সম্পাদকীয়
সময় এর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক পরিবর্তন এক নতুন কথা নয়। তবুও নতুন কারণ পুরোনো মানুষ যেতে যেতেই আবার নতুনের আগমন ঘটে। এই যাওয়া আসার মাঝেই আছে টানাপোড়েন। ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃতি যখন সুন্দর হয়ে উঠে তখন সমস্ত প্রেম নীরব ও স্থির হয়ে যায় ফলে জীবনের চাওয়া পাওয়ার কোন আরম্ভর থাকে না। মনের ইচ্ছে এতো দ্রুত কাজ করে যে সেখানে কোনও বিপরীত শক্তি প্রবেশ করতেই পারবে না।
আসলে আমাদের ভিতরে আত্ম অহংকার রাগ এতো এতো বেশি যে নিরলস ভালোবাসা কে প্রেমে রূপান্তর করতে পারিনা। এগুলো আমাদের সমাজের এক বিশেষ ভুল ক্রিয়া যেখানে আমিই মানে আমিত্ম যোগ এতোই বেশি করে দেখি সেখানে প্রেমের মৃত্যু ঘটে। মা – বাবার প্রেম, বন্ধু -স্বজনের প্রেম, আত্মীয়পরিজনের প্রেম, সমাজের প্রেম, প্রকৃতির প্রেম এই ভাবে প্রেম ভাগ হয়ে যায়। বিশেষ ভাবে প্রেম যে এক উত্তরণ অভিন্ন চরম শক্তি তা ভুলে গিয়ে বিভাজন লিপ্ত হয়ে যায় ফলে। আমার – আমার বিষয়ে প্রবেশ করেছি এই স্বয়ংঅতা আমাদের পরমতা কে নষ্ট করে দেয়। যদিও এই বিষয়ে ভালাবাসা প্রেম এই বিষয় জনিত ভিন্ন শব্দে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে বা হয়। তাই ভালোবাসা ও প্রেমের ব্যখ্যা ভারতীয় ভাষা বিশেষ করে সংস্কৃত হিন্দী বাংলা…ভাষা ছাড়া এর উদাহরণ আর অন্য কোন ভাষায় ভালো ভাবে পাওয়া যায় না।🍁
🍁মহামিলনের কথা
দূর্লভ মানব জন্ম লাভ করেছ, বোবা হওনি, জিহ্বা এখন স্ববশ আছে— কেবল ‘শিব শিব’ জপ কর, শিবদর্শনের জন্য উৎকণ্ঠা জাগুক, তিনি এসে দর্শন দান করাবেন, করবেনই। তিনি শুধু অপেক্ষা করছেন—কবে অনন্য- ভাবে একান্ত অন্তঃকরণে দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ডাকবে, তাঁর আসবার বিলম্ব হবে না।

শিব পূজা
“রুদ্রাক্ষের মহিমা তো বড় কম নয়!
—তাইতো আমার ভোলানাথ রুদ্রাক্ষ এত ভালবাসেন। রুদ্রাক্ষ ধারণ না করলে তাঁর পূজো হয় না—
‘বিনা ভষ্মত্রিপুন্ড্রেণ বিনা রুদ্রাক্ষমালয়া
বিনা মালূরপত্রেণ নার্চ্চায়েৎ পার্থিবং শিবম্॥’
ভস্ম, ত্রিপুন্ড্র, রুদ্রাক্ষ মালা ও বিশ্বপত্র ব্যতীত পার্থিব শিবলিঙ্গ পূজা করতে নাই । আর কিছু নয়— দূর্লভ মানব জন্ম লাভ করেছ, বোবা হওনি, জিহ্বা এখন স্ববশ আছে—কেবল ‘শিব শিব’ জপ কর, শিবদর্শনের জন্য উৎকণ্ঠা জাগুক, তিনি এসে দর্শন দান করাবেন, করবেনই। তিনি শুধু অপেক্ষা করছেন—কবে অনন্য- ভাবে একান্ত অন্তঃকরণে দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ডাকবে, তাঁর আসবার বিলম্ব হবে না। শুধু একবার অনন্য হয়ে ছলনা ছেড়ে ‘দেখা দাও দেখা দাও’ বলে ডাক, কাঁদ, দেখা পাবেই পাবে।”
—অনন্তশ্রী ঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
(শিবনামামৃত লহরী / চতুর্বিংশ উচ্ছ্বাস)
🍂গদ্য
বিপ্লবী ও যোগী শ্রী অরবিন্দ বলেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতার থেকেও বড় বিষয় হল প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। আমরা কী সত্যিই মহাপুরুষদের আদর্শ অনুসরণ করি? যদি করতাম, তবে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো। তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ৮০ বছর

অভিজিৎ দত্ত
২০২৬ সালের ১৫ আগষ্ট আগষ্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্ণ হল। এর মধ্যেই স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষ্যে ‘অমৃত মহোৎসব’ অত্যন্ত ঘটা করে পালন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সামনে আসছে স্বাধীনতার ১০০ বছর,২০৪৭ সাল। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ভারতবর্ষের এই স্বাধীনতা বহু কষ্টার্জিত। অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীর আত্মত্যাগ, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রাণদানের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। তাই আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ভারতের গৌরবময় অতীত ইতিহাস ও তার ঐতিহ্যের কথা।ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। প্রয়োজন শুধু তার সঠিক ও উপযুক্ত ব্যবহার। প্রত্যেক দেশবাসীর প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলা ও দেশ ও সমাজের কল্যাণের কথা ভাবা। দেশের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা।
