সম্পাদকীয়
শান্তি। এই শব্দটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অথচ সবচেয়ে অধরা বাস্তবতা। ইতিহাসের পাতা উল্টোলে আমরা দেখি, সভ্যতার বিকাশের প্রতিটি ধাপে মানুষ যেমন জ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির উন্নতি ঘটিয়েছে, তেমনি সংঘাত, যুদ্ধ ও বিভাজনের ছায়াও তার সঙ্গী হয়েছে। অতীতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই শান্তির ধারণা একদিকে যেমন সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য ছিল, অন্যদিকে ক্ষমতা বিস্তার ও আধিপত্যের লড়াই তাকে বারবার ভেঙে দিয়েছে। প্রাচীন রাজ্যগুলোর মধ্যে যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ শান্তিকে দুর্লভ করে তুলেছিল। তথাপি, এই অস্থিরতার মধ্যেই শান্তির দর্শন গড়ে উঠেছে। বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসা, অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধের পর পরিবর্তন, কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবতাবাদী চিন্তার উত্থান প্রমাণ করে যে মানুষ প্রতিনিয়ত শান্তির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করেছে।

বর্তমান সময়ে শান্তির ধারণা আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। একদিকে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের বিপ্লব মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিচয়-রাজনীতি নতুন সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ কমলেও সমাজের ভেতরে নানা ধরনের সহিংসতা বেড়েছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতিগত বিদ্বেষ, সাইবার আক্রমণ, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি আজকের বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ। শান্তি এখন ন্যায়বিচার, সমতা, সহনশীলতা ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে যে, আমরা সত্যিই কী শান্তিতে আছি? সামাজিক মাধ্যমে ক্রমাগত প্রতিযোগিতা, তথ্যের অতিরিক্ত চাপ আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভঙ্গুর অবস্থা মানুষকে অদৃশ্য অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বাইরের পৃথিবী কখনও শান্ত হলেও মানুষের ভেতরের জগতে অশান্তি ক্রমেই বাড়ছে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যদি সমাধান না হয়, তবে বৃহত্তর সামাজিক শান্তিও স্থায়ী হতে পারে না।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে শান্তির ধারণা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেই মনে হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের সংকট, প্রযুক্তির অপব্যবহার আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নতুন ধরনের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সম্ভাবনাও রয়েছে যে শিক্ষা, সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। একথা অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভবিষ্যতের শান্তি নির্ভর করবে আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি সহিংসতার পরিবর্তে আলোচনা, বিভেদের পরিবর্তে সহাবস্থান ও স্বার্থপরতার পরিবর্তে সহমর্মিতাকে বেছে নিতে পারি, তবে শান্তি শুধুই কল্পনা নয়, বাস্তবতার রূপ পেতে হতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মনে রাখতে হবে, শান্তি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, মনের ভেতর থেকে গড়ে তুলতে হয়। অতীত আমাদের শেখায় এর মূল্য, বর্তমান আমাদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আর ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। এই তিনের সমন্বয়ে যদি আমরা একটি সচেতন, মানবিক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারি, তবেই প্রকৃত শান্তির পথে এগোনো সম্ভব।🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
শ্রীশ্রীরামনাম-মাহাত্ম্য
১.
মহাবীরের অভয়বাণী— “যে মন্ত্রপরায়ণ মানব নিত্য ভক্তি সহকারে উত্তমরূপে রামকে স্মরণ করেন,হে মুনীশ্বরগণ,আমি তাঁহার ইষ্টসংদ্ধির জন্য দীক্ষিত । সর্ব্বপ্রকারে জাগরুক,রামকার্য্যধুরন্ধর (ভারবাহক) আমি রাঘবের ভক্তগণের বাঞ্ছিত বস্তু প্রদান করিয়া থাকি।”

রামনামে জাগরিতা প্রেমময়ী নাদময়ী জগজ্জননী কুলকুন্ডলিনী আবেশে বিভোর হইয়া রামনামকারীকে সতত সুমধুর সঙ্গীত শুনাইতে শুনাইতে কখন যে প্রাণনাথের সহিত একীভূতা হইয়া যান,নামপ্রেমী তাহা জানিতেও পারেন না।
সেইজন্য শাস্ত্র উচ্চকন্ঠে বলিয়াছেন— যোগের মধ্যে পরম যোগ রামনাম কীর্ত্তন।
—নামই পরম জ্ঞান,ধ্যান,যোগ ও প্রেম। একমাত্র রামনামই পরম গোপনীয় বিজ্ঞান।
—নামই পরম জ্ঞান,নামই অখিল জগৎ,নামই জীবগণের জীবন,নামই বিপুল ধন।
—রামনাম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান,রামনাম পরম রস,রামনাম অতি প্রশস্ত মন্ত্র,রামনাম পরম শোভন জপ।
রামনাম রসপানে মানব ভুমা-সুখ লাভে সমর্থ থাকে।
রামনাম কেবল রস নহেন,রসতম ওঙ্কারেরও আকর ! ওঙ্কারও রাম নাম হইতে উৎপন্ন হন।
এই রামনাম গ্রহণে যোগী,কর্ম্মী সকলেই স্ব-স্ব অভীষ্ট লাভে কৃতার্থ হইতে পারিবেন।
এখানে জিজ্ঞাস্য— যদি রামনামের দ্বারা সকলেই কৃতার্থ হইতে সমর্থ হন, তাহা হইলে সাংখ্য-যোগ-বেদান্তাদি শাস্ত্র নিরর্থক ? —না, নিরর্থক বলিতে পার না। কেন না,সকলের অধিকার একরূপ নহে; জন্মান্তরের কর্ম্ম অনুসারে মানুষের প্রকৃতি গঠিত হয়। যিনি পূর্ব্বজন্মে যে শাস্ত্রে ও সাধনে অনুরাগী ছিলেন, পরজন্মে তিনি সেই শাস্ত্রে ও সাধনে অনুরাগসম্পন্ন হন। মুল সূত্র— “বহু হইব— জন্মগ্রহণ করিব”। তজ্জন্য অধিকারী ভিন্ন ভিন্ন ; তাঁহারা স্ব-স্ব অভিমত শাস্ত্র অবলম্বনে সাধন করত পরমানন্দ প্রেম-পারাবারে অভিসার করিয়া থাকেন।
এই রামনাম পরমপাথেয় যিনি গ্রহণ করিয়াছেন,তাঁহার জ্ঞান,যোগ ও মুক্তি না চাহিলেও স্বতঃই হইয়া যায়।
—ভক্তগণ সালোক্য,সামীপ্য,সারূপ্য ও সাযুজ্য মুক্তি ভগবান দান করলেও গ্রহণ করেন না। তাঁহারা চাহেন সেবা।
শ্রীভগবান স্বয়ং বলিয়াছেন, “দদাত্যপি ন গৃহ্নন্তি ভক্তা মৎসেবনং বিনা”। —ভক্তকে মুক্তিসকল দান করলেও ভক্তগণ মুক্তি গ্রহণ করেন না। একমাত্র ভগবদভক্তি প্রভাবেই ভক্তগণ শ্রীভগবানকে লাভ করিয়া থাকেন। শ্রীভগবান এ যুগেও দর্শন দান এবং যোগক্ষেম বহন করেন।
—শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩৫.
