Taratala warehouse collapse Kolkata, Firhad Hakim controversy | তারাতলা গুদাম বিপর্যয়ে ১৪ মৃত্যু: ফিরহাদ হাকিমকে গ্রেফতারের দাবিতে তীব্র চাপ, রাজনৈতিক সমীকরণে বাড়ছে উত্তাপ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার তারাতলায় (Taratala)-য় নির্মীয়মাণ একটি গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই দায় নির্ধারণ ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক টানাপোড়েন। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)। গুদামের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই তাঁর গ্রেফতারির দাবিতে সরব হয়েছে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ তৃণমূল (Trinamool Congress)-এর একাংশ, পাশাপাশি বামফ্রন্ট (Left Front), কংগ্রেস (Congress) এবং বিজেপি (BJP)-ও একই সুরে কথা বলছে। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ নকশার ভিত্তিতেই নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সেই চূড়ান্ত অনুমোদনে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদের সই ছিল।’ এই বক্তব্য সামনে আসতেই প্রশাসনিক নথি খতিয়ে দেখা শুরু হয়। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, গত বছরের ২০ নভেম্বর মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে গুদামের নকশা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে উল্লেখ ছিল, নকশায় বিল্ডিং রুল ‘সেই অর্থে’ লঙ্ঘিত হয়নি, কিন্তু কার্যকর করার আগে মেয়র বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি আবশ্যক। সেই নোটেই সই করেছিলেন ফিরহাদ, যিনি তখন একই সঙ্গে মেয়র এবং বিল্ডিং বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন।

আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari | হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রিটে সম্পত্তি নিলামের হুঁশিয়ারি, বিধানসভায় শুভেন্দুর মন্তব্যে তোলপাড়

ঘটনার পর থেকেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে, ওই অনুমোদন কি যথাযথ যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়েছিল? আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে, গুদাম নির্মাণের দায়িত্বে থাকা আসগর হোসেন (Asgar Hossain)-এর সঙ্গে প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর আনোয়ার খান (Anwar Khan)-এর ঘনিষ্ঠতা। জানা যাচ্ছে, আনোয়ার সংশ্লিষ্ট ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর। তাঁদের সঙ্গে ফিরহাদের একাধিক ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু, ফিরহাদ নিজে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘যতদূর জানি, গুদামটি বেআইনি ছিল না। সমস্যা হয়েছে নজরদারির অভাবে। মেয়র বা কমিশনার প্রতিটি নির্মাণস্থলে গিয়ে দেখভাল করতে পারেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনও প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ নই, মিটিং নোটে সই করা ছিল নিয়ম মেনে করা একটি প্রক্রিয়া।’

এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ রাজনৈতিক মহলের বড় অংশ। তৃণমূলেরই একাংশের নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) দাবি তুলেছেন, ফিরহাদকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা হোক। সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra) প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি অন্য এক প্রাক্তন মন্ত্রীকে দীর্ঘ সময় জেলে থাকতে হয়, তবে এখানে ভিন্ন আচরণ কেন?’ একই সুর শোনা গিয়েছে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী -এর (Sujan Chakraborty) বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘একাধিক নির্মাণ দুর্ঘটনার পরেও কেন প্রাক্তন মেয়রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?’ বিজেপির তরফ থেকেও চাপ বাড়ানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, যখন বিধানসভাতেই নথিসহ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেরি হওয়ার কোনও কারণ নেই। বর্তমান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) বলেন, ‘যদি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Kalicharan Bandyopadhyay) গ্রেফতার করা হয়, তবে যার স্বাক্ষরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে কেন ধরা হবে না?’

এখানেই সামনে আসছে আরও একটি জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কালীঘাট ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের দাবি, এই ঘটনায় পরোক্ষে অন্য দিকেও আঙুল তোলা হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী নাকি ফিরহাদের পাশাপাশি তাঁর তৎকালীন ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে ‘ক্যামাক স্ট্রিট’ তথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)-এর কার্যালয়ের যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে এই ইস্যু কেবল প্রশাসনিক নয়, দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণেও প্রভাব ফেলছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তথাকথিত ‘নিরাপত্তা’ রাজনীতি। অভিযোগ উঠছে, বিভিন্ন দলের কিছু নেতা নিজেদের নিরাপত্তার কারণে শিবির বদল করছেন ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) -এর ঘনিষ্ঠ বলয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ফিরহাদ যদি আইনি সুরক্ষা না পান, তবে সেই প্রবণতায় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি উঠে এসেছে ভবানীপুর (Bhabanipur) কেন্দ্রের নির্বাচনী মামলার প্রসঙ্গ। ফিরহাদের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম (Priyadarshini Hakim) ওই কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর কাউন্টিং এজেন্ট ছিলেন। ভোটগণনা নিয়ে ওঠা অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। ফলে এই তদন্তের প্রভাব অন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে ফিরহাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ না হলে ‘সমঝোতা’ তত্ত্ব জনমানসে জায়গা করে নিতে পারে, এই আশঙ্কা বিভিন্ন মহলে ঘুরছে। অন্যদিকে, প্রশাসন জানাচ্ছে, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কারও ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না। তারাতলার দুর্ঘটনা কেবল একটি নির্মাণ বিপর্যয় নয়, এটি এখন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দায় কার, কীভাবে এমন অনুমোদন মিলল, এবং শেষ পর্যন্ত আইনের জালে কে ধরা পড়বেন, এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে রাজ্যবাসী। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসবে নতুন তথ্য, আর সেই সঙ্গে বদলাতে পারে রাজনৈতিক সমীকরণও।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Varanasi international flight Air India, Narendra Modi aviation | ছোট শহর থেকে সরাসরি বিশ্বমুখী যাত্রা! নতুন ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে বদলাচ্ছে ভারতের বিমান পরিষেবা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন