সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ আহমেদাবাদ, বুধবার: হিন্দু বিবাহের আইনি বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল গুজরাত হাই কোর্ট (Gujarat High Court)। সাম্প্রতিক এক মামলার রায়ে আদালত জানিয়েছে, শুধুমাত্র বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করলেই হিন্দু বিবাহ আইনত বৈধ হয় না। বরং প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ‘সপ্তপদী’ বা ‘সাত পাকে’ ঘোরা সম্পন্ন না হলে সেই বিবাহকে পূর্ণাঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। আদালতের এই মন্তব্য ঘিরে আইনমহল ও সমাজে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার সূত্রপাত গুজরাতের আহমেদাবাদ (Ahmedabad)-এর বাসিন্দা একজন নারী ও ব্রিটেনে বসবাসকারী কৌশল সোনার (Kaushal Sonar)-এর বিবাহকে কেন্দ্র করে। বিয়ের নথিপত্রে কৌশলের স্বাক্ষর থাকলেও তিনি সেই বিবাহকে অস্বীকার করেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে প্রকৃত বিষয় না জানিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ওই মহিলার সঙ্গে তাঁর কোনও বৈধ বিয়ে হয়নি, কারণ কোনও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়নি এবং তাঁরা কখনও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাসও করেননি।
এই অভিযোগকে সামনে রেখে প্রথমে গুজরাতের একটি পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন কৌশল সোনার। তবে সেই আদালত বিয়েটিকে বৈধ বলে ঘোষণা করে। পারিবারিক আদালতের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি গুজরাত হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ শুনানির পর বিচারপতি ইলেশ ভোরা (Ilesh Vora) এবং বিচারপতি আর.টি. বাছনি (R.T. Vachhani)-এর বেঞ্চ মামলার রায় ঘোষণা করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। রায়ে আদালত উল্লেখ করে, হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act)-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে ‘সপ্তপদী’ যেখানে বর ও কনে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাত পাক ঘোরেন, এই প্রথা হিন্দু বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘সাত পাকে’ ঘোরার মতো আচার সম্পন্ন না হলে বিবাহকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। শুনানির সময় কৌশল সোনার আদালতে জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে জানতেনই না যে তাঁর নামে কোনও বিবাহ নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘আমার সম্মতি ছাড়া কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, এবং আমাকে বিষয়টি জানানো হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ওই মহিলার সঙ্গে তাঁর কোনও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না এবং কোনও সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে, মামলার অপর পক্ষের নারীও আদালতে স্বীকার করেন যে তাঁদের বিবাহের ক্ষেত্রে কোনও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়নি। তিনি জানান, তাঁরা কখনও একত্রে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করেননি। এই স্বীকারোক্তি মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দুই পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাই কোর্ট জানায়, শুধুমাত্র নথিভুক্তির উপর ভিত্তি করে কোনও বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করা যায় না, যদি না আইনসিদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়।
আদালত আরও মন্তব্য করে, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা না, এটি একটি আইনি ও ধর্মীয় বন্ধন। সেই কারণে আইন যে শর্ত নির্ধারণ করেছে, তা পালন করা আবশ্যক। আদালতের ভাষায়, ‘বিয়ে শুধু নাচগান বা উৎসবের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আইনি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।’ উল্লেখ্য এই রায় ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেখানে বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেখানে ধর্মীয় আচার পালনের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এল। একইসঙ্গে, বিবাহের ক্ষেত্রে সম্মতি ও স্বচ্ছতার বিষয়টিও এই মামলায় গুরুত্ব পেয়েছে।
আইন অনুযায়ী, হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠান যেমন কন্যাদান, অগ্নি-সাক্ষী রাখা ও ‘সপ্তপদী’ সম্পন্ন করা বিবাহকে পূর্ণতা দেয়। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত সেই ঐতিহ্যগত বিধানগুলিকেই পুনরায় তুলে ধরেছে। ফলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নথিভুক্তি না, তা সামাজিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণতা নিশ্চিত করাই এখন বিবাহের বৈধতার মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হল। বর্তমান সময়ে বহু ক্ষেত্রে সরলীকৃত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এই রায় সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আইন যে শর্ত নির্ধারণ করেছে, তা অগ্রাহ্য করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, এই বিষয়টিও সামনে এসেছে। গুজরাত হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি নির্দিষ্ট মামলার নিষ্পত্তিই নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও আইনি কাঠামোর উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিবাহ সংক্রান্ত আইনি সচেতনতা বাড়াতে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : heatwave children India, UNICEF report 2026 | ভারতে জলবায়ু সঙ্কটে শিশুদের বড় ঝুঁকি: তাপপ্রবাহে বিপন্ন প্রায় ৯ কোটি, চাঞ্চল্যকর ইউনিসেফ রিপোর্টে উঠে এল উদ্বেগজনক চিত্র




