সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত রেখে ফলতা বিধানসভা (Falta Election) উপনির্বাচনের ফল সামনে এল। প্রত্যাশা মতোই এই আসনে জয় ছিনিয়ে নিল বিজেপি, তবে চমক অন্য জায়গায়, দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল সিপিএম, আর তৃণমূল কংগ্রেস নেমে গেল চতুর্থ স্থানে। ভোটের এই ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন তুলে দিল, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ নিয়ে। এই উপনির্বাচনে বিজেপির জয়ের বিষয়ে ভোটের আগে থেকেই এক ধরনের নিশ্চিততা ছিল রাজনৈতিক মহলে। প্রায় ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটার থাকা এই কেন্দ্রে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল আগেই। তবে মূল কৌতূহল ছিল, তৃণমূল কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে এবং সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত গণনা পর্ব শেষ হতেই দেখা গেল, বিজেপির প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা (Debangshu Panda) এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬৬৬ ভোট। অন্য দিকে সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি (Shambhunath Kurmi) পেয়েছেন ৪০ হাজার ৬৪৫ ভোট, যা তাঁকে দ্বিতীয় স্থানে তুলে দিয়েছে। কংগ্রেস (Congress) তৃতীয় স্থানে এবং তৃণমূল চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছে মাত্র ৭ হাজার ৭৮৩ ভোট নিয়ে। ভোটের এই ফল শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, রাজনৈতিক বার্তাতেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এক সময় এই ধরনের আসনে সংখ্যালঘু ভোটের একতরফা সমর্থন পেত তৃণমূল। কিন্তু এবার সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা গেল। গণনার পর উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ সিপিএমের দিকে ঝুঁকেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ফল ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘অনেক বছর পর মানুষ স্বাধীন ভাবে ভোট দিতে পেরেছেন, তাই প্রকৃত ফল সামনে এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগের নির্বাচনে এই আসনে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তৃণমূল, কিন্তু এবার বাস্তব চিত্র আলাদা।’ ফলতা কেন্দ্রের জনবিন্যাস অনুযায়ী প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। অতীতে এই ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের পক্ষে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণে ভাঙন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর তৃণমূলের সংগঠনগত দুর্বলতা সামনে আসায় বিকল্প শক্তির খোঁজ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান (Jahangir Khan) ভোটের আগে কার্যত ময়দান থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে দলের প্রচার এবং সংগঠনে প্রভাব পড়ে। অন্য দিকে কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা (Abdur Rezzak Molla) সংখ্যালঘু ভোট টানার চেষ্টা করলেও তা বড় সাফল্য পায়নি।
সিপিএমের প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি ছিলেন তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত মুখ, তবে মাঠে নেমে প্রচার চালিয়ে তিনি নজর কেড়েছেন। প্রচারের সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে ঠিকভাবে প্রচার করার সুযোগ পাইনি, এ বার সেই সুযোগ পেয়েছি।’ এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, আগের নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে তাঁদের অভিযোগ ছিল। ভোটের শুরুতে কয়েকটি রাউন্ডে সিপিএম প্রার্থী বিজেপির সঙ্গে টক্কর দিলেও পরে বিজেপি ক্রমশ এগিয়ে যায়। তবুও দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা সিপিএমের জন্য বড় সাফল্য হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
এই ফলাফল থেকে একটি বড় ইঙ্গিত মিলছে সংখ্যালঘু ভোট আর এককভাবে কোনও দলের সঙ্গে আবদ্ধ নেই। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা বিকল্প খুঁজছে। এর ফলে আগামী দিনে রাজ্যের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটের অঙ্ক আরও জটিল হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, ২০০৮ সালের পর থেকে যে সংখ্যালঘু ভোট বামফ্রন্ট থেকে তৃণমূলের দিকে সরে গিয়েছিল, এখন সেই ধারা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলেও বিভিন্ন জায়গায় এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী নন্দীগ্রাম (Nandigram) উপনির্বাচনকে ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর (Bhabanipur) আসন ধরে রাখায় নন্দীগ্রাম শূন্য হয়েছে। ফলে সেখানে নতুন করে ভোট হতে চলেছে। এই কেন্দ্রেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে, যা ফলতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নন্দীগ্রামে কোন দল কাকে প্রার্থী করবে, বাম-কংগ্রেসের মধ্যে কী সমঝোতা হয়, এবং সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায়, এসব প্রশ্ন এখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলতার ফল সেই আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিষ্কার, রাজ্যের রাজনীতিতে পুরনো সমীকরণ বদলাচ্ছে। ভোটারদের আচরণে নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ হয়ে রইল ফলতা উপনির্বাচনের ফল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Howrah municipal election 2026, Suvendu Adhikari announcement | হাওড়ায় পুরভোটের বড় ঘোষণা! ডিসেম্বরেই নির্বাচন, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু



