সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: প্রায় সাত মাস ধরে অধরা থাকার পর অবশেষে গ্রেফতার হলেন সল্টলেকের স্বর্ণব্যবসায়ী খুনের মামলায় অভিযুক্ত রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মণ। কিন্তু তাঁর গ্রেফতারির ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াল রাজ্যে। নিউ টাউনে মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে এক পথচারীকে ধাক্কা মারার অভিযোগে ধরা পড়েন তিনি। এতদিন যিনি পুলিশের খোঁজের তালিকায় ‘ফেরার’ হিসেবে ছিলেন, তাঁর এভাবে ধরা পড়া নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। আর সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। উল্লেখ্য, সোমবার রাতের এই ঘটনার পর থেকেই প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এতদিন পুলিশ কেন অভিযুক্তকে ধরতে পারেনি? কীভাবে তিনি এতদিন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছিলেন? এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন ফেলেছে।
দিলীপ ঘোষ সরাসরি পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ তো কাউকে খুঁজে পায় না। সন্ধ্যার পর তাদের সঙ্গে বসে খায়, তারপর বলে খুঁজে পাচ্ছি না।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে গাফিলতি এবং যোগসাজশের অভিযোগের দিকে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সব জায়গাতেই এই সমস্যা আছে, মেদিনীপুরেও একই চিত্র দেখা যায়।’ শুধু সমালোচনা নয়, হুঁশিয়ারির সুরও শোনা গিয়েছে তাঁর কথায়। দিলীপ বলেন, ‘পুলিশ যদি নিজেদের অভ্যাস না বদলায়, তাহলে মানুষই তাদের বদলে দেবে।’ এই বক্তব্যে জনরোষের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশাসনের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি এখানেই থেমে থাকেননি। অতীতের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই পুলিশের মধ্যে কিছু খারাপ অভ্যাস তৈরি হয়েছে। মিথ্যা বলা, রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা, অপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, এসব বন্ধ করা দরকার।’ তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি পুলিশ ব্যবস্থার ভিতরে দীর্ঘদিনের সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করছেন। দিলীপ ঘোষ আরও বলেন, ‘এখন মানুষ অনেক বেশি ক্ষুব্ধ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে, পুলিশ যদি সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে, তাহলে পুলিশের সুরক্ষা কে দেবে?’ এই মন্তব্য রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তিনি পুলিশের প্রতি সতর্কবার্তাও দেন। তাঁর কথায়, ‘পুলিশের এখনই সাবধান হওয়া উচিত। দীর্ঘদিন ধরে যা চলছে, তাতে মানুষের ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে। যদি নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’ এই প্রসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যে অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে পুলিশের কিছু অংশের যোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি, তবুও মন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রশান্ত বর্মণের প্রসঙ্গ টেনে দিলীপ ঘোষ প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের সমস্যার কথাও বলেন। তাঁর মতে, ‘ওসি, আইসি, বিডিওদের মধ্যে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে কারণ তাঁদের অনেক সময় ভুল কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ধীরে ধীরে সেটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখনই সময় এই প্রবণতা বদলানোর।’ তিনি আরও জানান, ‘যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হবে এবং আইনের মুখোমুখি করা হবে।’
উল্লেখ্য, দিলীপ ঘোষ অতীতে বিরোধী শিবিরে থাকাকালীনও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব ছিলেন। বর্তমানে তিনি রাজ্যের মন্ত্রী হলেও তাঁর বক্তব্যের ধার কমেনি। বরং দায়িত্বে থেকেও একই সুর বজায় রেখেছেন, যা রাজনৈতিকভাবে নতুন তাৎপর্য বহন করছে। প্রসঙ্গত, রাজ্যে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) সরকার গঠনের পর ৯ মে ব্রিগেডে শপথ নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর হাতেই রয়েছে স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব। সেই প্রেক্ষাপটে পুলিশের কাজকর্ম নিয়ে মন্ত্রিসভার ভেতর থেকেই এই ধরনের মন্তব্য সামনে আসা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশান্ত বর্মণের গ্রেফতারির ঘটনাও এখনও তদন্তাধীন। নিউ টাউনের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে পুরনো খুনের মামলার তদন্তও নতুন করে গতি পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশে এই ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। প্রশাসনের ভূমিকা, পুলিশের দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান, সব কিছু নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। দিলীপ ঘোষের মন্তব্য সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dilip Ghosh | নতুন দাবি ঘিরে ফের বিতর্কে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, গোমাতা প্রসঙ্গে জোর চর্চা