সত্যের পূর্বাভাস
পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু দিশা মিত্র জানতেন যে, আসলে কিছুই আর আগের মতো নেই! জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সাধারণ দেখায়, অথচ ভেতরে ভেতরে তারা একটি বড় পরিবর্তনের শুরু। আগের রাতের ফোনকলের পর থেকে তার মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে স্থির হয়ে থাকা জলরাশির নিচে কোথাও একটি স্রোত আবার জেগে উঠেছে। তিতাস যথারীতি সকালে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে সামান্য কথাবার্তা বলল, চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় কয়েক মিনিট দাঁড়াল, তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এই সাধারণ দৃশ্যটুকু দেখতেই দিশার বুকের মধ্যে হালকা একটা চাপ অনুভূত হলো। তিনি ভাবছিলেন, যদি এই মেয়েটা সব জানত, তাহলে কি একইভাবে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যেত? তার হাঁটার ভঙ্গি কি বদলে যেত? তার চোখের দৃষ্টি? তার মায়ের প্রতি বিশ্বাস?
দূরে কোথাও আরেকজন মানুষ, রণজয় সান্যাল! একটি হোটেল রুমে বসে বহু বছর আগের সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সামনে খোলা একটি পুরনো খাম। ভেতরে একটি ছবি। ছবিতে ছোট্ট একটি মেয়ে। তিতাস। যার সঙ্গে তার কখনও পরিচয় হয়নি। সে ছবিটার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে ছবির উপর হাত রাখল।
প্রশ্নগুলো উত্তর চাইছিল, কিন্তু কোনো উত্তর ছিল না। তিতাস চলে যাওয়ার পরে তিনি অনেকক্ষণ বসে রইলেন ডাইনিং টেবিলে। চায়ের কাপের ভেতরের চা ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি খেয়ালও করলেন না। অবশেষে দুপুরের দিকে আবার ফোন এল। রণজয়। এবার তিনি অবাক হলেন না।
—কোথায় আছ?
ওপাশ থেকে খুব সংযত গলায় উত্তর এল- শহরেই। একটা হোটেলে উঠেছি।
—কী চাও?
প্রশ্নটা কঠিন ছিল। কিন্তু দিশা ইচ্ছে করেই কঠিন করলেন। বহু বছর আগে তিনি এমন ছিলেন না। তখন তিনি ব্যাখ্যা খুঁজতেন। এখন তিনি সরাসরি উত্তর চান। রণজয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।
—কেন?
—কারণ কিছু কথা বলা দরকার।
—এত বছর পরে?
—হ্যাঁ।
দিশা দীর্ঘক্ষণ কিছু বললেন না। অদ্ভুত ব্যাপার, তার রাগ হচ্ছে না। অন্তত সেই অর্থে না, যেভাবে একসময় হত। বয়স মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। তার মধ্যে একটি হল, রাগও একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,
—আজ না। কাল।
রণজয় শুধু বলল,
—ঠিক আছে।
ফোন কেটে গেল। কিন্তু ফোনের পরেও কথোপকথন শেষ হল না। বরং শুরু হল। সেদিন বিকেলে সোমদত্তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন দিশা।
স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। অফিসঘর প্রায় ফাঁকা। করিডোরে মানুষের শব্দ নেই। এই ধরনের বিকেল সোমদত্তার সবসময় ভালো লাগে। স্কুলের ভিড়ের পরে এই নীরবতা যেন তাকে নিজের সঙ্গে একা থাকতে দেয়।
দিশাকে দেখে তিনি বুঝলেন, কিছু একটা ঘটেছে।
—কী হয়েছে?
দিশা বসে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললেন,
—রণজয় ফোন করেছে।
সোমদত্তা প্রথমে কিছু বললেন না। তার মুখের অভিব্যক্তিও বিশেষ বদলাল না। কিন্তু তার চোখের মধ্যে যে অল্প বিস্ময় জেগেছিল, তা দিশার চোখ এড়াল না।
—কী বলল?
—দেখা করতে চায়।
—তুমি করবে?
দিশা ধীরে বললেন,
—জানি না।
সোমদত্তা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—হয়ত করা উচিত।
—কেন?
—কারণ কিছু দরজা বন্ধ করার জন্যও একবার খুলতে হয়।
দিশা মৃদু হাসলেন,
—আপনি এখনও আগের মতোই কথা বলেন।
— আর তুমি এখনও আগের মতোই শুনে ফেল।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দিশা বললেন,
—আমি তিতাসের কথা ভাবছি।
সোমদত্তা জানতেন, কথাটা আসবেই।
—ওকে বলবে?
—জানি না।
—কিন্তু দেরি তো চিরকাল করা যাবে না।
—আমি জানি।
এই ‘জানি’ শব্দটার মধ্যে ক্লান্তি ছিল। কারণ মানুষ অনেক সময় জানে কী করা উচিত, তবু করতে পারে না।
সেদিন একই সময়ে অন্য এক পৃথিবীতে বেল্লার জীবনও একটু একটু করে বদলাচ্ছিল। সে এখন নিয়মিত লিখছে। ঋত্বিকের দেওয়া নীল খাতাটা প্রায় অর্ধেক ভরে গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল, সেখানে কোনও কবিতা নেই। কোনো সাহিত্যিক বাক্যও নেই। শুধু ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ। নিজেকে নিয়ে। নিজের দিন নিয়ে। নিজের ভয় নিয়ে। প্রথম পাতায় লেখা ছিল, ‘আজ আমি হাসতে পেরেছি।’ তারপরের পাতাগুলোতে আরও কিছু বাক্য জমেছে। ‘আজ আমি করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মাথা নিচু করিনি।’ ‘আজ আয়নায় তাকিয়ে পাঁচ সেকেন্ড বেশি দাঁড়িয়েছি।’
‘আজ কেউ আমার শরীর নিয়ে কথা বললেও আমি সারাদিন সেটা ভাবিনি।’ এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই তার কাছে বড় হয়ে উঠছে। সেদিন লাইব্রেরিতে বসে সে খাতাটা ঋত্বিককে দেখাল।
ঋত্বিক পড়ল। খুব মন দিয়ে। তারপর খাতা বন্ধ করে ফেরৎ দিল।
—কেমন?
বেল্লা প্রশ্ন করল।
—সত্যি।
—এটাই?
—সত্যি জিনিসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।
বেল্লা জানত না কেন, কিন্তু কথাটা তার ভালো লাগল। কারণ এতদিন সে নিজেকে নিয়ে যা ভেবেছে, তার অনেকটাই ছিল অন্যদের মতামত। এখন সে নিজের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করতে শিখছে। সেদিন স্কুল ছুটির পরে তারা মাঠের এক কোণে বসেছিল। শীতের রোদ দ্রুত ফিকে হয়ে আসছিল। চারপাশে ছাত্রছাত্রীরা প্রায় চলে গেছে। ঋত্বিক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
—তোমার সবচেয়ে বড় ভয় কী?
প্রশ্নটা শুনে বেল্লা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—মানুষ আমাকে চিনে ফেলবে।
ঋত্বিক অবাক হল।
—চিনে ফেলবে মানে?
—আমি যেমন, সেটা দেখে ফেলবে।
—আর সেটা খারাপ?
বেল্লা উত্তর দিতে পারল না। কারণ এতদিন ধরে সে ধরে নিয়েছিল, তার ভেতরে এমন কিছু আছে যা দেখলে মানুষ তাকে পছন্দ করবে না। কিন্তু সেই বিশ্বাসের ভিত্তি কোথায়, সে নিজেও জানে না।
ঋত্বিক বলল,
—আমি মনে করি মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় যখন সে নিজের একটা কাল্পনিক সংস্করণ হয়ে থাকতে চায়।
বেল্লা তাকিয়ে রইল,
—তুমি সবসময় এত কঠিন কথা বলো?
ঋত্বিক হেসে ফেলল,
—না। আমি শুধু যা ভাবি তাই বলি।
বেল্লাও হাসল। এবং সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, সে এই ছেলেটার উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষা তাকে ভয় দেখায়। আবার ভালোও লাগে। বাড়ি ফিরে সে দীর্ঘদিন পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজও সে নিজের চেহারার খুঁত খুঁজল না। দেখার চেষ্টা করল, তার চোখের মধ্যে কী বদলেছে। মানুষের চেহারা বদলানোর আগে অনেক সময় তার দৃষ্টি বদলায়। আর সেই পরিবর্তনই সবচেয়ে গভীর।
অন্যদিকে সেই রাতে অনীক তিতাসের সঙ্গে দেখা করল। কফিশপে। একেবারে সাধারণ একটি দেখা। তবু দু’জনের মধ্যেই আজ অদ্ভুত একটা অস্বস্তি ছিল। কথা হচ্ছিল। হাসিও চলছিল একে-অপরের মধ্যে। কিন্তু অনীকের মাথার ভেতরে ঘুরছিল ডায়েরির কথা। দিশার কথা। রণজয়ের কথা। আর তিতাস কিছুই জানে না। তিতাস হঠাৎ বলল,
—কী ভাবছ?
—কিছু না।
—মিথ্যে।
— এত বোঝো?
— একটু।
অনীক হেসে ফেলল। তারপর হঠাৎ মনে হল, সত্যিই যদি কোনওদিন সবকিছু জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে এই মেয়েটার দিকে সে কীভাবে তাকাবে?
আর তিতাস? সে কি আগের মতো থাকবে? কফির কাপের উপর দিয়ে তাকিয়ে তিতাস বলল,
—আজ তোমাকে খুব অদ্ভুত লাগছে।
অনীক উত্তর দিল না। কারণ সে জানত, কিছু সত্যি মুখে বলার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু সেই সময় যে দ্রুত এগিয়ে আসছে, সেটা সে অনুভব করতে পারছিল।
ঠিক যেমন দূরে কোথাও আরেকজন মানুষ, রণজয় সান্যাল! একটি হোটেল রুমে বসে বহু বছর আগের সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সামনে খোলা একটি পুরনো খাম। ভেতরে একটি ছবি। ছবিতে ছোট্ট একটি মেয়ে। তিতাস। যার সঙ্গে তার কখনও পরিচয় হয়নি। সে ছবিটার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে ছবির উপর হাত রাখল। কিছু ঋণ অর্থ দিয়ে শোধ হয় না। কিছু ঋণ ক্ষমা চেয়েও শোধ হয় না। কিছু ঋণ শুধু মানুষকে বহন করতে হয়। বহু বছর ধরে। আর কখনও কখনও সেই ঋণই তাকে ফিরিয়ে আনে এমন একটি দরজার সামনে, যে’টি সে একদিন নিজেই বন্ধ করে চলে গিয়েছিল। 🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
সুপ্রভাত মেট্যা -এর দু’টি কবিতা

নারীসমগ্রের কেন্দ্রীয় উপন্যাস
সত্য অখণ্ড, পূর্ণ শক্তিমান।
সম্পুর্নতা, সিদ্ধ হস্তের অক্ষরফলনেষু
জন্মশব্দ, আর
জীবনী পঙক্তির রেখা আবির্ভাবের ভাষা বইতে বইতে,
কৃষ্ণ সন্ধ্যার গাঁয়ে গিয়ে
অমৃতসংকীর্তনের কথা বলে।
বক্তব্য ,ভারি হাওয়ায় ভোর থেকে উঠে আসে আলোয়।
অন্ধকার, কুসুম সদৃশ নরম হৃদয়ে
মধুছন্দার ভাষা জমে ,ক্ষীর হয়।
অপূর্ব পরাগ আশ্চর্যের উড়ন্ত কণিকা
ডানা মেলে ঘুরে বেড়ায়।
ধর্ম পুকুরের ঘাটে, নগ্ন স্নানে জেগে ওঠে
সর্বস্ব শরীরীর এক ক্ষুধা।
সমুদ্র বক্ষের বিশাল ঢেউ উত্তলতায়
নারীসমগ্রের কেন্দ্রীয় উপন্যাস রচিত হয়
পৃথিবী ছাপিয়ে…

গলনলম্বিত
বহুরূপ ব্যবহার সামগ্রীর মধ্যেই তিনি অন্তর্নিহিত…
লিখিত বই আকারের অক্ষর শরীরী সংলাপ,
সদুপদেশজনিত যাপন চরিত্রের কথা বলতে বলতেই
একদিন আদর্শ জীবনী হয়ে যায়।
বিরহরহিত হয়, মন।
মৃত্যু পরবর্তী অনন্ত শূন্যতার ভিতরেই,
জন্মের হিমাঙ্কুর, গলনলম্বিত হয়ে
কাঙ্ক্ষিত সংসারধর্মিতা পালন করতে করতে
আবার সেই মৃত্যুমুখীই হয়ে পড়ে!
চক্রাকার বলয় প্রবৃত্তির ঘূর্ণায়মান দৃশ্যকল্পই,
শুরু থেকে শেষ অবধি,
আসা এবং যাওয়ার পূর্ণ প্রতিফলনের
এক চিরন্তন রূপ হয়ে দাঁড়ায়।
ঐশ্বরিক বিশেষ কৃপা বর্ষণের অনন্ত ধারার মধ্য দিয়েই
স্বপ্ন জাগতিক হয়ে,
ইচ্ছে পূরণের আলো ছড়িয়ে পড়ে ,একান্তই মহৎ।
বৈদূর্য্য সরকার -এর একটি কবিতা

নেকড়ে জন্ম
দলের সবার আগে বৃদ্ধ ও অশক্ত সদস্যেরা
তারপর সবথেকে লড়াকু ও শক্তিমান অংশ,
এরপর বাচ্চাকাচ্চাদের দল মায়েদের সাথে
তাদের পেছনে যোদ্ধাদের শক্তসামর্থ্য বাহিনী…
সবার শেষে একাকী দলপতি প্রখর নজরে।
প্রথমদিকে অভিজ্ঞদের গতিতে চলে সবাই
পরের অংশ হঠাৎ বিপদে পড়লে তাদের বাঁচায়,
তরুণরা তারপরে থেকে নিশ্চিত করে আগামী
তাদের রক্ষা করতে একদল যোদ্ধা শশব্যস্ত…
সবাইকে দেখে রাখা দলপতি একটু তফাতে।
কারোর নাম থাকে না, থাকে শুধু জীবনের বীজ
সেটা বাঁচাতে সারাজীবন ঝক্কি পোহানো সবার
নিষ্ঠুর নেকড়েরা দলের কাউকে কামড়ায় না…
এই সংগঠন মানুষের মগজে ঢোকে না বলে
মানুষ আঁধারে আঁচড়ায় শ্বাপদের জিঘাংসায় !
মাধুরী বিশ্বাস -এর দু’টি কবিতা

মেঘ মানে বৃষ্টি
এখনও নিরুদ্দেশ মাঝ রাতে
হঠাৎ মেঘ কেঁদে ওঠে অন্ধকারে মুখ ঢেকে।
নুপুর খুলে নিশ্চুপ পায়ে
বৃষ্টি নামে পাহাড়ি ঝর্নার মতো।
মেঘ শুধু ভেসে বেড়ায় ঠিকানাহীন
আকাশের বুকে আর মুখ গোঁজা যায় না।
ছয় ঋতু পেরিয়ে, সদ্য বিরহ লেগেছে ভাবছো?
আকাশের বাহুপাশে পূর্ণিমার চাঁদ হাসে,
গল্পটা বহুপ্রাচীন…
তাই মেঘলা মানে উদাসী, মেঘ মানে বৃষ্টি।

কবিতার পোশাক
আগের লেখা গুলো সুন্দর মানাত আমায়
অন্তত আমার তাই মনে হয়।
এখন আমার বোনা শব্দ গুলো কেমন বিবর্ণ লাগে বড়ো।
আমার এক এক ইঞ্চির হিসাব জানো আমি,
তবে কেন…?
কবিতার পোশাকগুলো গায়ে দিলে বসে না ভাঁজে-ভাঁজে।
কেমন যেন অচেনা অচেনা সারেঙ্গী বাজে।
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

ঘুড়িবেলা
হাওয়ার দজ্জাল উড়িয়েছে বালকের ঘুড়ি।সেই মাঠ সাদাধুলো আলের পৌরুষ।
পরাজয়গন্ধ আগ্রাসী রোদ আপার বা লোয়ার কাট চালানোর সময় নেই,সূর্য ঢলে যায়।
ওরা ছুটছে ধুলো উড়ছে ঘুড়ি পেরিয়ে যায় একানড়ে তালগাছ আকাশের কাছাকাছি।
ঘিয়েরং চিটফল বৈকালিক নির্মাণ,কাল আবার যুদ্ধজয় ঘুড়িবেলা ফিরেছে।
বইয়ের ব্যাগ ছুঁড়ে ছুট,দুধ-মুড়ির বাটি মা যেন এক ব্যর্থ স্প্রিন্টার বালকেরা সূর্যশিকারে যায়।
হীনবল প্রবল পালিয়ে বাঁচে সীমানার পারে।রাখা থাক বাটি-গ্লাস,বই দেখে ঘুম– ঠাকুমাপ্রবাদ।
ক্লান্তসৈনিক।সেই ঘুড়িবেলা ঠাকুরদা-হাসি আর মায়ের অ্যানিমিক মুখ।সুখ।সুখের ভাস্বর।
সুবীর ঘোষ -এর দু’টি কবিতা

সবাই ফিরতে চায়
সবাই ফিরতে চায় ঘরে। রাত্রিবাস বাইরে বিস্বাদ। উঠোনে আঁধারমাখা নিমগাছ। ভয়চারী নাট্যদল। ঝরাপাতা জমে যাচ্ছে ঘরে। বিয়োগপর্বটি ডেকে আনো। ছুটছে এ জীবনের চাকা। গতি পান্থ অগোচর। নিঃশেষে ফুরায় বায়ু। সংকল্প সমুদ্র গতিক। হাতে হাত রাখো ভিক্ষু। সন্তর্পণে চল চলে যাই। যে কথা বলার ছিল একঘর দুইঘর তিনঘর করে ক্রমশ বাড়তে থাকে প্রকাশেচ্ছু লতানে বিতান।

স্পর্শবিদ্যুৎহীন একা নারী
কষ্টে থাকে খুব স্পর্শবিদ্যুৎহীন একা নারী
সীমান্তস্পৃষ্ট বৃদ্ধ ঝরাপাতা জড় করে আগুন জ্বালায়।
এ সব দেখতে থাকি
দেয়ালে প্লাস্টার খসে টুপটাপ।
নিজের আশ্রয় কত অর্থহীন মনে হয়;
নিরাপত্তার গভীর অভাবে কাঁদে
বিশ্বস্ত ডাইরির বিছেহার–
শকুন্ত পাখির খোঁজে বিজ্ঞাপন দিই ।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
২১.
তিথি ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি কাজে হাত লাগাল। সোমাদি বলেই গিয়েছিল কাজে আসবে না। উফ! মর্নিং স্কুল এত কাজ কি করে করব তিথি ভাবতে ভাবতে দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করে। কি ব্যাপার হল আমার পুচু টা কোথায় গেল তিথি বাসন মাজার থালাটা সরিয়ে রেখে দ্রুত পুচু পুচু বলে ডাকতে লাগল পুচু সোনা, ও পুচু সোনা, আমার পুচিটা কোথায় গেল রে? আয়রে আমি তো দেখতেই পাচ্ছি নে।
পুচুকে অনেক আদর করে তিথি গেটটা লাগিয়ে দিল।
পুচু কিউ কিউ করে কি জানাতে চাইলো কে জানে
এরমধ্যে ফোন বেজে উঠল,
‘মনে রবে কিনা রবে নীরবে…’
—হ্যালো… ওদিক থেকে কোনও আওয়াজ নেই।
আশ্চর্য কোথাও কিন্তু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না তবে কি বুবুনের ঘরের শোবার খাটের নিচে আছে নাকি শোপাটার উপর শুয়ে আছে বাইরের ঘরে, ঘুমিয়ে পড়েছে তিথি দ্রুত ছুটে যায় সেখানে। না সেখানে ওর দেখা নেই এবার তিথির মনের ভেতরে কেমন যেন একটা অজানা ভয়ের আশঙ্কা জমাট বাঁধে।
আজকে আর স্কুলে যেতে পারবেনা তিনি ই তো ভেবেই নিয়েছে তাহলে আর আজকে স্কুলে যাবে না। একটা মেসেজ করে দিতে হবে। টিআইসি কে ও তাড়াতাড়ি টেক্সট করল।
কিন্তু পুচুকে না পেলে তো ওর বুকের ভেতরটা কেমন ধড়ফড় করতে শুরু করল ।এরকম কেন হলো এভাবেই বা হচ্ছে কেন। না এবার পবিত্র কে তুলতেই হবে দ্রুত ঘরে আসলো। দেখছে কুম্ভকর্ণের মত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। এদিকে তিথির যেন হার্ট ফেল হবার অবস্থা। না না আমার পুচু সোনাকে না পেলে তো আমি পাগলী হয়ে যাব তিথি মনে মনে এই কথাটা ভাবতেই থাকে কি গো আর কত ঘুমাবে? এদিকে তো সব্বনাশ হতে চলেছে। এই তোমাকে বলেছি না আমার কাঁচা ঘুম তুমি ভাঙাবে না। আবার ফের তুমি এসেছ?
পবিত্র কাত হয়ে অন্যদিকে শুয়ে পড়ল। তিথির রাগেতে পারদের মাত্রা ঝরতে লাগল, শেষে চিৎকার করে বলল,
—কিগো তোমাকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছ না।
—আমি তোমার সাথে মশকরা করছি না কিন্তু ঘটনা সিরিয়াস।
কি হয়েছে?
—আরে পূচুকে কোথাও পাচ্ছি না।
—কি বলছ, এসব ঘুম থেকে উঠে যেন অথৈ জলে পড়ল।
—তাহলে আর কি বলছি।
—খুঁজেছ ও-যেখানে যেখানে থাকে।
—হ্যাঁ গো। তাদের এতক্ষণ ধরে ডাকছি ডাক শুনে আসবে না ও
—গেট কি খোলা ছিল?
–কি জানি!
—এই ন্যাকা ন্যাকা কথা ব’লো না।
—নাও তুমি আমাকে বকাবকি করার অনেক সময় পাবে।
হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ।
—কে বেল বাজাচ্ছে দেখো
হ্যাঁ যাই।
—ও বৌমা বৌমা বৌমা!
—দাঁড়ান বেল বাজার থেকে দেখে আসছি।
—এ বাবা অখিল দা আপনি?
—তোমরা কেমন মানুষ গো
কেন কি হয়েছে?
—আরে আমাদের বাড়ির সামনে এসে বেল বাজিয়ে এই দেখো তোমার পোষ্যকে দিয়ে গেল।
—পুচু! সোনা মা কোথায় গেছিলে তুমি?
—আমরা হন্যে হয়ে কি খুঁজে বেড়াচ্ছি দাদা
—কে বেল বাজালো আপনার বাড়িতে? তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সঙ্গে আপনাকেও
—তোমাদের বাড়িতে কাজ করতে গো।
—আমাদের বাড়িতে…
—হ্যাঁ গো!
—কি নাম?
—মনে হয় সু নয়না!
—সুনয়না!
—অবাক কাণ্ড।
—আমাদের বাড়িতে না দিয়ে আপনার বাড়িতে দিল।
—জানি না, তবে অবাক কাণ্ড!
—কেন অবাক কাণ্ড বলছেন!
—মেয়েটিকে দেখে বিধ্বস্ত মনে হল।
—শুধু বলল দাদা, এদের একবারটি একটু আপনি দিয়ে দেবেন তো! তিথি ভেতরে ভেতরে একটু অভিমান হল, সুনয়না সঙ্গে তো অতিথি কিছু হয়নি তাহলে কেন আসলো না এটাই ভেবে পাচ্ছে না!
—হ্যাঁ গো, আমার দেখে তাই মনে হল।
পৃথিবীতে বিচিত্র মানুষের মনে বিচিত্র ভাবনার উদয় হয় সুনয়না কেন আসলো না তিথিদের বাড়িতে।
—দাদা আপনি আসুন না এক কাপ চা খেয়ে যাবেন
নাগো না, তুমি কাজ কর।
নাগো পরে একদিন আসব
তবে পারলে ওই মেয়েটিকে একবার ফোন কর যতই হোক তোমার আদরের পরশু ও যদি না দেখতো তাহলে আজকে যে কি একটা ঘটনা ঘটতো কে জানে।
হ্যাঁ দাদা ঠিকই বলেছেন।
পুচুকে অনেক আদর করে তিথি গেটটা লাগিয়ে দিল।
পুচু কিউ কিউ করে কি জানাতে চাইলো কে জানে
এরমধ্যে ফোন বেজে উঠল,
‘মনে রবে কিনা রবে নীরবে…’
—হ্যালো… ওদিক থেকে কোনও আওয়াজ নেই।
—মানে!
