সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমশ জটিল হচ্ছে কূটনৈতিক সমীকরণ। ভারতের (India) সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে এগিয়ে এসেছে জাপান (Japan)। আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তি, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে নতুন চুক্তির পর বেইজিং (Beijing) -এর প্রতিক্রিয়া নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ইতিমধ্যেই চিন (China) দুই দেশকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে জানিয়েছে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিকীকরণ বাড়াবেন না।’ এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রসঙ্গত, ভারত-জাপান সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে গভীর হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে এই সম্পর্ক আরও কৌশলগত স্তরে পৌঁছেছে। জানা গিয়েছে, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, রাডার প্রযুক্তি এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিনিময়ের ক্ষেত্র খুলে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যে। পাশাপাশি নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া ও সামরিক তথ্য আদান-প্রদানও বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের বক্তব্য ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে। তাঁর কথায়, ‘এই অঞ্চলে সামরিক জোট ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।’ এই সতর্কবার্তার মাধ্যমে বেইজিং যে উদ্বেগে রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। কারণ, ভারত ও জাপানের এই ঘনিষ্ঠতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, কোয়াড (Quad) জোটের মধ্যে রয়েছে ভারত (India), জাপান (Japan), অস্ট্রেলিয়া (Australia) ও যুক্তরাষ্ট্র (United States)। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য পথ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই জোটের লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে। ভারত-জাপান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সেই বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। লাদাখ (Ladakh) সীমান্তে চিনের সঙ্গে সংঘাতের পর নয়াদিল্লি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলিতে বেইজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধিও ভারতের কৌশলগত চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে। পাকিস্তান (Pakistan), নেপাল (Nepal), শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) ও মালদ্বীপ (Maldives)-এ চিনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে জাপানের সঙ্গে হাত মেলানোকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। টোকিও (Tokyo) নিজেও পূর্ব এশিয়ায় চিনের আগ্রাসী নীতির কারণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ চিন সাগর (South China Sea) ও পূর্ব চিন সাগর (East China Sea)-এ সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জাপান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে। সেই জায়গা থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের একজন শীর্ষকর্তার কথায়, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। আমরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে চাই।’ যদিও এই অবস্থান সত্ত্বেও চিনের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এই উন্নয়নকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। উল্লেখ্য, জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন শান্তিবাদী অবস্থানে থাকা দেশটি এখন প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকেও তারা এগোচ্ছে। ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি সেই পরিবর্তনেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অবস্থান—এই তিন ক্ষেত্রেই বড় শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত-জাপান সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উঠে এসেছে।
চিনের সতর্কবার্তার পর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে কূটনৈতিক মহলে। তবে এতটুকু পরিষ্কার, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে একাধিক দেশ নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে। সেই প্রক্রিয়ায় ভারত ও জাপানের এই ঘনিষ্ঠতা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Japan SDG partnership | টেকসই উন্নয়নে ভারত-জাপান জোটের নতুন ধাপ: নীতি আয়োগ-জাইকা চুক্তিতে অ্যাসপিরেশনাল জেলায় গতি




