সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি: বহুবিবাহ রুখতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিল অসম (Assam) সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করতে গিয়ে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বরুয়া (Jayanta Malla Baruah) নামও উঠে এসেছে রাজনৈতিক পরিসরে) জানিয়েছেন, বহুবিবাহে যুক্ত পুরুষদের বিরুদ্ধে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তিরা সরকারি চাকরি হারাতে পারেন এবং রাজ্যের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবেন। ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
১০ জুলাই অসম বিধানসভায় বাজেট পেশের সময় এই নীতির কথা তুলে ধরা হয়। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করা হচ্ছে। যদি কোনও সরকারি কর্মী বহুবিবাহ করেন, তবে তাঁকে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে। এ জন্য অসম সার্ভিসেস ডিসিপ্লিন অ্যান্ড অ্যাপিল রুলস, ১৯৬৪-তে সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এই সংশোধন কার্যকর হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে এবং পরিষেবায় নৈতিক মানদণ্ড আরও দৃঢ় হবে। শুধু সরকারি কর্মচারী নয়, সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। বহুবিবাহে যুক্ত ব্যক্তিরা ‘অরুণোদয়’ (Orunodoi Scheme), বার্ধক্য ভাতা, ‘অন্নদাতা’ (Annadata Scheme) সহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা ও খাদ্য সুবিধা থেকে বাদ পড়বেন। সরকারের মতে, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির লক্ষ্য সমাজের দুর্বল অংশকে সহায়তা করা; সেখানে পারিবারিক স্থিতি নষ্ট করে এমন প্রথাকে উৎসাহ দেওয়া যাবে না।
এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma)। তাঁর কথায়, ‘এই পদক্ষেপ নারী ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা এবং দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহুবিবাহ নারীর মর্যাদায় আঘাত হানে, পরিবারে অস্থিরতা তৈরি করে এবং সামাজিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।’ সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, এই নীতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সামাজিক সমস্যার মোকাবিলার অংশ। এর আগেই চলতি বছরের মে মাসে অসম বিধানসভায় ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি (Uniform Civil Code) বিল পাস হয়েছে। সেই আইনে রাজ্যে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার পথ সুগম হয়। তবে সংবিধানের ষষ্ঠ তপশিলভুক্ত অঞ্চল এবং তপশিলি উপজাতি সম্প্রদায়গুলিকে এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ থাকে। সরকার জানিয়েছে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
বাজেট ঘোষণার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। শাসকদল বিজেপি (Bharatiya Janata Party) -এর নেতারা এই পদক্ষেপকে সামাজিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, বহু বছর ধরে চলা কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে, বিভিন্ন নারী সংগঠনও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে মনে করছে। তাঁদের মতে, বহুবিবাহের কারণে বহু নারী আর্থিক ও মানসিক সমস্যার মুখে পড়েন, যার প্রভাব পড়ে সন্তানের শিক্ষার উপরও।
কিন্তু, বিরোধী দলগুলির একাংশ এই নীতির সমালোচনা করেছে। তাঁদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তে সরকারি হস্তক্ষেপ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সরকারি সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও সরকার পরিষ্কার জানিয়েছে, এই নিয়ম ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিতে প্রযোজ্য হবে এবং কোনও সম্প্রদায়কে আলাদা করে দেখা হবে না।
প্রশাসনিক মহলের ধারণা, এই নীতি কার্যকর হলে সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে, যেখানে এখনও বহুবিবাহের কিছু প্রভাব রয়েছে, সেখানে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা পাওয়ার শর্ত কঠোর হওয়ায় মানুষ নিয়ম মেনে চলার দিকে বেশি আগ্রহী হতে পারেন।
উল্লেখ্য, অসম সরকারের এই পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরেও নজর কাড়ছে। বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের নীতি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সমাজে সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত, এই ঘোষণার মাধ্যমে বহুবিবাহ ইস্যু নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এবং আগামী দিনে এই নিয়ে আরও বিতর্ক ও নীতি নির্ধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sushmita Dev resignation news, TMC MP quits Rajya Sabha | রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা, তৃণমূল ছাড়লেন সুস্মিতা দেব! দিল্লিতে হিমন্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘিরে জোর জল্পনা, বিজেপিতে কি নতুন পর্ব?