—হ্যালো
এবারও অপরপক্ষ বলল,
—হ্যালো হ্যালো বৌদি…
—হ্যাঁ কে?
—আমি সুনয়না।
—তুমি অখিলদার বাড়িতে পুচুকে রেখে গেছিলে কেন, আমার বাড়ি চেনো না? 🍁 (ক্রমশঃ)
🍂গল্প
ঋদ্ধি কিছু বলতে গেল, কিন্তু থেমে গেল। ঘরের ভেতর আলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। এরপর যখন সে আবার চোখ খুলল, তখন সে একা। ঘরটা আবার আগের মতো, খালি ও নীরব। সে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। বাইরে এসে গাছটার দিকে তাকাল।
শালিখ পাখির বাসা

শোভনা মাইতি
পুরনো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হতো সময় কীভাবে এখানে থেমে আছে। চারদিকে ভাঙা দেওয়াল। শ্যাওলায় ঢাকা সিঁড়ি, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি বিশাল কদম গাছ। গাছটি যেন এই জায়গাটার পাহারাদার। গাছটার ডালপালা এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে পুরো বাড়িটাকে প্রায় ঢেকেই ফেলেছিল। ঋদ্ধি প্রথম দিন যখন জায়গাটা দেখেছিল, তখনই তার মনে হয়েছিল এখানে কিছু একটা লুকিয়ে আছে। শুধু ভাঙাচোরা ইট কাঠ পাথর ধুলো নয়, আরও গভীর কিছু। সেই বিকেলেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মেঘলার। মেঘলা গাছটার নিচে মাথা উঁচু করে ডালের দিকে তাকিয়ে।
দাঁড়িয়ে ছিল। ঋদ্ধি একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে বলল,
—তুই এখানে কী করছিস?
মেঘলা তাকাল না, শুধু বলল,
—ওখানে একটা বাসা আছে দেখছিস?
ঋদ্ধি চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল
—কোনটা?
—ওই ডান দিকের মোটা ডালটার পাশে। শালিখ পাখির বাসা…
ঋদ্ধি এবার দেখতে পেল। সত্যিই একটা বাসা। ছোট, কিন্তু খুব যত্নে বানানো।
—তো?
—আমি কয়েকদিন ধরে দেখছি। একটা পাখি আসে যায়। কিন্তু আজ আরেকটা পাখি এসেছে। ওরা হয়ত নতুন করে বাসা বানাচ্ছে!
ঋদ্ধি একটু হেসে বলল,
—এই জন্য এত মন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস?
মেঘলা এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। ওর চোখে অদ্ভুত একটা তীব্রতা ছিল।
—সবকিছু এতও সহজ না রে!
ঘরের ভেতর হঠাৎ একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল। ছায়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। দরজাটা খুলে গেল। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর মেঘলা হাসল,
—দেখলি!
ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—যেন বিশ্বাস করতে পারছি না রে!
ওরা নিচে নেমে এল। বাইরে এসে গাছটার দিকে তাকাল। শালিখ পাখি দুটো বাসায় বসে আছে। শান্ত। ঋদ্ধি বলল,
—ওরা কি সব জানত?
ঋদ্ধি চুপ করে গেল। কেন যেন মনে হল মেঘলা শুধু পাখির কথা বলছে না। সেই দিন থেকেই ঋদ্ধি ও মেঘলার দেখা হওয়া শুরু হল। প্রতিদিন বিকেলে ওরা ওই পুরনো বাড়ির সামনে আসত। গাছটার নিচে বসে শালিখ পাখিদের দেখত। কখনও কখনও তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলত, আবার অনেক সময় চুপ করেই থাকত। একদিন মেঘলা বলল,
—তুই কি কখনও ভেবেছিস, এই বাড়িটা কেন ফাঁকা?
ঋদ্ধি কাঁধ ঝাঁকাল!
—পুরনো হয়ে গিয়েছে, তাই কেউ থাকে না!
—সবাই তাই বলে। কিন্তু আমার দাদু বলত, এখানে আগে একটা পরিবার থাকত। হঠাৎ একদিন সবাই উধাও হয়ে যায়
—উধাও মানে?
—কেউ জানে না কোথায় গিয়েছে।
ঋদ্ধি একটু হেসে বলল,
—গল্প বানাচ্ছে।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
—তুই বিশ্বাস করিস না।
—না।
—তাহলে চল, ভেতরে ঢুকে দেখি।
ঋদ্ধি থমকে গেল। বাড়িটার ভেতরে ঢোকার কথা ও- কখনও ভাবেনি। অবাক হল হয়ত! বলল,
—এখন?
—হ্যাঁ, এখনই।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ঋদ্ধি বলল,
—ঠিক আছে।
দু’জনেই ধীরে ধীরে ভাঙা দরজার দিকে এগোল। দরজাটা অর্ধেক ভেঙে ঝুলে ছিল। ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধও নাকে এল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে টুকরো টুকরো আলো ঢুকছে। মেঝেতে ধুলোর পরত জমে আছে। হয়ত বহু বছর কেউ এখানে পা রাখেনি! মেঘলা সামনে এগিয়ে গেল।
—সাবধানে চল।
ঋদ্ধি তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। হঠাৎ একটা শব্দ হল। যেন ওপরের ফ্লোরে কেউ হাঁটছে। ঋদ্ধি থেমে গেল,
—শুনলি?
মেঘলাও থামল।
—হ্যাঁ।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মেঘলা ধীরে বলল,
—শোন না, ওপরে যাবি?
ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল!
—দরকার আছে।
—সত্যিটা জানতে হবে।
ওরা সিঁড়ির দিকে এগোল। সিঁড়িগুলো ভাঙা, প্রতিটা ধাপ কাঁপছিল। খুব সাবধানে পা ফেলছিল ওরা। উপরের ফ্লোরে উঠে একটা লম্বা করিডোর দেখা গেল। দু’পাশে অনেকগুলো দরজা। একটা দরজা হালকা খোলা ছিল। মেঘলা বলল,
—ওই ঘরটা দেখ।
ঋদ্ধি দরজাটা ঠেলে খুলল।
ঘরের ভেতর একটা পুরনো খাট, একটা টেবিল, আর দেওয়ালে ঝুলছে একটা ফাটা আয়না। টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি। ঋদ্ধি ডায়েরিটা তুলে নিল,
—এটা কী?
মেঘলা এগিয়ে এসে বলল,
—খুলে দেখ…
ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে। প্রথম পাতায় লেখা ছিল, এই বাড়ি আমাদের, কিন্তু আমরা এখানে আটকে আছি!
ঋদ্ধি কপাল কুঁচকে বলল,
—এর মানে কী?
