সাশ্রয় নিউজ নিউজ ★ ওয়াশিংটন: অভিবাসন নীতি ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায়। বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য বহুল প্রচলিত এইচ১বি ভিসা (H1B Visa) প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত বিপুল ফি চাপানোর সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে ঘোষণা করল মার্কিন আদালত। এই রায়ে সরাসরি ধাক্কা খেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump), তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এই নতুন নিয়ম চালু করেছিলেন। বস্টনের একটি ফেডারেল আদালত দীর্ঘ ৪২ পাতার রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট একতরফা ভাবে এই ধরনের আর্থিক শর্ত আরোপ করতে পারেন না। বিচারপতি লিও সোরোকিন (Leo Sorokin) তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, ‘এই ধরনের ফি আরোপ করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়।’ আদালতের এই মন্তব্যে মার্কিন প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষমতার সীমারেখা আবারও সামনে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। সেই সময় ট্রাম্প প্রশাসন একটি নতুন নিয়ম ঘোষণা করে, যেখানে বলা হয়, কোনও মার্কিন সংস্থা বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করতে চাইলে H-1B ভিসার আবেদনের সময়ই প্রায় ১ লক্ষ ডলার ফি জমা দিতে হবে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৫ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ সংস্থাগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একাধিক মার্কিন সংস্থা আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাঁদের দাবি ছিল, এই ফি মূলত একটি ‘গোপন কর’, যা আইনসভা অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা হয়েছে। আদালতও সেই যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপকে বাতিল করে দেয়। রায়ে বিচারপতি সোরোকিন বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের এমন ক্ষমতা নেই যে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে এই ধরনের আর্থিক বাধ্যবাধকতা চাপাবেন।’ তাঁর মতে, অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে হলে তা কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষ হওয়া প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পেছনে ছিল তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। তিনি বারবারই বলেছেন, বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ কমিয়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। H-1B ভিসার মাধ্যমে বহু বিদেশি বিশেষজ্ঞ, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে, আমেরিকায় কাজ করেন। ট্রাম্প চাইছিলেন এই প্রক্রিয়াকে কঠোর করে তুলতে, যাতে মার্কিন সংস্থাগুলি স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়। তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের বহু বড় প্রযুক্তি সংস্থা এই বিদেশি দক্ষ কর্মীদের উপর নির্ভরশীল। সফটওয়্যার, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গবেষণা ক্ষেত্রে এই কর্মীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত উচ্চ ফি সংস্থাগুলির খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল, যা ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল।
আদালতের এই রায়ের পর প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মীদের জন্যও এটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রায় শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করল না, বরং মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরল, ক্ষমতার ভারসাম্য। প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে যে সমন্বয় রয়েছে, তার গুরুত্ব আবারও সামনে এল এই ঘটনায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) -এর অভিবাসন নীতি বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছে। তাঁর নানা পদক্ষেপ নিয়ে অতীতে একাধিকবার আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাও তারই একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিশেষ করে ভারতীয় আইটি পেশাজীবীদের জন্য H-1B ভিসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর হাজার হাজার ভারতীয় এই ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় কাজের সুযোগ পান। ফলে এই রায় ভারতের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে আগ্রহী দক্ষ কর্মীদের কাছে এটি একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন সংস্থাগুলিও আবার স্বাভাবিক নিয়মে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালাতে পারবে।
রাজনৈতিক মহলে এই রায় নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। একাংশ মনে করছে, এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে ট্রাম্প সমর্থকদের মতে, স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষার প্রয়াসে নেওয়া পদক্ষেপকে আদালত থামিয়ে দিল। একটি বিষয় পরিষ্কার, এই রায়ের ফলে H-1B ভিসা প্রক্রিয়ায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেল। ভবিষ্যতে এই নীতি নিয়ে আরও পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু আপাতত আদালতের নির্দেশই কার্যকর থাকবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, প্রযুক্তি খাত এবং অভিবাসন নীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা আগামী দিনেও আলোচনায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : US Dollar, Donald Trump : মার্কিন ডলারে ট্রাম্পের স্বাক্ষর, ১৬৫ বছরের প্রথা ভাঙল আমেরিকা



