সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। শনিবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্য খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে উঠে আসে, এত দিন রাজ্যের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে যুক্ত প্রায় ৬ কোটি মানুষকে এবার কেন্দ্রীয় ‘আয়ুষ্মান ভারত’ (Ayushman Bharat) প্রকল্পের আওতায় আনা হবে।
আরও পড়ুন : Narendra Modi Ayushman Bharat | পশ্চিমবঙ্গে চালু আয়ুষ্মান ভারত, মোদীর বার্তায় উচ্ছ্বাস
নবান্নে আয়োজিত ওই বৈঠকে মুখ্যসচিব মনোজ আগারব্যাল (Manoj Agarwal) এবং প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত (Subrata Gupta) উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী আগের সরকারের স্বাস্থ্য নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘আগের সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় না করে শুধুই বিরোধিতার পথ বেছে নিয়েছিল। এর ফলে বহু মানুষ সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের পূর্ণ সুবিধা পাননি।’ তাঁর দাবি, দেশের অন্যান্য রাজ্যে যে সব স্বাস্থ্য পরিষেবা ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে, সেগুলির অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছয়নি। নতুন সরকারের উদ্যোগে সেই ঘাটতি পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যের স্বাস্থ্যখাতকে নতুনভাবে সাজাতে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে পরিষেবার গুণগত মান এবং প্রাপ্যতা দু’দিকেই উন্নতি হবে।’
আয়ুষ্মান ভারতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘ইতিমধ্যেই নাম নথিভুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি জুলাই মাসের মধ্যেই কার্ড বিতরণ সম্পন্ন করতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় থাকা ৬ কোটিরও বেশি উপভোক্তাকে দ্রুত আয়ুষ্মান ভারতে যুক্ত করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে আরও মানুষ এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।’ এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রাজ্যের বাসিন্দারা দেশের যে কোনও প্রান্তে এই স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নিতে পারবেন। শুধু পুরনো উপভোক্তাই নন, নতুন আবেদনকারীদের জন্যও দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা এত দিন কোনও সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাঁরাও এবার আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা নিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জুনের প্রথম সপ্তাহে দিল্লিতে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অন্য রাজ্যে বসবাসকারী প্রায় ১ কোটি বাঙালিও এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পাবেন।
স্বাস্থ্য পরিষেবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে টিকাকরণ কর্মসূচির সূচনার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘দেশজুড়ে এই উদ্যোগ শুরু হলেও পশ্চিমবঙ্গে এখনও চালু হয়নি। আগামী ৩০ মে থেকে আমরা এই কর্মসূচী শুরু করব। ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের এই টিকা দেওয়া হবে।’ বিধাননগর সাব-ডিভিশন হাসপাতালে এই কর্মসূচির সূচনা করবেন তিনি নিজে। একই দিনে টিবি-মুক্ত ভারত কর্মসূচী নিয়েও কর্মশালা শুরু হবে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাতে রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ‘প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র’ (Pradhan Mantri Jan Aushadhi Kendra) গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘৪০০-র বেশি কেন্দ্র তৈরি হলে মানুষ অনেক কম দামে ওষুধ পাবেন। বহু ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মিলবে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘২০০০ টাকার ওষুধ ২০০ টাকায় পাওয়া সম্ভব হবে।’ মোট ৪৬৯টি কেন্দ্র চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, আসানসোল ও দক্ষিণ দিনাজপুর এই চার প্রশাসনিক জেলায় মেডিক্যাল কলেজ নেই। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই জেলাগুলিতে মেডিক্যাল কলেজ গড়তে প্রয়োজনীয় জমি ও পরিকাঠামোর প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হবে।’ পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে একটি এইমস (AIIMS) স্থাপনের দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। শিশুমৃত্যুর হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার কিছু জেলায় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম ও মালদহ এই জেলাগুলির পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজরে রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আর্থিক বরাদ্দের প্রসঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ইতিমধ্যেই তার একাংশ রাজ্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছে।’ এই অর্থ স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বড় ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছে প্রশাসন। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্যসাথী থেকে আয়ুষ্মান ভারতে স্থানান্তর, নতুন টিকাকরণ কর্মসূচি, সস্তায় ওষুধের ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন, এই একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় সাজানোর উদ্যোগ স্পষ্ট হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে এই সিদ্ধান্তগুলির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত হয়, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari cabinet decisions, Ayushman Bharat Bengal news | চাকরির বয়সসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু, প্রথম বৈঠকেই বড় সিদ্ধান্ত শুভেন্দুর