সরকারকে জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে। আসলে সরকার যদি শিক্ষার বিষয়ে আন্তরিক হয়, তবেই একটি উন্নত ও সোনার ভারত গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায় সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে। তাই উন্নত ভারতবর্ষ গড়ার লক্ষ্যে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের সমাজ বর্তমানে ভোগবাদ, দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির কবলে পড়েছে। দেশের কথা কতজন সত্যিই ভাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দুর্নীতি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, মহাকাশ বিজ্ঞান, সমরাস্ত্র নির্মাণ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত যথেষ্ট উন্নতি করেছে। কিন্তু ন্যায়, সততা ও সদিচ্ছার অভাব আমাদের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উপযুক্ত মানুষ তৈরি করা। অর্থাৎ আমাদের ভাল মানুষের তৈরি করতে হবে। কারণ যে কোনও ব্যবস্থা তখনই সফল হয়, যখন সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষ সৎ, যোগ্য ও মানবিক হন।
ভাল মানুষ তৈরির মূল ভিত্তি হল শিক্ষা। তাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে। প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও ক্রীড়ানীতি। প্রয়োজন দেশকে ভালবাসার মানসিকতা ও দেশের উন্নয়নের জন্য সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা। নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভালোভাবে জানা এবং বোঝার পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতির প্রসারে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।বিদ্যালয় জীবন থেকেই মহাপুরুষ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবন ও আদর্শ শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতে হবে। কারণ আগামী দিনের ভারত কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আজকের প্রজন্মের মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের উপর।
বর্তমান সময়ে নিট পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এই ঘটনা ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিপ্লবী ও যোগী শ্রী অরবিন্দ বলেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতার থেকেও বড় বিষয় হল প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। আমরা কী সত্যিই মহাপুরুষদের আদর্শ অনুসরণ করি? যদি করতাম, তবে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো। তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনও আশার আলো রয়েছে।
এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আরও সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষার গুণগত মানের উন্নতি।
বিদ্যালয়ে মূল্যবোধের শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশ-ফেল ব্যবস্থা ও শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও যুগোপযোগী নতুন নতুন পাঠ্যক্রমের উপর জোর দিতে হবে। সরকারকে জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে। আসলে সরকার যদি শিক্ষার বিষয়ে আন্তরিক হয়, তবেই একটি উন্নত ও সোনার ভারত গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায় সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে। তাই উন্নত ভারতবর্ষ গড়ার লক্ষ্যে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
স্বাধীনতার ৮০তম বছরের প্রাক্কালে সকলের কাছে আমার একটাই অনুরোধ মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ হল তার জীবন। অথচ বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সেই জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। আজ স্বাধীন ভারতবর্ষ আমাদের কাছে প্রশ্ন রাখছে, আমরা দেশের জন্য কী করছি?বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বপ্ন তখনই সফল হবে, যখন আমরা তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করব ও দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরি করব।🍁
ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩৮.
নোনা ঢেউ ও একটি জানালা
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন বাস্তব আর কল্পনা একই নদীতে এসে মিশে যায়। তখন কেউ বলতে পারে না, কোনটি জলের স্রোত, কোনটি তার প্রতিবিম্ব। নীলয়ের কাছে সেই সময়টা শুরু হয়েছিল সেই ছোট্ট কাঠের জানালাটি পাওয়ার পর থেকেই। সে জানালাটিকে কেবিনের দেওয়ালে টাঙায়নি। বিছানার পাশে রেখে দিয়েছিল। যেন সেটি কোনও বস্তু নয়, একজন নীরব সঙ্গী। পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই সে প্রথমে জানালাটির দিকে তাকাল। নীল কাচের ভেতরে আর কোনও আলো নেই। যেন কিছুই ঘটেনি। তবু কাচে হাত রাখতেই তার মনে হলো, কাচ ঠাণ্ডা নয়; মানুষের শরীরের মতো উষ্ণ। তার হাত কেঁপে উঠল। সমুদ্রে দীর্ঘ যাত্রার একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে। মানুষের স্মৃতিকে সে খণ্ড খণ্ড করে দেয়।
অমনি ছবিটি কেঁপে উঠল। জলতরঙ্গের মতো ভেঙে গেল। সেই একই সন্ধ্যায় মেঘলা হঠাৎ কলম থামিয়ে দিল। কেন যেন মনে হল, কেউ তাকে ডাকল। একেবারে কাছ থেকে। সে বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশে তখন অসংখ্য তারা। দূরে নদীর কালো জল। কেউ নেই। তবু তার বুকের ভেতরে নীলয়ের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। সে জানালার কপাটে হাত রেখে খুব আস্তে বলল,
—‘আর কত দূরে?’
বাতাস উত্তর দিল না। কিন্তু জানালার ফাঁক দিয়ে একফোঁটা নোনতা হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ল।
একদিন হঠাৎ নীলয়ের মনে পড়ল, সে বহুদিন মায়ের কথা ভাবেনি। মা এখন একা। বয়স হয়েছে। মেঘলা নিশ্চয়ই দেখাশোনা করছে। কিন্তু যদি একদিন ফিরে এসে দেখে, মা আর নেই? এই চিন্তা তাকে সারাদিন তাড়া করে বেড়াল। রাতে ইউসুফকে বলল, আপনার কি কখনও মনে হয়েছে, আমরা যারা সমুদ্রে থাকি, তারা আসলে মানুষের শেষ মুহূর্তগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে যাই?
ইউসুফ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল আমি আফ্রিকার উপকূলে। ছেলে প্রথম হাঁটতে শিখেছিল আমি আরব সাগরে। মায়ের কবর দেওয়া হয়েছিল আমি মালাক্কা প্রণালীতে। বল তো, কোনটা আমার জীবন? যে ঘটনাগুলো আমি দেখিনি, নাকি যে সমুদ্র আমাকে সব সময় ডেকে নিয়ে গিয়েছে?
নীলয় উত্তর দিতে পারল না। ইউসুফ আবার বলল, সমুদ্র মানুষের কাছ থেকে সময় ধার নেয়। কিন্তু সেই ধার কোনও দিন শোধ করে না।
চরকমলপুরে শীত নেমেছে। ভোরে নদীর উপর কুয়াশা। জানালার বাইরে শিউলি নেই, এখন শুধু শুকনো ডাল। মেঘলা প্রতিদিনের মতো চিঠি লেখে। আজকের চিঠিতে সে লিখল, ‘তুমি জানো, জানালারও বয়স হয়? এই কাঠে এখন ফাটল ধরেছে। আমি রং করাতে দিইনি। ভাবলাম, তোমার হাতেই রং হবে। মানুষ ফিরে আসে কি না জানি না, কিন্তু হাতের স্পর্শ ফিরে আসে।’ চিঠিটি ভাঁজ করে আগেরগুলোর সঙ্গে রেখে দিল। এখন বাক্সটি প্রায় ভরে এসেছে। কাগজেরও ওজন হয়। বিশেষ করে, যদি প্রতিটি কাগজের ভেতরে অপেক্ষা ভাঁজ করে রাখা থাকে। সেই সময় গ্রামে এল এক বৃদ্ধ। কেউ জানে না তিনি কোথা থেকে এসেছেন।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে থাকেন। কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলেন না। শুধু জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। গ্রামের ছেলেরা নাম দিয়েছিল, ‘সমুদ্রবাবা’। একদিন মেঘলা জল আনতে গিয়ে দেখল, বৃদ্ধ তাকিয়ে আছেন তার জানালার দিকে। বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন, ওই জানালাটা বন্ধ করো না। মেঘলা অবাক, আপনি আমার বাড়ি চেনেন?
—বাড়ি নয়। জানালাকে চিনি।
—কীভাবে?
