সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ: ভোরের ব্যস্ত সময় হঠাৎই থমকে গেল কর্ণসুবর্ণ। স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়া একটি পুলকারকে ধাক্কা দেয় দ্রুতগতির ট্রেন, আর তাতেই প্রাণ হারান পাঁচ জন। ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী (Adhir Chowdhury)। উত্তেজিত পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) -এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উদ্বেগ তাঁর সামনে তুলে ধরেন।
শুক্রবার সকালে কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝামাঝি একটি লেভেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি ট্রেন আপ লাইন দিয়ে যাওয়ার পর রেলগেটটি খোলা ছিল। সেই সুযোগে স্কুলভ্যানটি রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই ডাউন লাইন দিয়ে ছুটে আসে নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল ট্রেন এবং সজোরে ধাক্কা মারে গাড়িটিকে। ঘটনাস্থলেই কয়েক জন গুরুতর জখম হন, পরে তাঁদের মধ্যে পাঁচ জনের মৃত্যু হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। মৃতদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি, যা ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে। দুর্ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, রেলগেট পরিচালনায় গাফিলতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে অধীর চৌধুরী প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বিবরণ শোনেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। সেখান থেকেই তিনি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে ফোন করেন। ফোনালাপের বিষয়ে অধীর বলেন, ‘আমি রেলমন্ত্রীকে পুরো ঘটনাটা জানিয়েছি। এখানে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের উদ্বেগও আমি তুলে ধরেছি।’ তিনি আরও জানান, ‘আমি বিক্ষোভকারীদের বলেছি, রেলমন্ত্রী দ্রুত পদক্ষেপ করবেন এবং সবাইকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করেছি।’
অধীর চৌধুরী রেলমন্ত্রীকে দ্রুত রেল আধিকারিকদের ঘটনাস্থলে পাঠানোর অনুরোধ জানান। তাঁর কথায়, ‘আমি তাঁকে জানিয়েছি যে এখানে পুলিশ রয়েছে, কিন্তু রেলের পক্ষ থেকেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’ একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। রেল মন্ত্রকের তরফে ইতিমধ্যেই ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করা হয়েছে। মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। গুরুতর আহতদের জন্য আড়াই লক্ষ টাকা করে সহায়তার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অনেকেই বলেছেন, অর্থ সাহায্য প্রয়োজন হলেও এমন দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া আরও জরুরি।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে কথাবার্তার পর অধীর ঘটনাস্থলেই উপস্থিত বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘রেলমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। আধিকারিকরা আসছেন। আপনারা শান্ত থাকুন।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানা গিয়েছে। ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই একটি ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এই কমিটি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করবে। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, গেটম্যানের ভূমিকা, সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ট্রেন চলাচলের সময়সূচী, সব দিকই খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে স্থানীয়দের একাংশ দাবি করেছেন, ওই রেলগেট দীর্ঘ দিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় প্রায়ই গেট খোলা থাকে এবং সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হন। তাঁদের দাবি, ‘এই রেলগেটটি স্বয়ংক্রিয় করা বা ওভারব্রিজ তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে।’ দুর্ঘটনার পর এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃতদের পরিবারের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে রেল নিরাপত্তা এবং লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Murshidabad train accident death toll 5, Suvendu Adhikari strict warning | কর্ণসুবর্ণে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত ৫, কড়া হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ‘গাফিলতি বরদাস্ত নয়, দোষীদের রেয়াত নয়’



