সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ল। জেলায় জেলায় পঞ্চায়েত প্রধানদের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে কড়া সতর্কবার্তা দিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বহু পঞ্চায়েত প্রধান দফতরে যাচ্ছেন না, যার জেরে গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নমূলক কাজ কার্যত থমকে রয়েছে। পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে বলেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। একাধিক প্রশাসনিক সূত্রে উঠে এসেছে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দু’হাজার পঞ্চায়েত প্রধান নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকছেন না। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সই হচ্ছে না, প্রকল্পের কাজ আটকে যাচ্ছে ও সাধারণ মানুষ পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। এই পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রায় দু’হাজার প্রধান অফিসে যাচ্ছেন না। কাজ হচ্ছে না। অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। আমরা বলব, হয় পদত্যাগ করুন, না হলে কাজ করুন।’ তাঁর আরও কড়া মন্তব্য, ‘এ ভাবে কাজ বন্ধ থাকলে ডিমের বদলে মানুষ বাড়িতে ঢিল মারবে।’
গ্রামবাংলায় পঞ্চায়েতই প্রশাসনের মূল ভরকেন্দ্র। রাস্তা নির্মাণ থেকে পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, এসবকিছুই পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। ফলে পঞ্চায়েত প্রধানদের অনুপস্থিতি সরাসরি উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বহু প্রকল্প বর্তমানে ধাক্কা খাচ্ছে। উল্লেখ্য, রাজ্যের অধিকাংশ পঞ্চায়েত দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) নিয়ন্ত্রণে ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই পঞ্চায়েত কাঠামোই দলটির শক্তির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই কাঠামোয় ফাটল ধরেছে বলে বিভিন্ন মহলের দাবি। একাধিক জায়গায় পঞ্চায়েত বোর্ড ভেঙে গিয়েছে, অনেক নেতা পদত্যাগ করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর মন্তব্য রাজনৈতিক তাৎপর্যও বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ক্ষমতা হারানোর পর বহু পঞ্চায়েত নেতা নিজেদের আড়ালে রাখছেন, যাতে প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতায় না পড়তে হয়। তবে শাসক দলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ মানতে নারাজ তৃণমূলের নেতারা। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) এই প্রসঙ্গে পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, ‘পঞ্চায়েত প্রধানেরা অফিসে যাচ্ছেন না, এটা ঠিক নয়। তাঁদের যেতে দিচ্ছে না বিজেপির কর্মীরা এবং পুলিশ। অফিসে গেলেই মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে।’ তাঁর দাবি, পঞ্চায়েত অফিসগুলির নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ, ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না।
অন্যদিকে, রাজ্যের প্রাক্তন পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার (Pradip Majumdar) বিষয়টি নিয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান মন্ত্রী নিশ্চয়ই তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলেছেন। তবে বিভিন্ন জায়গায় নানা পরিস্থিতি রয়েছে, সেটাও বিবেচনায় রাখা দরকার। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই।’ প্রসঙ্গত, রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একাধিক তৃণমূল নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। প্রাক্তন বিধায়ক, কাউন্সিলর থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিক অনিয়ম বা তোলাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলির জেরে অনেক নেতা জনরোষের মুখেও পড়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এই ধরনের ঘটনা পরিকল্পিত ভাবে ঘটানো হচ্ছে এবং বিরোধী দলের কর্মীরাই এর পিছনে রয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু, পঞ্চায়েত স্তরে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু এলাকায় রাস্তা সংস্কার, আবাসন প্রকল্প, পানীয় জল সরবরাহ সহ একাধিক কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সাধারণ মানুষ দ্রুত সমাধান চান এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন। রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের কড়া অবস্থান এই পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে পঞ্চায়েত স্তরের নেতৃত্বের উপর। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালন না করলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রশাসনিক স্তরেও বিষয়টি নিয়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। প্রসঙ্গত, গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন এবং পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সংকট কত দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ সচল রাখা, এই চ্যালেঞ্জই এখন রাজ্যের সামনে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, Mamata Banerjee | শুভেন্দুর তোপে মমতা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসের অভিযোগে তোলপাড় বাংলা