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন
—সমুদ্রে অনেক জানালা ভেসে যায়। সব জানালাই কাঠের হয় না। কিছু জানালা মানুষের মনে তৈরি হয়। সেগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, দূরে থাকা মানুষ পথ হারিয়ে ফেলে। মেঘলা কিছু বলল না।
—লোকটা পাগল? নাকি সত্যিই কিছু জানে?
এদিকে জাহাজ ভারত মহাসাগর ছেড়ে আরও দক্ষিণে নামছে।
শীত বাড়ছে। রাতগুলো দীর্ঘ। এক রাতে নীলয় ঘুম ভেঙে শুনল, কেউ যেন খুব আস্তে তার নাম ধরে ডাকছে, ‘নীলয়…’। সে উঠে দাঁড়াল। কেবিনে কেউ নেই। ডেকেও না। শুধু দূরে সমুদ্রের কালো ঢেউ। কিন্তু ডাকটা আবার এল।
–‘নীলয়…’
–‘নীলয়…’
সে উঠে দাঁড়াল। কেবিনে কেউ নেই। ডেকেও না। শুধু দূরে সমুদ্রের কালো ঢেউ। কিন্তু ডাকটা আবার এল।
–‘নীলয়…’
এবার সে বুঝতে পারল, শব্দটি বাইরের নয়। ভেতরের। স্মৃতি কখনও কখনও মানুষের নিজের কণ্ঠস্বর ধার করে। পরদিন তারা এক নির্জন দ্বীপের কাছে নোঙর ফেলল। মেরামতির জন্য ক’য়েক ঘণ্টা দাঁড়াতে হবে। দ্বীপে কোনও শহর নেই। শুধু একটি পুরনো বাতিঘর। কৌতূহলবশত নীলয় নেমে গেল। বাতিঘরের দরজায় তালা নেই। ভেতরে একজন বৃদ্ধ বসে। তার চোখে ঘন সাদা ছানি। মনে হলো, তিনি যেন বহুদিন ধরেই কারও জন্য অপেক্ষা করছেন।
নীলয় বলল
—‘আপনি একা থাকেন?’
—‘আলো কখনও একা থাকে?’ বৃদ্ধের উত্তর।
—‘এখানে জাহাজ তো খুব কম আসে।’
—‘যাদের আসার কথা, তারা আসে না। যাদের আসার কথা নয়, তারা হঠাৎ এসে পড়ে।’
বৃদ্ধ হেসে উঠলেন। নীলয়ের মনে হল, এই হাসি সে কোথাও শুনেছে। কোথায়? হয়ত বাবার। নিজের। হয়ত কোনও স্বপ্নে।
বাতিঘরের দেওয়ালে সারি সারি পুরোনো ছবি। ডুবে যাওয়া জাহাজ।
হারিয়ে যাওয়া নাবিক। অচেনা মুখ। হঠাৎ একটি ছবির সামনে নীলয় থেমে গেল। ছবিতে একটি ছোট্ট কাঠের জানালা। ঠিক তার কেবিনে রাখা জানালাটির মতো। সে চমকে উঠল,
—‘এটা কোথা থেকে এসেছে?’
বৃদ্ধ বললেন,
—‘যারা ফিরে আসতে পারেনি, তাদের স্মৃতি থেকে।’
—’মানে?’
—’সমুদ্র কখনও কখনও মানুষের শেষ ইচ্ছাকে জিনিসের মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
নীলয়ের শরীর শিউরে উঠল। সে আর কোনও প্রশ্ন করতে পারল না। ফিরে এসে সে দেখল, কেবিনে রাখা জানালার নীল কাচে এবার স্পষ্ট একটি রেখা ফুটে উঠেছে। মনে হচ্ছে, কুয়াশার ওপারে একটি বাড়ি।
আর সেই বাড়ির জানালায় একটি প্রদীপ। সে যত তাকায়, ছবিটি তত পরিষ্কার হয়। একসময় সে বুঝল,
—এ তো তাদের নিজের বাড়ি! দক্ষিণের জানালা।
শিউলি গাছ। মাটির উঠোন। আর জানালার ধারে বসে মেঘলা লিখছে। সে যেন সত্যিই দেখতে পাচ্ছে। মেঘলা মাথা তুলে তাকাল। দুজনের চোখ মিলল। মুহূর্তটি এতটাই বাস্তব যে নীলয় অজান্তেই বলে ফেলল,
—‘মেঘলা!’
অমনি ছবিটি কেঁপে উঠল। জলতরঙ্গের মতো ভেঙে গেল। সেই একই সন্ধ্যায় মেঘলা হঠাৎ কলম থামিয়ে দিল। কেন যেন মনে হল, কেউ তাকে ডাকল। একেবারে কাছ থেকে। সে বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশে তখন অসংখ্য তারা। দূরে নদীর কালো জল। কেউ নেই। তবু তার বুকের ভেতরে নীলয়ের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। সে জানালার কপাটে হাত রেখে খুব আস্তে বলল,
—‘আর কত দূরে?’
বাতাস উত্তর দিল না। কিন্তু জানালার ফাঁক দিয়ে একফোঁটা নোনতা হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ল। চরকমলপুর সমুদ্রের এত কাছে নয় যে সেখানে সমুদ্রের লবণ পৌঁছবে। তবু সেই রাতে পুরো ঘরটায় সমুদ্রের গন্ধ ছড়িয়ে ছিল।
রাতের শেষ প্রহরে বৃদ্ধ ইউসুফ নীলয়ের কেবিনে এল। তার হাতে একটি পুরোনো টিনের বাক্স।
—‘এটা রাখ।’
—‘এতে কী আছে?’
—‘চিঠি।’
—‘কার?’
—‘যারা লিখেছিল, কিন্তু পাঠাতে পারেনি।’
নীলয় বাক্স খুলল। ভেতরে শত শত হলদে কাগজ। কেউ লিখেছে মাকে। কেউ স্ত্রীর কাছে। কেউ অনাগত সন্তানের উদ্দেশ্যে। কোনও চিঠির শেষ নেই। কোনওটিতে শুধু একটি লাইন,
—‘আমি ফিরব।’
ইউসুফ ধীরে বলল,
—‘জানিস, সমুদ্রের সবচেয়ে বড় কবরখানা জলের নিচে নয়। এই অপাঠানো চিঠিগুলোর মধ্যে।’
নীলয় দীর্ঘক্ষণ বাক্সটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল, পৃথিবীর প্রতিটি অসমাপ্ত বাক্য হয়ত, শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের কাছেই এসে জমা হয়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, চরকমলপুরে মেঘলা তার নতুন চিঠির প্রথম লাইনটি লিখল, ‘আজ হঠাৎ মনে হল , আমাদের দু’জনের মাঝখানে সমুদ্র নয়, কেবল একটি না-খোলা চিঠি পড়ে আছে…’ 🍁(ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

ছায়া প্রলাপ
ছায়া শরীর তুলির টানে
জীবন্ত হয় জলপরী।
মায়া বাধা গভীর জঙ্গলে
স্বর্ণ খনির খোঁজে খোদাই করি শিলা।
শিলার ভিতর দিয়ে নির্গত নদী
বয়ে আনে সুখের রতিক্রিয়া
মগ্ন আমি সব দুঃখের কালী ঝুলি মেখে
ভগ্ন কুঁড়ে ঘরের রাজা।
রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

জোড়াতালি
ঘুমের মাঠ
গমরঙ…
ধীরে বাতাস বইছে
মৃদু দুলছে চারপাশ…
ওখানে দাঁড়িয়ে খুঁজছিলাম তোমাকে
দূরে, তোমার অবয়ব, ভেসে আসছে, কেঁপে…
বুঝতে পারলাম স্বপ্ন দেখছি
স্বপ্নের ঘুম ভেঙে গেল
ঘুমকে বললাম আবার ঘুমাও
স্বপ্নের সুতোটুকু যেন না ছেঁড়ে
দেখতে চাই—
ও-কত কাছে এল
ঠিক আমার পাশটিতে এসে দাঁড়াল তো
গা ছুঁয়ে!
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

প্রদীপ জ্বেলে দিই
কবর শুইয়ে রাখছে দেহ
আমি কবরখানায় প্রদীপ জ্বেলে দিই
সেই মুখ, মমতার চোখগুলি চেয়ে চেয়ে দ্যাখে
নীরবতার পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকি
রাত চলে যায় অন্যরাতের দিকে
দিন মিশে যায় পরের দিনে
একটি জীবন্ত হৃদয়— হৃদয়ে হৃদয়ে চলাফেরা করে
নীরব কথারা মুখর হয়
রোজ ডেকে নেয় প্রাণের কোনও আলো
একটা একটা সিঁড়ি পেরিয়ে যাই
কবর বিস্তৃত হয়ে ওঠে এক একটি অলৌকিক ঘর
ফেরেশতারা দরজা খুলে দেয়
ঈমানের আয়নায় ভেসে ওঠে ছায়া
তাহমিনা শিল্পী -এর দু’টি কবিতা

আলোর বিপ্রতীপ কোণ
আলোর তির্যক ছোঁয়া
প্রতিচ্ছবি দীর্ঘতর
আঁধার আলোকে গড়ে
অথবা, আলোই বুনে আঁধার!
ছায়া-ছায়া খেলাঘর
মায়ামায়া প্রেমগাঁথা
জীবনের চতুষ্কোণ
সমান্তরাল অবহেলা,অপেক্ষা।
আলোর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে,
উপলব্ধি করি,
আঁধারের গভীরতাও
আলোরই এক গল্পকথা!

প্রেমের সত্যগুলো মুছে যায় না
নিরব নিঃশব্দ ভোরে হঠাৎই টের পাই—
প্রেম আসলে উচ্চারণে নয়, গভীরের অনুরণে জন্ম নেয়।
তোমার নাম উচ্চারিত না হলেও
আমার ভেতর তুমি তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকো।
কুয়াশা ভেজা পথের প্রতিটি মোড়ে
তোমার অনুপস্থিতি এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়
যেন অদৃশ্য কোথাও থেকে তুমি বলো,
ভালোবাসা কখনই দূরত্বে থাকে না।
আজ আকাশের তারাগুলো কোমল, জ্বলজ্বলে
হয়ত জানে আমার মন কোন অদৃশ্য দ্বারে থেমে আছে।
প্রেমের সত্যগুলো মুছে যায় না—
শুধু নীরবে রূপ বদলায়, আরও গভীর হয়ে ওঠে।
তুমি কাছে না থেকেও থাকো অন্তরমহলে,
আমার প্রতিটি শ্বাসে তোমার নামে আলো জ্বলে ওঠে।
তখনই বুঝি—
সত্যিকারের প্রেম মানে নিঃশব্দে পাশাপাশি বেঁচে থাকা
দু’টি হৃদয়ের দীর্ঘ, অটল ধ্বনি।
সংযুক্তা সাহা -এর একটি কবিতা

হঠাৎ যদি উড়ে যেতাম
হঠাৎ যদি উড়ে যেতাম-
পাখির মতো আকাশে!
জীবন হত সহজ যেতাম
নদীর মত ভেসে-
পড়াশোনার ইঁদুরদৌড়
পিছনে ফেলে,
ছুটতাম অনেক অনেক দূর-
সবাই মিলে গেয়ে উঠতাম
সাতটি রঙের সুর।
রামধনু পেতাম হাতের কাছে
মাখতাম গায়ে আবির,
শ্রান্ত হয়ে ঘুম পেলে
শুতাম হয়ে নিবিড়।
দিনগুলো কত সহজ হতো-
বকতো নাতো কেউ!
একটু আদর পেয়ে বিড়াল
করত মেউ মেউ।
কুকুরগুলো বিস্কুট খেতো
ভালোবাসতো প্রাণ ভরে-
আমাদের সারাদিন থাকতো
সোহাগে-আদরে।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
২৪.
সুনয়নাদি
ফোনে অ্যালার্ম বাজছে হঠাৎ করেই যেন শব্দটা তিথির কানে গেল, ধড়ফড় করে উঠে পড়ে। যা স্কুলে যেতে হবে তো। তাড়াতাড়ি কাজ গোছাতে হবে, না হলে পেরে উঠবে না। এদিকে সুইটি আসছে না ওদিকে সোমাদিও আসছে না। হঠাৎ করে মনে পড়ল আরে আজ তো স্কুল ছুটি স্কুলে উল্টো রথের ছুটি পড়েছে। তিথি আর একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু ঘুম আসলো না বারবার মনে হচ্ছে যদি ঘুমিয়ে পড়ে, স্কুল ছুটি তাতে কি হয়েছে তাহলে সে কাজও তো সামলে উঠতে পারবে না। এদিকে জগন্নাথ দেবের ভোগ চাপানো আছে ভোগের রান্নাবান্না আছে। না দেরী করে উঠে পড়াই ভালো। তিথি উঠে পড়ল। কিন্তু এ কি! এসি বন্ধ। তার মানে কারেন্ট নেই। জ্বালা হয়েছে এক। ইনডাকশনটা তো জ্বালাতে পারবে না অগত্যা গ্যাস জ্বালতে হবে। কী যে হচ্ছে। এতে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে যাচ্ছে।
তিথি কি ভাবতে লাগল, এমনও হয় ভগবান কবে ওকে শান্তি দেবেন! ও তো ওই রাস্তা ছেড়েই দিতে চেয়েছে। পরেও কেন আসে ভাল হতে পারছে না ভুল বলছি, ভাল হতে পারছে না, ওটা মনেপ্রাণে সংসারটা ভালবেসেছে। যে স্বামীকে ভালবেসেছে সে স্বামী ও আজ প্রকৃত রূপ দেখিয়েছে!
শাশুড়ি মার প্রতি একটু বিরক্ত হয়েই বিড়বিড় করে আপন মনে বলতে লাগল, তা বললে যখন গেছে আগে থেকে বলতে কি হয় তাড়াতাড়ি একটু সকাল সকাল উঠা যায়। সোমাদি প্রয়োজনের সময় তখন বৌদি বৌদি টুক করে ডুব মারার সময় তখন কাকিমা।
—ও বৌমা বৌমা আ আ আ…
তিথি মনে মনে ভাবছে মাঝে মাঝে সাড়া দিতেও ইচ্ছে করে না। যেভাবে চেঁচাচ্ছেন না তাতে সাড়া না দিয়ে উপায় আছে।
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
—কি হয়েছে টা কি?
—চা পেলাম না।
—পেলেন না পাবেন। একটু সময় দিন।
—কোনওদিন তো আরও আগে দিয়ে দাও।
—এই নিন।
চায়ের কাপ ক্রিম কেকার বিস্কিট প্লেট নিয়ে হাতে ধরিয়ে দিল।
—শুনুন সব দিন তো আর সমান যায় না, এই যে সোমাদি কাজে আসবে না আপনার কাছে বলে গিয়েছে। আপনি তো আগে আমাকে বলেননি।
একা হাতে কাজ সামলানো কতটা নাজেহাল হয় আমাকে।
ওদিক থেকে পবিত্র চেঁচিয়ে মাথা খারাপ করে দিল।
—কি হলটা কি?
গলা বাড়িয়ে তিথি বলল।
—আরে বাবা এদিকে আসো তবে তো বুঝতে পারবে।
—আরে কি হয়েছে সেটা তো বলবে বাবু বমি করেছে।
বমি করেছে কেন কি হয়েছে
তিথি ছুটতে শুরু করল।
—ও বৌমা, বৌমা, কার কি হল?
কোনও সাড়া নেই সংসারে আমরা এখনো অপ্রয়োজনীয়। আমাদের কথার কোনও মূল্য
নেই। তিথির কানের ভেতরে তীরের মতো গিয়ে পৌঁছাল।
তিথির অত সব কথা এখন কানে ঢুকছে না। তাড়াতাড়ি ছেলের কাছে গেল।
—কি হয়েছে বাবা?
—মাম মাম…
কোলের মধ্যে নেতিয়ে পড়ল।
—কি খেয়েছিলে কালকে বেরিয়ে বাপির সাথে।
—কি খাইয়েছিলে ছেলেকে?
—ওই তো পিৎজ্জা খেতে চেয়েছিল।
—তোমরা সব উল্টোপাল্টা খাওয়াবে।
—নাও ধরো ওকে পরিষ্কার করতে হবে। এত কাজ অন্ধকার দেখছি দু’চোখে।
—ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি, বেশ করেছ।
পুচু এতো লেজ নাড়ছ। দাদার খুব শরীর খারাপ। চল তুমি খাবে।
তিথি বমিটা পরিস্কার করে চলে গেল তার সঙ্গে সঙ্গে পুচুও গেল। ভাল করে হাতটা হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে ধুয়ে পুচুকে
দুধ রুটি খেতে দিল। তিথির চাটা তো ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। ফ্ল্যাক্স থেকে আরেকটু চা ঢালল। সবে চুমুক দিয়েছে এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ, হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ…
এখন আবার কে আসলো?
একটু বসেও শান্তি নেই। না পেশার কুকারে এক্ষুনি সিটি পড়বে। ওদিক থেকে শাশুড়ি মা চেঁচাতে শুরু করল কে বেল বাজায়? এই হয়েছে এক জ্বালা, সবকিছু জানাতে হবে।
—ও বৌমা বৌমা আ আ আ…
তিথি বলল,
—আগে যাই দেখি কে এসেছে? —নাহলে বলব কি করে?
দরজা খুলতেই তিথি অবাক হয়ে গেল। যে বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলেছিল দরজার পাশে মানুষটিকে দেখে হৃদয়টা ভরে উঠল।
—ও মা মাসি! কেমন আছ গো?
—ভাল আছি বলেই তো এলাম। তোমরা তো আমার খোঁজ নেবে না।
—এসো মাসি এসো…
এক গাল হেসে তিথি বলল, দরজাটা লাগাই।
—আমাদের বুবুন সোনা কেমন আছে?
—ওর তো শরীর খারাপ সকালে বমি করল
—সেকি গো! ছেলেটা একেবারে নেতিয়ে পড়েছে।
—তবে তোমাকে দেখলে খুব খুশি হবে, জানো মাসি। এতদিন কোথায় ছিলে গো?
—শরীরটা ভাল ছিল না।
—সুনয়না বলেছিল।
মাসি নিজের জায়গায় বসল। ঠিক রান্নাঘরের দরজার পাশে। তিথি খুব খুশি খুশি মনে চা এনে দিল মাসিকে।
—আবার চা।
—কেন চা খাবে না কেন?
—আগে গিয়ে বুবুনকে দেখে আসি।
—আগে চা খাও পরে যেও।
—এত বাসন পড়ে আছে কেউ কাজে আসেনি?
—আর বলো না, আমি কাজের লোক নিয়ে নাজেহাল হয়ে গেলাম মাসি।
—ও মাসি, তুমি কোথাও কাজ করছ?
—না গো। শরীরটা ভাল ছিল না তো, কাজগুলো ছেড়েই দিয়েছিলাম।
—তা তোমার শরীর এখন ঠিক তো?
—হ্যাঁ আপাতত।
—তাহলে কাজটা করো না আমার বাড়িতে, তুমি থাকলে আমি নিশ্চিন্ত।
—সুনয়না করবে না?
—আরে সে তো অনেকদিন আগের কথা, তোমার সঙ্গে তো দেখাও হয়নি কিছু বলাও হয়নি।
—কেন কি হয়েছ?
—তুমি কি কিছুই জানো না?
আমি যেটা জানি সেটা বলার জন্যই আজকে এসেছি।
তিথি কৌতুহলী হয়ে উঠল,
—কি মাসি?
—আরে ও-কিছুদিন আগে আমার বাড়িতে গিয়েছিল, ওর যা শরীরের কণ্ডিশন দেখলাম, ওই কি বলে সারা গায়ে শুধু মারের দাগ।
—কি বলছ মাসি!
—ঠিকই বলছি।
আমি জিজ্ঞেস করাতে ও শুধু বলল, ভালবাসার নিশানা।
—হ্যাঁ মাসি, ও-মাঝে এসেছিল। ওর শরীর দেখে আমারও তাই মনে হয়েছিল, তারপর ও-আমাকে ফোন করেছিল।
—তারপর?
—ফোনেতেই যা ওর আওয়াজ পেলাম তাতে বুঝলাম। ও-ভীষণ খারাপ অবস্থায় আছে।
—ঠিকই বলেছ, বৌমা।
তবে এখন একটা নতুন খবর দিই জেলে আছে।
—কি বলছ মাসি!
তিথির মাথাটা কেমন বনবন করে ঘুরতে লাগল। মাসি যা কথাগুলো বলে যাচ্ছে কানের পাশে সব বেরিয়ে যেতে লাগল, কিছুই ওর মাথায় ঢুকতে পারল না। কাগুজি মাসি বলল,
—এর থেকে মনে হয় ও-গলিতে ছিল অনেক ভাল ছিল।
তিথি কি ভাবতে লাগল, এমনও হয় ভগবান কবে ওকে শান্তি দেবেন! ও তো ওই রাস্তা ছেড়েই দিতে চেয়েছে। পরেও কেন আসে ভাল হতে পারছে না ভুল বলছি, ভাল হতে পারছে না, ওটা মনেপ্রাণে সংসারটা ভালবেসেছে। যে স্বামীকে ভালবেসেছে সে স্বামী ও আজ প্রকৃত রূপ দেখিয়েছে! কে কে যেন বুঝতে পারল, নতুন করে আবার ঝড় চারিদিক কেমন থমথমে ভাব কালো মেঘ করেছে, এক্ষুনি বোধহয় সব কিছু ওলোটপালট হবে। শুধুই অন্ধকার আলোর চিহ্ন যেন নেই তাতে সুনয়নার জীবন ইতিহাসে এই অন্ধকার কী চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে? 🍁(ক্রমশঃ)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘গদ্য’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




