সোমনাথ আচার্য, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : জীবনে হঠাৎ ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প শুনে নিশ্চয়ই ভাবেন,এ কি সত্যিই সম্ভব? জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) বলছে, হ্যাঁ, সঠিক গ্রহের প্রভাবে সঠিক রত্ন (Gemstone) পরা মানুষকে এক মাসের মধ্যেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এমনই এক শক্তিশালী ও শুভ রত্ন হল পোখরাজ (Pukhraj) বা ইংরেজিতে Yellow Sapphire। বলা হয়, এই রত্নটি বৃহস্পতির (Jupiter) প্রতিনিধিত্ব করে এবং জীবনে জ্ঞান, সৌভাগ্য, সাফল্য ও সম্মান নিয়ে আসে। তবে এর রহস্য লুকিয়ে আছে সঠিক নিয়মে ধারণে কারণ ভুল রত্ন পরলে আশীর্বাদ নয়, অভিশাপও নেমে আসতে পারে! জ্যোতিষীরা মনে করেন, পোখরাজ এমন একটি রত্ন যা মানুষের আত্মবিশ্বাস, চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এটি ধন, মান, পদোন্নতি ও দাম্পত্য জীবনে আনন্দ আনে। তবে এই রত্ন সকলের জন্য নয়। কারও জন্মছকে বৃহস্পতি দুর্বল হলে এই রত্ন তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই কোন রাশির জাতক বা জাতিকা এই রত্ন পরতে পারেন, আর কারা একে এড়িয়ে চলবেন, সেই দিকেই নজর দেওয়া যাক।
জ্যোতিষী পণ্ডিত দেবাশিস মুখার্জি (Astrologer Debasish Mukherjee) বলেন, “পোখরাজ আসলে বৃহস্পতির শক্তি বহন করে। যে কারও কোষ্ঠীতে যদি বৃহস্পতি দুর্বল অবস্থানে থাকে, তাহলে জীবনে সঠিক দিশা পাওয়া যায় না। সেই ক্ষেত্রে এই রত্ন পরলে জীবনের জট খুলে যায়। তবে এটি পরার আগে বিশেষ শুদ্ধি ও নিয়ম মানা অত্যন্ত জরুরি।”
কোন রাশির জাতকদের জন্য শুভ পোখরাজ?***
জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী মেষ (Aries), সিংহ (Leo), ধনু (Sagittarius), বৃশ্চিক (Scorpio) এবং মীন (Pisces) রাশির জাতকদের জন্য পোখরাজ অত্যন্ত শুভ। বিশেষত, ধনু ও মীন রাশির অধিপতি গ্রহ হল বৃহস্পতি। তাই এদের জন্য এই রত্ন অনেক বেশি কার্যকর। ধনু রাশির মানুষ সাধারণত আশাবাদী, উদ্যমী ও উচ্চ চিন্তাশীল, পোখরাজ তাদের চিন্তাকে আরও বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, মীন রাশির মানুষ সংবেদনশীল ও অন্তর্মুখী হয়; এই রত্ন তাদের আত্মবিশ্বাস জোগায় ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায়।
সিংহ রাশির (Leo) জাতকদের ক্ষেত্রেও পোখরাজ সাফল্য এনে দিতে পারে, বিশেষত যখন জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা তৈরি হয়। মেষ রাশির (Aries) জাতকদের নেতৃত্বের গুণ ও ধৈর্য বাড়ায় এই রত্ন, যা তাদের ক্যারিয়ার ও ব্যবসায় উন্নতির সুযোগ করে দেয়। বৃশ্চিক রাশির (Scorpio) জাতকেরা সাধারণত আবেগপ্রবণ, তাদের মানসিক স্থিতি ও আর্থিক উন্নতিতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কোন রাশির জাতকদের জন্য নয় পোখরাজ?
অন্যদিকে, বৃষ (Taurus), মিথুন (Gemini), কন্যা (Virgo), তুলা (Libra), মকর (Capricorn) ও কুম্ভ (Aquarius) রাশির জাতকদের জন্য পোখরাজ একেবারেই অনুপযুক্ত।
এই রাশিগুলির জন্য বৃহস্পতির প্রভাব বিরূপ ফল দিতে পারে। তাই পোখরাজ পরলে জীবনে অকারণ বাধা, মানসিক উদ্বেগ, এমনকি আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে বলে জ্যোতিষীরা সতর্ক করেছেন। পণ্ডিত মুখার্জি আরও যোগ করেন, “সব রত্নেরই একটা ‘গ্রহীয়’ সংযোগ আছে। কেউ যদি নিজের কোষ্ঠী না দেখে শুধু শুনে রত্ন পরে নেন, তাহলে তা বিপরীত ফল দেয়। তাই পোখরাজের মতো শক্তিশালী রত্ন কখনওই না ভেবে পরা উচিত নয়।”
পোখরাজ পরার সঠিক নিয়ম
জ্যোতিষ মতে, পোখরাজ পরার ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ করা মানে তার শুভফলকে বাধা দেওয়া। প্রথমেই লক্ষ্য রাখতে হবে, রত্নের ওজন যেন শরীরের ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। যেমন, যদি কারও ওজন হয় ৬০ কেজি, তাহলে তাঁর পোখরাজের ওজন হওয়া উচিত প্রায় ৬.৫ রতি। সোনা (Gold) বা তামার (Copper) আংটিতে পোখরাজ পরতে হয়, রুপোর (Silver) আংটিতে এটি কখনওই বাঁধানো উচিত নয়।পোখরাজ ধারণের আগে সেটিকে শুদ্ধ করতে হয়। এর জন্য রত্নটিকে কাঁচা দুধ, গঙ্গাজল ও মধুর মিশ্রণে অন্তত ১০ মিনিট রেখে দিতে হয়। পরে পরিষ্কার জলে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।পোখরাজ পরার শ্রেষ্ঠ সময় হল, শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে, বিশেষত যখন বৃহস্পতি নিজের রাশিতে অবস্থান করছে। আংটিটি মধ্যমা আঙুলে পরা উচিত, এবং সেই সময় “ওম গুরবে নমঃ” মন্ত্রটি ১৯ বার জপ করতে বলা হয়।
পোখরাজ পরার উপকারিতা
যারা নিয়ম মেনে পোখরাজ ধারণ করেন, তাদের জীবনে এক মাসের মধ্যেই স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে, মনোবল দৃঢ় হয়, কাজের প্রতি একাগ্রতা আসে। যারা জীবনে বারবার বাধার সম্মুখীন হন বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, তাঁদের জন্য পোখরাজ আশীর্বাদস্বরূপ।এই রত্ন পরলে কর্মক্ষেত্রে উন্নতি, ব্যবসায় লাভ, এবং আর্থিক স্থিতি ফিরে আসে। সংসারে শান্তি ও প্রেমের বন্ধন আরও গভীর হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যাদের বিবাহে দেরি হচ্ছে বা সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছে, তাদের জন্মছকে বৃহস্পতির দুর্বল প্রভাব থাকে। সেক্ষেত্রে পোখরাজ সেই অচলাবস্থা ভেঙে দেয়। জ্যোতিষী অনিতা চ্যাটার্জি বলেন, “পোখরাজ শুধু ভাগ্য নয়, মনকেও স্থির করে। জীবনে লক্ষ্য স্থির করতে সাহায্য করে এই রত্ন। যাদের জীবনে বারবার ব্যর্থতা আসে, তারা যদি সঠিকভাবে পোখরাজ ধারণ করেন, তবে এক মাসের মধ্যেই আশ্চর্যজনক পরিবর্তন টের পাবেন।” তবে মনে রাখা জরুরি, সব রত্নেরই ‘সহ্যশক্তি’ আলাদা। কারও শরীর বা ভাগ্যে পোখরাজ মানালে তা অমূল্য সম্পদ, না মানালে ভয়ংকর ফল দিতে পারে। তাই রত্ন ধারণের আগে অভিজ্ঞ জ্যোতিষীর পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।
জীবনের মোড় ঘোরানোর এক প্রাচীন বিশ্বাস
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রে রত্ন পরার ধারণা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। রাজা-মহারাজা থেকে শুরু করে ঋষি-মুনি সবাইই গ্রহদোষ নিরসনে রত্ন ধারণ করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, প্রতিটি রত্ন একেকটি গ্রহের শক্তি ধারণ করে এবং সেই শক্তি পরিধানকারী ব্যক্তির জীবনে নির্দিষ্ট প্রভাব ফেলে। পোখরাজ সেই অর্থে ‘গুরুগ্রহ’ বৃহস্পতির আশীর্বাদ নিয়ে আসে। এটি জ্ঞান, ধর্ম, ন্যায়বোধ, শিক্ষাগত উন্নতি, এমনকি সন্তানসুখও বৃদ্ধি করে। যারা শিক্ষকতা, আইন, প্রশাসন বা ধর্মীয় কাজে যুক্ত, তাঁদের জন্য এই রত্ন বিশেষ শুভ। যেমন, একসময়ে মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত জ্যোতিষী পণ্ডিত নানাসাহেব দেসাই (Pandit Nanasahab Desai) বলেছিলেন, “যে মানুষ সত্যিকার অর্থে বৃহস্পতির শক্তি লাভ করতে পারে, তার জীবনে কখনও অন্ধকার থাকে না। পোখরাজ সেই আলোরই প্রতীক।”
সতর্কতা
সবশেষে মনে রাখতে হবে, পোখরাজ একটি শক্তিশালী ‘আত্মিক’ রত্ন। তাই এটি কখনওই বাজার থেকে কিনে হঠাৎ পরে নেওয়া ঠিক নয়। নকল রত্ন বা ভুল মন্ত্রে ধারণ করলে তা শুভের বদলে অশুভ হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া রত্ন কেনা বা পরা থেকে বিরত থাকা উচিত। জীবনের কঠিন সময়ে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পোখরাজ ধারণ করা যেতে পারে, তবে সেটি যেন অন্ধ বিশ্বাস না হয়ে, আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়। কারণ রত্নের শক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ নিজের পরিশ্রম ও ইতিবাচক মানসিকতার মাধ্যমে সেই শুভ শক্তিকে গ্রহণ করতে পারে।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : toe astrology | পায়ের তর্জনি যদি বুড়ো আঙুলের চেয়েও দীর্ঘ হয়, শাস্ত্র কী বলছে আপনার ভাগ্য আর চরিত্র নিয়ে?