মেঘলা ধীরে বলল,
—পড়তে থাক।
পরের পাতাগুলোতে লেখা ছিল অদ্ভুত সব কথা। বাড়ির ভেতরে কেউ আছে, রাতে ফিসফিস শব্দ শোনা যায়, আয়নায় অন্য কারও ছায়া দেখা যায়। ঋদ্ধির গা শিউরে উঠল।
—এসব সত্যি হতে পারে না।
মেঘলা বলল,
—যদি হয়?
ঠিক তখনই আবার সেই শব্দ। এবার আরও স্পষ্ট। যেন কেউ করিডোরে হাঁটছে। ঋদ্ধি ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে বলল,
—চল, নিচে যাই।
মেঘলা মাথা নাড়ল,
—না, আমরা এতদূর এসে ফিরে যাব না।
হঠাৎ দরজাটা নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
ঋদ্ধি চমকে উঠল,
—এটা কে করল?
কোনও উত্তর এল না।
ঘরের ভেতর হঠাৎ ঠাণ্ডা বেড়ে গেল। আয়নাটার দিকে তাকাতেই ঋদ্ধি দেখল, ওদের পেছনে আরেকটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।।সে ঘুরে তাকাল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
—মেঘলা, তুই দেখছিস?
মেঘলা আয়নার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—হ্যাঁ।
তার গলায় ভয় নেই।
—ওরা এখানে আছে
ঋদ্ধি বলল,
—কে ওরা?
—যারা হারিয়ে গিয়েছে…
হঠাৎ জানালার বাইরে শালিখ পাখির ডাক শোনা গেল। মেঘলা বলল,
—বাসাটা।
ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল না,
—কী?
—ওরা ফিরে আসতে চায়!
ঘরের ভেতর হাওয়ার মতো একটা কিছু ঘুরে বেড়াতে লাগল। ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই উল্টাতে লাগল। শেষ পাতায় লেখা ভেসে উঠল
যদি কেউ আমাদের গল্প পড়ে, আমরা মুক্তি পাব।
ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,
—তাহলে আমাদের পড়তে হবে?
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
—শুধু পড়লেই হবে না, বুঝতে হবে!
ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করে ডায়েরির সব লেখা মনে করার চেষ্টা করল। ভয়, একাকীত্ব, আটকে থাকার যন্ত্রণা সব যেন তার ভেতরে ঢুকে পড়ছিল। মেঘলা ধীরে বলল,
—তুই অনুভব করছিস?
—হ্যাঁ।
—তাহলে বল…
ঋদ্ধি চোখ খুলে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমরা তোমাদের বুঝেছি। তোমরা একা ছিলে। ভয় পেয়েছিলে। কিন্তু এখন তোমরা মুক্ত!
ঘরের ভেতর হঠাৎ একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল। ছায়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। দরজাটা খুলে গেল। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর মেঘলা হাসল,
—দেখলি!
ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—যেন বিশ্বাস করতে পারছি না রে!
ওরা নিচে নেমে এল। বাইরে এসে গাছটার দিকে তাকাল। শালিখ পাখি দুটো বাসায় বসে আছে। শান্ত। ঋদ্ধি বলল,
—ওরা কি সব জানত?
মেঘলা বলল,
—হয়ত! হয়ত ওরাই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।
সূর্য তখন ডুবতে শুরু করেছে। পুরনো বাড়িটা আর ভয়ঙ্কর লাগছিল না। ঋদ্ধি মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই আবার আসবি?
মেঘলা একটু ভেবে বলল,
—জানি না।
—কেন?
—কিছু কিছু গল্প একবারই শেষ হয়।
ঋদ্ধির বুকটা হঠাৎ হালকা খালি লাগল,
—তাহলে?
মেঘলা হাসল,
—ভয় পাস না। অনেক কিছুই হারিয়ে যায় না!
ও ধীরে ধীরে চলে গেল। ঋদ্ধি একা দাঁড়িয়ে রইল। গাছটার দিকে তাকিয়ে। হাওয়ায় বাসাটা একটু দুলছে। তার মনে হল, আজ সে শুধু একটা রহস্য সমাধান করেনি। সে বুঝেছে, ভয় আর একাকীত্বও গল্প হয়ে যেতে পারে, যদি কেউ তা শুনতে চায়। আর কোথাও, খুব কাছেই, শালিখ পাখিরা নতুন করে তাদের বাসা গড়ছে।
মেঘলা চলে যাওয়ার পরও ঋদ্ধি অনেকক্ষণ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এলে পুরনো বাড়িটা আবার আগের মতো নিঃশব্দ হয়ে গেল। কিন্তু সেই নিঃশব্দতার ভেতরেও একটা অদৃশ্য টান রয়ে গেল, যেন কিছু একটা এখনও শেষ হয়নি। ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল, গল্পটা শেষ হয়নি। শুধু একটি দরজা বন্ধ হয়েছে, আরেকটি খুলে গিয়েছে। পরদিন সে আবার এল। একা। গাছটা আগের মতোই দাঁড়িয়ে, কিন্তু এখন তার চোখ প্রথমেই চলে গেল বাসাটার দিকে। শালিখ পাখি দুটো নেই। বাসাটা ফাঁকা। ঋদ্ধির বুকের ভেতর হালকা কেঁপে উঠল। কেন যেন মনে হল, এই ফাঁকা বাসার সঙ্গে তার নিজের ভেতরের ফাঁকা জায়গাটার মিল আছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
—তুই আসবি না আর…
কোনও উত্তর এল না। শুধু পাতার শব্দ। ঋদ্ধি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল, সে আবার বাড়িটার ভেতরে যাবে। দরজাটা ঠেলে ঢুকতেই আগের সেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। কিন্তু আজ ভয়টা অন্যরকম। যেন বাইরের কিছু না, ভেতরের কিছু তাকে টানছে। সে সোজা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। করিডোরটা ফাঁকা। সব দরজা বন্ধ। কিন্তু শেষের দরজাটা খোলা। ঋদ্ধি থামল। গতকাল এই দরজাটা বন্ধ ছিল। তার গলা শুকিয়ে এল। তবু সে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়াল। ঘরটা বদলে গিয়েছে। টেবিলের ওপর আর ডায়েরি নেই। তার বদলে একটা আয়না রাখা। আর সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মেঘলা। ঋদ্ধি ফিসফিস করে বলল,
—তুই!
