সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে চাপানউতোর। একের পর এক নেতার দলত্যাগে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে এবার কড়া সুরে অবস্থান জানালেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কোয়েল মল্লিকের (Koel Mallick) পদত্যাগ ও দিল্লিতে বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের (Bhupender Yadav) সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের পরপরই দলত্যাগীদের উদ্দেশে সরাসরি ‘ডেডলাইন’ ঘোষণা করলেন তিনি। জানালেন, যাঁদের যাওয়ার আছে, তাঁরা যেন ২১ জুলাইয়ের আগে দল ছেড়ে দেন। এই ঘোষণার মধ্যেই উঠে এসেছে নতুন করে দল গড়ার পরিকল্পনার ইঙ্গিত।
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | ৪০ বছর পর ঐতিহাসিক সফর: কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক
বৃহস্পতিবারের এই মন্তব্যের আগে থেকেই তৃণমূলের অন্দরে ভাঙনের ছবি প্রকট হচ্ছিল। বুধবারই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন মদন মিত্র (Madan Mitra)। তার পরের দিনই রাজ্যসভা সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে কোয়েল মল্লিকের দিল্লি যাত্রা রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দেয়। এরই মাঝে প্রাক্তন মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত (Manish Gupta) দল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন। পরপর এই ঘটনাগুলির পর পরিস্থিতি যে অন্য মাত্রা নিয়েছে, তা মমতার বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার। দলত্যাগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ইডি, সিবিআই বা বিজেপির চাপ থাকলে যাঁদের যাওয়ার আছে, তাঁরা ২১ জুলাইয়ের আগে চলে যান। লোটাকম্বল নিয়ে চলে যান।’ তাঁর এই মন্তব্যে একদিকে যেমন ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই অন্যদিকে দল পুনর্গঠনের প্রস্তুতির আভাসও মিলেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ২১ জুলাই তৃণমূলের শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করেই নতুন রূপরেখা তৈরি করতে চাইছেন মমতা।
কোয়েল মল্লিকের নাম উচ্চারণ না করলেও তাঁর পদত্যাগ ও বিজেপি নেতার সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘দেখলাম এক সাংসদ আগে ইমেল করে পদত্যাগ করেছেন, পরে সশরীরে গিয়ে দেখা করে পদত্যাগ করেছেন।’ এই মন্তব্যের মধ্যেই দলত্যাগীদের প্রতি তাঁর অসন্তোষ ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দল ছেড়ে যাঁরা চলে যাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই নাকি এখনও গোপনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘যাঁরা থাকবেন তাঁরাই সোনার খনি।’ এই কথার মাধ্যমে তিনি দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে মনোবল ধরে রাখার বার্তা দেন। বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণও শানিয়েছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপ ও নানা উপায়ে তৃণমূলকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার জোরে অনেক কিছু করা যায়, নাম বদলানো যায়, প্রতীক বদলানো যায়, কিন্তু আদর্শ বদলানো যায় না।’ এই মন্তব্যে তিনি রাজনৈতিক লড়াইকে আদর্শের প্রশ্নে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।
শুধু রাজ্য রাজনীতি নয়, কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। দিল্লির বর্তমান অবস্থার সমালোচনা করে মমতা বলেন, ‘দিল্লির সমর্থনে যা ইচ্ছা করছেন, আগে দিল্লির পরিস্থিতি সামলান।’ এই প্রসঙ্গে তিনি সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের (Sonam Wangchuk) অনশন আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেন এবং কেন তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রের কোনও প্রতিনিধি কথা বলতে গেল না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ২১ জুলাই শহিদ দিবস ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ছে। আদালতের নির্দেশ মেনে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন মমতা। পাশাপাশি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, শহিদ পরিবারের উপরেও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর বহু বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন এবং নিজেদেরই আসল দল হিসেবে দাবি করছেন। লোকসভার একাধিক সাংসদ অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, যার ফলে সাংগঠনিক শক্তিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দলের সম্পত্তি ও প্রতীক নিয়েও টানাপড়েন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এই অবস্থায় মমতার ‘ডেডলাইন’ ঘোষণাকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি যেন একপ্রকার স্পষ্ট করে দিলেন, দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব রেখে এগোতে রাজি নন। বরং নতুন করে দল সাজিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, আগামী কয়েক সপ্তাহ তৃণমূলের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। ২১ জুলাইয়ের পর মমতা কীভাবে দল পুনর্গঠন করেন, কাদের নিয়ে নতুন রূপরেখা তৈরি করেন, সেটাই এখন নজরে। কোয়েলের ইস্তফা সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে অনিশ্চয়তা এবং জল্পনা, দুই-ই পাশাপাশি চলছে। তবে মমতার বার্তা পরিষ্কার, দলে থাকতে হলে শর্ত মেনে চলতে হবে, নচেৎ পথ আলাদা। এই অবস্থান ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা বদলাবে, তা সময়ের অপেক্ষা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonam Wangchuk hunger strike update, Mamata Banerjee call news | যন্তরমন্তরে অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে ফোন মমতার, ১৭ দিনে বাড়ছে উদ্বেগ, রাজনৈতিক মহলে নতুন সাড়া



