সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাতের নীরবতায় রান্নাঘরে ঢুকে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা আরশোলা (Cockroach) আর মুহূর্তেই শুরু চিৎকার, ছুটোছুটি, আতঙ্ক। এমন দৃশ্য প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যায়। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া যেন আরও বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল, একটি ছোট্ট পতঙ্গকে ঘিরে এমন তীব্র ভয় কেন? এর পেছনে কি শুধুই অভ্যাস, নাকি রয়েছে গভীর মানসিক কারণ? সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এই বিষয়টিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। অনেকেই ভাবেন, আরশোলাকে ভয় পাওয়া নিছক বাড়াবাড়ি বা অভিনয়। কিন্তু মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। এই ভয়কে বলা হয় ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’ (Katsaridaphobia)। এটি একটি পরিচিত ফোবিয়া, যা বিশ্বজুড়ে বহু মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এই অবস্থায় কেউ আরশোলা দেখলে শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, এমনকি কয়েক মুহূর্তের জন্য চিন্তাশক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
মনোবিদদের মতে, এই ভয়ের সূত্রপাত অনেক ক্ষেত্রেই শৈশব থেকে। একটি শিশু তার চারপাশের মানুষদের দেখে প্রতিক্রিয়া শেখে। যদি পরিবারে বাবা-মা বা বড়দের কেউ আরশোলা দেখলে আতঙ্কিত হন, তা শিশুদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। শিশুর মনে তখন একটি ধারণা তৈরি হয় যে এই প্রাণীটি হয়তো বিপজ্জনক। ধীরে ধীরে সেই ধারণাই বড় হয়ে ভয় হিসেবে গড়ে ওঠে। এইভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আরশোলার ভয় ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েদের মধ্যে এই ভয় বেশি চোখে পড়ার পিছনে সামাজিক ও মানসিক দিকও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নোংরা পরিবেশে থাকা প্রাণীদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আরশোলা যেহেতু সাধারণত নালা-নর্দমা বা অস্বাস্থ্যকর জায়গায় বাস করে, তাই তাদের উপস্থিতি ঘেন্না ও আতঙ্ক, দু’টোই তৈরি করে।আরশোলার শারীরিক বৈশিষ্ট্যও এই ভয় বাড়িয়ে তোলে। তেলতেলে গা, দ্রুত দৌড়ে পালানোর অভ্যাস, হঠাৎ উড়ে এসে শরীরে বসে পড়া—এই আচরণগুলি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। বিশেষ করে অপ্রত্যাশিতভাবে উড়ে আসা আরশোলা অনেককে চমকে দেয়। এই অপ্রত্যাশিততা থেকেই ভয় আরও বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্যজনিত দিক। যদিও আরশোলা সরাসরি সাপ বা বন্যপ্রাণীর মতো প্রাণঘাতী নয়, তবুও এরা নানা জীবাণু বহন করে। নোংরা জায়গায় বসবাসের কারণে তাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জেন থাকে। যাঁদের হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অ্যালার্জেন মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অবচেতন মনে আরশোলাকে ঘিরে একটি বিপদের ধারণা তৈরি হয়। একজন মনোবিদের কথায়, ‘এই ভয়কে হালকা করে দেখা উচিত নয়। অনেক সময় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।’ তবে আশার কথা, এই ফোবিয়া কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কাউন্সেলিং, আচরণগত থেরাপি এবং ধীরে ধীরে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যমে এই ভয় কমানো যায়। আরশোলা ভীতি নিয়ে হাসাহাসি বা কাউকে ছোট করা উচিত নয় বলেও মত মনোবিদদের। কারণ এটি কোনও ইচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মনের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কেউ যখন আরশোলা দেখে ভয় পান, তখন তাঁর শরীর বিপদের সংকেত হিসেবে সেটিকে গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেয়।
বর্তমান সময়ে শহুরে জীবনে আরশোলার উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। তাই এই ভয়ের সঙ্গে লড়াই করাও অনেকের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। বাড়ি পরিষ্কার রাখা, কীটনাশক ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রসঙ্গত, আরশোলাকে ঘিরে যে ভয়, তা নিছক কল্পনা নয়। এর পেছনে রয়েছে শৈশবের অভিজ্ঞতা, সামাজিক প্রভাব এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মিশ্রণ। তাই পরের বার যদি কেউ আরশোলা দেখে ভয় পান, তবে সেটিকে হালকা ভাবে না দেখে তার পেছনের কারণটা বোঝার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ranveer Singh family time | দীপিকা অন্তঃসত্ত্বা, শুটিংয়ের মাঝেও পরিবারে সময় দিলেন রণবীর, জানালেন সহ-অভিনেতা



