সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিলিগুড়ি: জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা না থাকলেও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গভীরভাবে যুক্ত ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram) গানকে ঘিরে রাজ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (Ministry of Home Affairs) নির্দেশিকার পর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের উদ্যোগে এই গান গাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, বহু ইংরেজি মাধ্যম ও মিশনারি স্কুল এখনও এই নির্দেশ মানছে না। এর মধ্যেই শিলিগুড়ি (Siliguri) -সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক স্কুলে তড়িঘড়ি শুরু হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-এর রিহার্সাল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর নেতৃত্বে সরকার ইতিমধ্যেই সরকারি স্কুলগুলিতে এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। পরে সেই নির্দেশ মাদ্রাসাগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়। এবার নজর বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম এবং মিশনারি স্কুলগুলির দিকে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার (Sukanta Majumdar) জানিয়েছেন, ‘যেখানে এখনও বন্দে মাতরম গাওয়া হচ্ছে না, সেখানে বিষয়টি নজরে আনা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’
শিলিগুড়ি শহরে বহু নামী ইংরেজি মাধ্যম ও মিশনারি স্কুল রয়েছে। এই স্কুলগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি এখনও প্রার্থনা সংগীত হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’ অন্তর্ভুক্ত করেনি বলে অভিযোগ। কিছু স্কুলের তরফে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সংস্কৃত শব্দবন্ধ ও উচ্চারণের জটিলতার কারণে ছাত্রছাত্রীদের শেখাতে সময় লাগছে। তবে প্রশাসনিক স্তরে এই যুক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
একাধিক স্কুল ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ শুরু করেছে। কোথাও প্রতিদিন নিয়ম করে গানের শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে রিহার্সাল করাচ্ছেন। এক স্কুলের অধ্যক্ষ জানান, ‘আমরা আগে থেকেই প্রথম দু’টি স্তবক গাইতাম। এখন বাকি স্তবকগুলিও শেখানো হচ্ছে, যাতে সম্পূর্ণ গানটি গাওয়া যায়।’ তাঁর কথায়, ‘শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করা হচ্ছে, যাতে তারা সঠিক উচ্চারণে গানটি পরিবেশন করতে পারে।’
উত্তরবঙ্গ সহোদয় স্কুল কমপ্লেক্স (North Bengal Sahodaya School Complex) -এর অধীনে থাকা প্রায় ৮০টি সিবিএসই (CBSE) স্কুলেও এই বিষয়ে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘আমাদের আওতায় থাকা স্কুলগুলিকে দ্রুত বন্দে মাতরম চালু করার কথা বলা হয়েছে।’ যদিও মিশনারি স্কুলগুলির ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেখানে নির্দেশ কার্যকর করা কিছুটা জটিল বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান গাওয়া কতটা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত এবং তা কীভাবে কার্যকর করা হবে। একদিকে প্রশাসন এই উদ্যোগকে জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে, অন্যদিকে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার বিষয়টি তুলে ধরছে। রাজনৈতিক স্তরেও এই ইস্যু নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। শাসকপক্ষের বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ গান, তাই তা শিক্ষার্থীদের শেখানো জরুরি। বিরোধীদের একাংশ মনে করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। এদিকে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই পরিবর্তন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ নতুন গান শেখার সুযোগ হিসেবে দেখছে, আবার কেউ কেউ হঠাৎ করে নতুন নিয়ম চালুর কারণে কিছুটা বিভ্রান্ত। তবে অধিকাংশ স্কুলই এখন প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার দিকেই এগোচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে এই ধরনের নির্দেশ কার্যকর করতে গেলে সময় ও পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যেসব স্কুলে এতদিন অন্য প্রার্থনা সংগীত চালু ছিল, সেখানে নতুন গান অন্তর্ভুক্ত করা একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্ভব। তাই ধাপে ধাপে রিহার্সাল চালিয়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই এই রিহার্সালের ছবি সামনে এসেছে। গানের শিক্ষকরা আলাদা করে সময় দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উচ্চারণ, সুর এবং তাল শেখাচ্ছেন। অনেক স্কুলে সকালবেলার অ্যাসেম্বলিতে পরীক্ষামূলকভাবে গানটি গাওয়া শুরু হয়েছে।
আগামী দিনে এই নির্দেশ কতটা বিস্তৃতভাবে কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। প্রশাসনের তরফে নজরদারি আরও বাড়ানো হতে পারে বলেও জানা যাচ্ছে। ফলে মিশনারি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ‘বন্দে মাতরম’ ঘিরে এই নতুন পরিস্থিতি শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার, নির্দেশ মানতে হবে। এখন দেখার, সব স্কুল কবে নাগাদ এই নির্দেশ পুরোপুরি কার্যকর করে এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Madrasa Vande Mataram rule WB, West Bengal education policy madrasa | মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম বাধ্যতামূলক, নতুন নির্দেশ জারি রাজ্য সরকারের




