সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতির সম্ভাবনা তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের উৎপাদনশীলতার সূচকে একসময় শীর্ষস্থান দখল করা এই রাজ্য ক্রমশ পিছিয়ে বর্তমানে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে শিল্প ও অর্থনীতিকে পুনরায় সক্রিয় করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নীতি আয়োগ (NITI Aayog) একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি সংস্থার উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ি (Ashok Lahiri) -এর নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরই পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নের জন্য একটি সুসংহত ব্লুপ্রিন্ট তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। নীতি আয়োগ সেই লক্ষ্যেই উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো, নদীভিত্তিক বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের উপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করছে। অশোক লাহিড়ি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নের জন্য আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করছি, যেখানে কলকাতাকে ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট নীতির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।’
ঐতিহাসিকভাবে শিল্পের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার সময় জিডিপি অনুযায়ী দেশীয় অর্থনীতিতে এই রাজ্যের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে সেই অবস্থান দুর্বল হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্রমিক আন্দোলনের জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব, সব মিলিয়ে শিল্পক্ষেত্রে ধাক্কা লেগেছে। বাম আমলে একাধিক কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূল আমলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর শিল্পপতিদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনও রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিজেপি নেতা ও শিল্পপতি শিশির বাজোরিয়া (Shishir Bajoria) এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শুধু চাকরি খোঁজেন, এই ধারণা সঠিক নয়। এই রাজ্য পিসি রায় (Prafulla Chandra Ray) এবং ঘনশ্যাম দাস বিড়লা (Ghanshyam Das Birla)-এর মতো উদ্যোক্তাদের জন্ম দিয়েছে। আমরা সেই ঐতিহ্যকে আবার সামনে আনতে চাই।’ তাঁর মতে, কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
নীতি আয়োগের পরিকল্পনায় চারটি মূল ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, সরবরাহ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ পরিকাঠামো। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ভারতকে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযুক্ত করে, যা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং পণ্য পরিবহণের করিডর উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন শিল্প। ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, বস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পূর্ব ভারতের খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ উৎপাদন শিল্পেই বৃহত্তর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তৃতীয়ত, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি কয়লা ও লৌহ আকরিক সমৃদ্ধ অঞ্চল রয়েছে, পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের জ্বালানি পথের নৈকট্য শিল্প উন্নয়নের পক্ষে সহায়ক হতে পারে। এই সমস্ত দিক বিবেচনা করে শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে।
চতুর্থত, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান। তরুণ প্রজন্মের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচি এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও পরিকল্পনার অংশ। যারা কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন, তাঁদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড (Indian Institute of Foreign Trade) -এর প্রাক্তন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধর (Biswajit Dhar) বলেন, ‘কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতে বৃদ্ধির হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। নতুন ধরনের চা, প্রসেসড খাদ্য এবং আঞ্চলিক পণ্যের রফতানি বাড়ানো গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এখনও সংবেদনশীল। পাশাপাশি দুর্বল শিল্প পরিকাঠামো, স্থানীয় প্রশাসনের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিল্পায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। নতুন সরকারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা বাড়লেও, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন দেখার। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এই উদ্যোগ সফল হলে রাজ্যের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনই কর্মসংস্থানের নতুন দরজাও খুলবে। এখন নজর থাকবে পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ এবং তার ফলাফলের উপর।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : DilipGhosh, AgnimitraPaul, DeputyCM: দিলীপ ঘোষ ও অগ্নিমিত্রা পাল উপ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন | বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ




