Sridevi life story : শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গার আয়্যাপ্পন থেকে শ্রীদেবী, বর্ণময় জীবন

SHARE:

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : শ্রীদেবী (Sridevi) নামটি উচ্চারিত হলেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কখনও ‘চাঁদনি’র মায়াবী উপস্থিতি, কখনও ‘হাওয়া হাওয়াই’-এর প্রাণচঞ্চলতা, কখনও ‘সদমা’র গভীর অভিনয়, একজন অভিনেত্রী যে একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির তারকা ও শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠতে পারেন, তার অন্যতম বড় উদাহরণ ছিলেন তিনি।

শ্রীদেবী। ছবি: সংগৃহীত

১৩ অগস্ট তাঁর জন্মবার্ষিকী পেরিয়ে গেল। সেই উপলক্ষ্যে ফিরে দেখা যায় দক্ষিণ ভারতের এক শিশুশিল্পীর বলিউডের শীর্ষ নায়িকা হয়ে ওঠা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা ওঠাপড়া, অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি এবং শেষ পর্যন্ত অকালপ্রয়াণের সেই দীর্ঘ সফর। ১৯৬৩ সালের ১৩ অগস্ট তামিলনাড়ুতে জন্ম শ্রীদেবীর। তাঁর আসল নাম ছিল শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গার আয়্যাপ্পন (Shree Amma Yanger Ayyappan)। অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে মাত্র চার বছর বয়সে। তখনও কেউ হয়তো ভাবেননি, এই ছোট্ট মেয়েটিই কয়েক দশক পরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠবেন। শিশুশিল্পী হিসাবে তামিল ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর তেলুগু, মলয়ালম এবং কন্নড় ছবিতেও কাজ করতে থাকেন।

শ্রীদেবী। ছবি : সংগৃহীত

খুব অল্প বয়সেই তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি আসে। মলয়ালম ছবি ‘পুম্বাট্টা’-য় অভিনয়ের জন্য ১৯৭১ সালে শিশুশিল্পী হিসাবে পুরস্কৃত হন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয় ছবির জগতে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করার পর হিন্দি ছবিতেও পা রাখেন। ‘জুলি’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসাবে দেখা যায় তাঁকে। পরে ‘সোলহওয়াঁ সাওন’ ছবিতে নায়িকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। হিন্দি ছবির দুনিয়ায় তাঁর প্রকৃত সাফল্যের দরজা খুলে যায় ‘হিম্মতওয়ালা’ দিয়ে। ছবিটির সাফল্যের পর শ্রীদেবী হয়ে ওঠেন দর্শকের পরিচিত মুখ। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির অন্যতম প্রধান নারী তারকা ছিলেন তিনি। সেই সময়ে নায়কের নাম দিয়ে ছবি বিক্রি হওয়ার প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি শ্রীদেবীর উপস্থিতিও ছবির ব্যবসার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, ‘চাঁদনি’, ‘চালবাজ়’, ‘লমহে’, ‘সদমা’-র মতো ছবিতে একেবারে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। কখনও হাস্যরস, কখনও প্রেম, কখনও আবেগ, আবার কখনও গভীর মানসিক টানাপড়েন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয়ের ধরন বদলেছেন শ্রীদেবী। বিশেষ করে ‘সদমা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শককে অন্য এক শ্রীদেবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। বাণিজ্যিক ছবির ঝলমলে তারকার পাশাপাশি যে তিনি গভীর এবং সংবেদনশীল চরিত্রও ফুটিয়ে তুলতে পারেন, সেই ছবিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্য দিকে ‘চালবাজ়’-এ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। একই ছবিতে সম্পূর্ণ আলাদা দুই চরিত্রকে তিনি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন।

শ্রীদেবী। ছবি : সংগৃহীত

‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ এবং ‘চাঁদনি’র গান ও নাচও শ্রীদেবীর জনপ্রিয়তাকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় ছবির নায়ককেও ছাপিয়ে যেত। সেই কারণেই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম ‘মহিলা সুপারস্টার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। পর্দার বাইরের শ্রীদেবী ছিলেন অনেকটাই ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখা মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আশির দশক থেকেই নানা আলোচনা হয়েছে। অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর (Mithun Chakraborty) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও গোপনে বিয়ের খবরও সে সময় সংবাদমাধ্যমে ঘুরেছিল। যদিও দু’জনের কেউই প্রকাশ্যে সেই সম্পর্ক বা বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করেননি। ফলে সেই অধ্যায় আজও মূলত গুঞ্জন হিসাবেই আলোচিত।

শুধু মিঠুন চক্রবর্তীই নন, এর পরে প্রযোজক বনি কাপূরের (Boney Kapoor) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। ১৯৯৬ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। সেই বিয়েও বিতর্কমুক্ত ছিল না। বনি কাপূর তখন বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন মোনা শৌরী কাপূর (Mona Shourie Kapoor)। শ্রীদেবী ও বনির সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পরে তাঁকে ঘর ভাঙার অভিযোগের মুখেও পড়তে হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত বনি কপূরের সঙ্গেই সংসার শুরু করেন। বিয়ের পর ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে সরে আসেন শ্রীদেবী। ১৯৯৭ সালে তাঁদের প্রথম কন্যা জাহ্নবী কাপূরের (Janhvi Kapoor) জন্ম। ২০০০ সালে জন্ম নেয় দ্বিতীয় কন্যা খুশি কাপূর (Khushi Kapoor)। কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্র থেকে দীর্ঘ বিরতি নেওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত। তখন তাঁর সামনে একের পর এক ছবির প্রস্তাব থাকলেও তিনি সংসার আর সন্তানদের সময় দেওয়াকেই গুরুত্ব দেন।

শ্রীদেবী। ছবি : সংগৃহীত

প্রায় ১৫ বছর বড় পর্দা থেকে দূরে থাকার পর ২০১২ সালে ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ (English Vinglish) ছবির মাধ্যমে ফিরে আসেন শ্রীদেবী। প্রত্যাবর্তনের সেই ছবিতে তাঁকে একেবারে অন্য আবহে দেখা যায়। সাধারণ একজন গৃহবধূর আত্মমর্যাদা, নিজের পরিচয় খোঁজা এবং পরিবারের মধ্যে নিজের অবস্থান নিয়ে তৈরি গল্পে তাঁর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা কুড়োয়। এর পরে ২০১৭ সালে ‘মম’ (Mom) ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। সেটিই হয়ে থাকে তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ হিন্দি ছবি। মেয়েকে রক্ষা করতে এক মায়ের লড়াইয়ের গল্পে অভিনয় করে ফের দর্শকের নজর কাড়েন শ্রীদেবী। দীর্ঘ বিরতির পরও তাঁর অভিনয়ের শক্তি যে কমেনি, সেই ছবির মাধ্যমেই তা সামনে আসে।

কিন্তু প্রত্যাবর্তনের কয়েক বছরের মধ্যেই থেমে যায় তাঁর জীবন। ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে মৃত্যু হয় শ্রীদেবীর। তিনি স্বামী বনি কাপূরের ভাইঝির বিয়েতে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। হোটেলের বাথটব থেকে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে। বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৪ বছর। শ্রীদেবীর আকস্মিক মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্রে গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছিল। মুম্বাইয়ে তাঁর শেষকৃত্যে চলচ্চিত্র জগতের অসংখ্য তারকা ও ভক্তের সমাগম হয়েছিল। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়।

শ্রীদেবী। ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুর পরেও শ্রীদেবীকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমেনি। বরং তাঁর দুই মেয়ে জাহ্নবী ও খুশির অভিনয়জীবনের সঙ্গে মায়ের নাম বার বার ফিরে এসেছে। জাহ্নবী ২০১৮ সালে ‘ধড়ক’ (Dhadak) ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। অন্য দিকে খুশি কপূর ‘দ্য আর্চিজ’ (The Archies) ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আসেন। দুই মেয়ের অভিনয় নিয়ে আলোচনা হলেই স্বাভাবিক ভাবে উঠে আসে শ্রীদেবীর প্রসঙ্গ। তাঁদের অভিনয়ের সঙ্গে মায়ের অভিনয়ের তুলনাও করেন অনেকে। কিন্তু জাহ্নবী এবং খুশি দু’জনেই নিজেদের প্রজন্মের অভিনেত্রী হিসাবে আলাদা পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করছেন। শ্রীদেবীর সম্পত্তি নিয়েও তাঁর মৃত্যুর পরে নানা আলোচনা হয়েছে। চেন্নাইয়ে তাঁর বাড়ি আর জমিও ছিল। তবে জাহ্নবী ও খুশির জন্য তিনি ঠিক কত সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন, তার সম্পূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রকাশ্যে নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অবশ্য তাঁর অভিনয়ের কাজ। কয়েক দশকের চলচ্চিত্রজীবনে তৈরি করা চরিত্রগুলি এখনও দর্শকের স্মৃতিতে রয়েছে।

শ্রীদেবী। সংগৃহীত

চার বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো সেই শিশুশিল্পী থেকে ‘মহিলা সুপারস্টার’ হয়ে ওঠার পথ ছিল দীর্ঘ। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা থেকে বলিউড, শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা, বাণিজ্যিক ছবি থেকে অভিনয়প্রধান চরিত্র, তার পর সংসারের জন্য দীর্ঘ বিরতি এবং শেষ জীবনে প্রত্যাবর্তন, শ্রীদেবীর জীবন যেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের একাধিক যুগকে একসঙ্গে ধারণ করে। উল্লেখ্য যে, তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাই শুধু তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় ছবির কথা নয়, ফিরে আসে সেই মানুষটির কথাও, তিনি খ্যাতির শীর্ষে থেকেও এক সময় ক্যামেরার আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে সন্তানদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর জীবন থেমে গিয়েছে বহু বছর আগে, কিন্তু ‘চাঁদনি’, ‘হাওয়া হাওয়াই’, ‘চালবাজ়’ কিংবা ‘মম’-এর সেই মুখ এখনও ভারতীয় দর্শকের স্মৃতিতে একই রকম জীবন্ত।

—সব ছবি সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shridevi Yash Chopra Lamhe | ‘লমহে’র শ্যুটে কী করেছিলেন শ্রীদেবী? যশ চোপড়াকে বদলাতে হয়েছিল পুরো মিউজিক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন