত্ব বজায় থাকল বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও তেলঙ্গানার মতো রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতার পরে জাতীয় স্তরে ফের তাঁর উপর আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিজেপির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে একাধিক নতুন মুখ জায়গা পেলেও সাংগঠনিক স্তরে অভিজ্ঞ কয়েকজন নেতাকেও ধরে রাখা হয়েছে। আট জন জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের তালিকায় সুনীল বনসলের পাশাপাশি রয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি (Smriti Irani), ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব (Biplab Kumar Deb), বিনোদ তাওড়ে (Vinod Tawde), সতীশ পুনিয়া (Satish Poonia), গজেন্দ্র পটেল (Gajendra Patel), হরিশ দ্বিবেদী (Harish Dwivedi) এবং সঞ্জয় ভাটিয়া (Sanjay Bhatia)। দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদেও বিএল সন্তোষকে (B. L. Santhosh) রেখে দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটি ঘোষণার পরেই বিজেপির অন্দরে সুনীল বনসলকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করা বনসলের রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি নির্বাচনী সংগঠন গড়ে তোলার দক্ষতা। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সংগঠন বিস্তারের সময় তাঁর ভূমিকা দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বুথস্তরে কর্মীদের সক্রিয় করা থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কাঠামোকে নির্বাচনী প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো, একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়। জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০২২ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন বনসল। পরবর্তী সময়ে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং তেলঙ্গানার সাংগঠনিক দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। তিন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা। ফলে একই সাংগঠনিক ছাতার নীচে পৃথক রাজনৈতিক বাস্তবতায় কাজ করার অভিজ্ঞতা বনসলের দায়িত্বের পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিজেপির অন্দরে দীর্ঘ দিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বাংলায় দলের সংগঠন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বুথভিত্তিক কাঠামো, কর্মী-সমন্বয় এবং নির্বাচনী পরিকল্পনার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। দলের একটি অংশের মতে, বাংলায় সংগঠন পরিচালনার সময় বনসল যে কৌশলগত পদ্ধতি নিয়েছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে তাঁর দায়িত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাজে এসেছে। যদিও ‘বাংলা জয়ের পুরস্কার’ হিসাবেই তাঁকে এই পদ দেওয়া হয়েছে, এমন কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বিজেপির তরফে দেওয়া হয়নি। বিজেপির নতুন কেন্দ্রীয় টিমে অভিজ্ঞতা ও অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। জাতীয় সহ-সভাপতি পদেও একাধিক পরিচিত মুখকে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে (Vasundhara Raje), উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়ত (Tirath Singh Rawat), প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভারতী পওয়ার (Bharti Pawar), ওড়িশার বৈজয়ন্ত পণ্ডা (Baijayant Panda), পঞ্জাবের মনপ্রীত সিংহ বাদল (Manpreet Singh Badal), তারিক মনসুর (Tariq Mansoor) এবং রাম মাধব (Ram Madhav)। ফলে জাতীয় সংগঠনে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মুখগুলির পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজে দক্ষ নেতাদেরও জায়গা দেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় সুনীল বনসলের প্রত্যাবর্তন অবশ্য একেবারে নতুন ঘটনা নয়। বরং জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর পূর্ববর্তী দায়িত্বই তাঁকে নতুন টিমে জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রেখেছে বলে বিজেপির একটি অংশের মত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়। কোথাও সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা, কোথাও নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা ও কোথাও ভোটের আগে বুথস্তরের কাঠামো মজবুত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতাদের ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিজেপি। আবার, বাংলার ক্ষেত্রে সামনে আরও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা রয়েছে। রাজ্যে বিজেপির সংগঠন গত কয়েক বছরে যথেষ্ট বিস্তৃত হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ব্যবধান কমানো দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু ভোটের সময়ে প্রচার বা সভা নয়, সারা বছর বুথস্তরে কর্মীদের সক্রিয় রাখা, নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছনো ও সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার কাজও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলার রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত বনসলকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্তকে বিজেপির ভবিষ্যৎ সংগঠন পরিকল্পনার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
বনসলের কাজের ধরন বরাবরই মূলত সংগঠনকেন্দ্রিক। নির্বাচনী প্রচারের প্রকাশ্য মঞ্চের তুলনায় দলের ভিতরের কাঠামো গড়ে তোলা, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকে রাজ্যস্তরে বাস্তবায়ন করাই তাঁর দায়িত্বের বড় অংশ। উত্তরপ্রদেশে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার পর জাতীয় স্তরে উঠে আসার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল। নতুন টিমে স্মৃতি ইরানির মতো জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ ও বিপ্লব কুমার দেবের মতো রাজ্যস্তরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি বনসলের মতো সংগঠককে একই স্তরে রাখা হয়েছে। এর ফলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে শুধু সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতাই নয়, নির্বাচন পরিচালনা ও সংগঠন বিস্তারের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, নতুন কেন্দ্রীয় টিম ঘোষণার সঙ্গে বিজেপির আগামী দিনের নির্বাচনী প্রস্তুতির যোগও খুঁজে দেখছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যভিত্তিক সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজ্য নেতৃত্বের সমন্বয় বাড়ানো এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে নির্বাচনী প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সেই কাজে বনসলের মতো সংগঠকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে তাঁর আগের দায়িত্বের কারণে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিস্থিতির সঙ্গে বনসলের পরিচয় রয়েছে। দলের কর্মী কাঠামো, বিভিন্ন জেলার সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনী সমীকরণ নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা আগামী দিনে বিজেপি ব্যবহার করতে চাইবে কি না, সেটিই এখন নজরে। তবে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুধু বাংলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের একাধিক রাজ্যে সংগঠন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত থাকতে হবে। নিতিন নবীনের নতুন টিমে সুনীল বনসলকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে রেখে দেওয়ার ফলে একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার, বিজেপির কেন্দ্রীয় সংগঠনে তাঁর জায়গা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মুখের প্রবেশের মধ্যেও পুরনো সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে বাদ না দিয়ে বরং তা কাজে লাগানোর পথেই এগিয়েছে দল। বাংলায় তাঁর আগের দায়িত্ব এবং আগামী দিনের নির্বাচনী সমীকরণ, দুইয়ের দিকে তাকিয়েই বনসলের নতুন ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও বাড়তে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Durga Puja Kolkata, Samik Bhattacharya BJP | পুজো মানেই মানুষের উৎসব, রাজনীতির নয় : সভাপতি না হওয়ার ঘোষণা শমীক ভট্টাচার্যের, দলকেও কড়া বার্তা