মেঘলা ধীরে ঘুরে তাকাল। তার চোখে সেই একই শান্তি, কিন্তু এখন আরও গভীর।
—তুই এসেছিস শেষ পর্যন্ত…
—তুই তো বলেছিলিস আর আসবি না।
মেঘলা আলত হাসল,
—আমি কি সত্যিই চলে গিয়েছিলাম?
ঋদ্ধি কিছু বলল না। তার মাথার ভেতর হঠাৎ অনেক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
—তুই এখানে কী করছিস রে?
—অপেক্ষা করছিলাম।
—কিসের? কেন?
—তোর।
ঋদ্ধির বুক ধক করে উঠল,
—কেন রে?
মেঘলা আয়নার দিকে তাকাল
—কারণ গল্পটা শেষ হয়নি রে।
ঘরের ভেতর হঠাৎ সেই শীতল হাওয়া বইতে লাগল। আয়নাটার পৃষ্ঠদেশ কেঁপে উঠল।
ঋদ্ধি বলল,
—কাল তো সব শেষ হয়ে গিয়েছে।
—না। আমরা শুধু ওদের মুক্ত করেছি। কিন্তু নিজেদেরটা…
সে থেমে গেল।
ঋদ্ধি ধীরে বলল,
—নিজেদেরটা কী?
মেঘলা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল,
—তুই কি জানিস আমি কে?
ঋদ্ধি থমকে গেল!
—কী মানে!
—তুই কি নিশ্চিত, আমি সত্যিই তোর মতই একজন মানুষ। ঘরের ভেতর স্তব্ধতা নেমে এল। ঋদ্ধির মাথায় হঠাৎ গত কয়েকদিনের সব মুহূর্ত ভেসে উঠল। প্রথম দিন গাছের নিচে দেখা, মেঘলার অদ্ভুত কথা, তার চোখের গভীরতা, আর সেই অদ্ভুত টান।
ও কাঁপা গলায় বলল,
—তুই কী বলতে চাইছিস?
মেঘলা ধীরে বলল,
—আমি এই বাড়ির গল্পের অংশ।
ঋদ্ধির শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
—মানে তুই…
—হ্যাঁ। আমি তাদেরই একজন।
ঋদ্ধি পিছিয়ে গেল।
—এটা অসম্ভব!
—তুই নিজেই তো দেখেছিস, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
আয়নাটার ভেতরে হঠাৎ ছায়া নড়ল। সেখানে মেঘলার আরেকটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।
—স্থির, নিঃশব্দ।
ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। কিন্তু দৃশ্যটা একই।
—তাহলে তুই এতদিন আমার সঙ্গে কেন ছিলিস?
মেঘলা বলল,
—কারণটা তুই জানতে পারিস।
—কী?
—যেটা কেউ শোনে না। ভয়, একাকীত্ব, হারিয়ে যাওয়ার শব্দ।
ঋদ্ধির মনে পড়ল, ডায়েরির সেই কথাগুলো। আটকে থাকা, মুক্তির অপেক্ষা।
—তাহলে এখন কী হবে?
মেঘলা একটু এগিয়ে এল,
—এখন তোর পালা।
—আমার?
—তুই কি কখনও ভেবেছিস, তুই এখানে কেন এসেছিলিস?
ঋদ্ধি চুপ করে গেল। সে সত্যিই জানত না।
—আমি এসেছিলাম কারণ…
সে থেমে গেল। মেঘলা বলল,
—তুইও তো কিছু খুঁজছিলিস!
ঋদ্ধির বুকের ভেতর চাপা একটা ব্যথা উঠল। সে ধীরে বলল,
—আমি হারিয়েছি।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
—জানি।
—কীভাবে?
—কারণ আমিও হারিয়েছিলাম।
ঘরের ভেতর যেন সময় থেমে গেল। ঋদ্ধি অনুভব করল, তার ভেতরের সেই ফাঁকা জায়গাটা ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে।
—আমি ওকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম।
মেঘলা নরম গলায় বলল,
—সবাই তা-ই চায় রে!
—কিন্তু পারিনি।
—তাই তুই এখানে এসেছিস?
ঋদ্ধি চোখ নামিয়ে বলল,
—হয়ত!
মেঘলা আয়নার দিকে ইঙ্গিত করল,
—এই জায়গাটা শুধু তাদের জন্য না, যারা আটকে গেছে। এটা তাদের জন্যও, যারা ছাড়তে পারে না, ঋদ্ধি ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। কিন্তু তার পাশে আরেকটা ছায়া। অস্পষ্ট, ভাঙা ভাঙা।
—ও কে?
মেঘলা বলল,
—যাকে তুই ছাড়তে পারিসনি।
ঋদ্ধির গলা কেঁপে উঠল।
—বল, আমি এখন কী করব?
মেঘলা বলল,
—যেটা কাল করেছিলিস।
—কী?
—বুঝে নিতে হবে।
ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করল। তার মনে সেই মানুষটার মুখ ভেসে উঠল। হাসি, কথা, হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া। তার বুক ভেঙে যেতে লাগল। কিন্তু এবার ও-পালাল না।
ধীরে ধীরে বলল,
—আমি তোকে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই চলে গিয়েছিলিস। এটা সত্যি। আমি সেটা মানছি।
ঘরের ভেতর হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল। আয়নাটার ছায়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। ঋদ্ধি চোখ খুলল। মেঘলা তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে মৃদু হাসল,
—তুই পেরেছিস?
ঋদ্ধি ফিসফিস করে বলল,
—এখন তুই।
মেঘলা একটু দূরে সরে গেল
—আমার কাজ শেষ।
—তুই কী মুক্ত?
—হয়ত!
—তাহলে তুই চলে যাবি।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
—সবকিছু হারিয়ে যায় না রে। কিছু কিছু জিনিস থেকে যায়, অন্য রূপে।
ঋদ্ধি কিছু বলতে গেল, কিন্তু থেমে গেল। ঘরের ভেতর আলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। এরপর যখন সে আবার চোখ খুলল, তখন সে একা। ঘরটা আবার আগের মতো, খালি ও নীরব। সে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। বাইরে এসে গাছটার দিকে তাকাল। শালিখ পাখি দু’টো ফিরে এসেছে। তারা বাসায় বসে আছে। ঋদ্ধি হাসল। তার মনে হল, কিছু গল্প শেষ হয় না। তারা শুধু বদলে যায়। আর কোথাও, অদৃশ্যভাবে, মেঘলা এখনও আছে একটা স্মৃতি, একটা অনুভব, একটা মুক্তি হয়ে। হাওয়া বইছে। বাসাটা দুলল। কিন্তু এবার সেই দুলুনিতে ভয় নেই। শুধু শান্তি। 🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।



