Alireza Beiranvand story, Iran goalkeeper journey | খালি হাতে তেহরান থেকে বিশ্বমঞ্চ! রোনাল্ডোর পেনাল্টি রুখে ইতিহাস, ইরানের বেইরানভান্দের লড়াই আজও অনুপ্রেরণার মতো বিস্ময়

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ কলকাতা: বিশ্বফুটবলের বড় মঞ্চে প্রায়ই নজর কেড়ে নেন তারকারা, কিন্তু কখনও কখনও আলো ছিনিয়ে নেন এমন কেউ, যাঁর গল্প মাঠের বাইরেও সমান শক্তিশালী। ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজ়া বেইরানভান্দ (Alireza Beiranvand) সেই বিরল উদাহরণ। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আবারও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় এনেছে তাঁকে। বেলজিয়ামের (Belgium) বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা এই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক একাধিক নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা পেরিয়ে উঠে আসা মানসিক শক্তিই তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রবিবারের ম্যাচে বেইরানভান্দ ছিলেন ইরানের শেষ ভরসা। বেলজিয়ামের আক্রমণের ঢেউ একের পর এক ভেঙে দিয়েছেন তিনি। অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন। প্রতিপক্ষের তারকা ফুটবলারদের সামনে তিনি যেন এক অদম্য প্রাচীর। মাঠে তাঁর উপস্থিতি যেমন আত্মবিশ্বাস জোগায় দলকে, তেমনই প্রতিপক্ষের মধ্যে তৈরি করে চাপ।

আরও পড়ুন : Nora Fatehi World Cup performance, Sir Sir song FIFA 2026 | বিশ্বকাপের মঞ্চে নোরার ‘সির সির’ ঝড়! ৭০ হাজার দর্শকের স্লোগান থেকেই জন্ম নিল গান, জানালেন নিজের গল্প

তবে বেইরানভান্দের কাহিনি কেবল গোলপোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের লোরেস্তান (Lorestan) অঞ্চলের এক দরিদ্র কুর্দি লাক পরিবারে জন্ম তাঁর। যাযাবর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশব কাটে চরম অভাবের মধ্যে। এমনও দিন গিয়েছে, যখন ঠিকমতো খাবার জোটেনি। পরিবারের মূল জীবিকা ছিল ভেড়া পালন। ফুটবল খেলার মতো ‘অপ্রয়োজনীয়’ বিষয়ে উৎসাহ ছিল না পরিবারের। তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে সংসারের কাজে হাত লাগাক। কিন্তু কিশোর বেইরানভান্দের মনে তখন অন্য স্বপ্ন। অর্থকষ্ট আর বাধা উপেক্ষা করে কিশোর বয়সেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। গন্তব্য তেহরান (Tehran)। অচেনা শহরে এসে শুরু হয় আরও কঠিন জীবনযুদ্ধ। মাথার উপর ছাদ ছিল না, রাস্তাই ছিল আশ্রয়। আজ়াদি টাওয়ার (Azadi Tower) -এর আশপাশে গৃহহীনদের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন বহুদিন। খাওয়ার জন্য কখনও ভিক্ষাও করতে হয়েছে। কিন্তু ফুটবলের স্বপ্ন ছাড়েননি। নিজের প্রচেষ্টায় খুঁজে পান ওয়াহদাত (Vahdat) নামে একটি ফুটবল ক্লাব। সেই ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন লড়াই। ফুটবল খেলতে গেলে প্রয়োজন সরঞ্জাম জুতো, পোশাক। অর্থ জোগাড় করতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি ধোয়ার কাজ শুরু করেন। সেই কাজই একদিন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একদিন গাড়ি পরিষ্কার করার সময় সামনে পড়েন ইরানের কিংবদন্তি ফুটবলার আলি দাই (Ali Daei)। সাহস করে নিজের স্বপ্নের কথা জানালে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন দাই। সেখান থেকেই শুরু পেশাদার ফুটবলে পথচলা।

এরপরও সংগ্রাম থামেনি। কখনও পোশাক কারখানায় কাজ, কখনও পিৎজার দোকানে, কখনও রাস্তা পরিষ্কারের কাজ, দিনের পর দিন পরিশ্রম করে নিজের খরচ চালিয়েছেন। অনেক সময় রাতের কাজ বেছে নিতেন, যাতে দিনে অনুশীলনে কোনও বাধা না আসে। ক্লাবের গেটের সামনে রাত কাটানোর ঘটনাও তাঁর জীবনের অংশ, যাতে ভোরের অনুশীলনে দেরি না হয়। ওয়াহদাতে খেলার সময়ই নজরে পড়ে যান নাফত তেহরান (Naft Tehran) ক্লাবের কর্তাদের। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলে স্থায়ী জায়গা পান। ২০০৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ওই ক্লাবেই খেলেন এবং গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালে ইরানের অনূর্ধ্ব ২০ দলে সুযোগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায়। ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলছেন।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপেই বিশ্বমঞ্চে প্রথম বড় পরিচিতি পান বেইরানভান্দ। পর্তুগালের (Portugal) বিরুদ্ধে ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Cristiano Ronaldo) পেনাল্টি আটকিয়ে রাতারাতি শিরোনামে উঠে আসেন। সেই মুহূর্ত আজও ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয়। একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে কীভাবে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের শট থামাতে পারেন, সেই ছবি কোটি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক বিশ্বরেকর্ডও। ২০১৬ সালের ১১ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার (South Korea) বিরুদ্ধে ম্যাচে ৬১.০০২৬ মিটার দূরে বল ছুড়ে দিয়ে তৈরি করেন দীর্ঘতম থ্রোর রেকর্ড। আবার ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল ৭৮.০১৪ মিটার দূরে ড্রপ কিক করে আরেকটি নজির গড়েন। গোলরক্ষকদের মধ্যে এই ধরনের ক্ষমতা বিরল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধে ম্যাচে গুরুতর চোট পান তিনি। সতীর্থ মজিদ হোসেইনির (Majid Hosseini) সঙ্গে সংঘর্ষে মাথায় আঘাত লাগে, মাঠ ছেড়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। তবুও তাঁর লড়াই থামেনি। বারবার ফিরে এসে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।

বর্তমানে ট্রাক্টর এফসি (Tractor FC) -এর হয়ে খেলছেন বেইরানভান্দ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৮৮টির বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। মাঠে তাঁর আত্মবিশ্বাস, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং শারীরিক সক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ফুটবল শুধু খেলা নয়, অনেক সময় জীবন বদলের গল্পও বলে। আলিরেজ়া বেইরানভান্দের জীবন সেই বিরল উদাহরণ, যেখানে দারিদ্র, সংগ্রাম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রতিভা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য কাহিনি। তাঁর প্রতিটি সেভ, প্রতিটি থ্রো যেন মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে পথ নিজেই তৈরি হয়।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : FIFA water break controversy, World Cup 2026 rules | ‘জলপানের বিরতি নাকি বিজ্ঞাপনের ফাঁদ?’ বিশ্বকাপে ফিফার সিদ্ধান্তে তুমুল বিতর্ক, ক্ষুব্ধ ফুটবল দুনিয়া

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন