সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শহরের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে, এই বাস্তবতাকে সামনে এনেই তিনি উন্নত ট্রমা কেয়ার গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যভবনে বৈঠক ও আকস্মিক পরিদর্শনের পর মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিন নবান্নে যাওয়ার আগে আচমকাই স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay), স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম (Narayan Swaroop Nigam)-সহ একাধিক আধিকারিকের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়। হাসপাতালের ভিতরে দালালচক্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়।
বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘প্রান্তিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষেরাই সরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভর করেন। তাঁদের পরিষেবা দিতে কোনও খামতি রাখা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই প্রাইভেট হাসপাতালে যান, কিন্তু এখানে যারা আসেন, তাদের জন্য দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামাজিক ভূমিকার উপর জোর দেন তিনি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হল বড় বিপর্যয় সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘৫০-১০০ জন রোগী পর্যন্ত সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু একসঙ্গে কয়েকশো মানুষকে দ্রুত পরিষেবা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।’ সাম্প্রতিক তারাতলা এলাকার একটি দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, সেই ঘটনার পর থেকেই উন্নত ট্রমা কেয়ার সেন্টার তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভূত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, কলকাতার কোনও একটি বড় সরকারি হাসপাতাল চত্বরে আধুনিক ট্রমা কেয়ার সেন্টার তৈরি করতে হবে, যেখানে একসঙ্গে অন্তত ২৫০ জনকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি জানান, শহরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত জমি রয়েছে, যা ব্যবহার করে এই ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। কোথায় এই কেন্দ্র তৈরি হবে, তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যসচিব মিলেই ঠিক করবেন।
শুধু ট্রমা কেয়ার নয়, হাসপাতালের অন্যান্য পরিষেবার দিকেও নজর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শহরের সরকারি হাসপাতালগুলিতে বার্ন ইউনিটের মানোন্নয়ন প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি বেডের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন। এসএসকেএম (SSKM Hospital)-এ ইতিমধ্যে ১০০টি বেড বাড়ানো হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবারের একটি ঘটনার উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বেডের অভাবে কিছু রোগীকে অপারেশন না করিয়ে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে এবং তাঁদের ১০ দিন পরে আসতে বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত বেড বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পুজোর আগেই আরও ২৫০টি বেড বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান।
হাসপাতালে রোগীর পরিজনদের জন্য অপেক্ষার ব্যবস্থা নিয়েও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার বদলে তাঁদের জন্য শেড তৈরির কথা বলেন তিনি। সেই শেডে পাখা, বসার জায়গা এবং শৌচালয়ের ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই পরিকাঠামো আরও উন্নত করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর নজরদারি বাড়াতে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যভবনে ইতিমধ্যেই একটি কন্ট্রোল রুম তৈরি হয়েছে, যা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। আপাতত কয়েকটি স্টেট ও জেলা হাসপাতালে এই মনিটরিং শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে মহকুমা স্তর পর্যন্ত এই পরিষেবা চালু হয়ে যাবে।
যদিও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং আউটডোর পরিষেবা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘আধিকারিকেরা দক্ষ, তাঁদের সঠিক দিশা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারলেই পরিষেবা আরও উন্নত হবে।’ পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে দালালচক্র সম্পূর্ণ নির্মূল করার উপরও জোর দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘মানুষ যখন হাসপাতালে আসে, তখন তারা ভরসা নিয়ে আসে। সেই ভরসা বজায় রাখতে হবে। পরিষেবা দিতে হবে নিষ্ঠা নিয়ে।’ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করে তুলতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারি হাসপাতালগুলির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই সরাসরি মন্তব্য রাজ্যের স্বাস্থ্য নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। উন্নত ট্রমা কেয়ার, বাড়তি বেড, নজরদারি ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে আগামী দিনে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal anti social activities bill 2026, Suvendu Adhikari new law details | ‘গুন্ডাদমনে’ কড়া পথে বাংলা! এক বছর আটক, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত : নতুন আইনে বড় পদক্ষেপ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের




