সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের উন্নয়নমূলক প্রশাসনিক মডেল এখন আন্তর্জাতিক স্তরেও আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। দেশের পিছিয়ে পড়া জেলা ও ব্লকগুলির উন্নয়নের লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট প্রোগ্রাম (Aspirational District Programme বা ADP)’ এবং ‘অ্যাসপিরেশনাল ব্লক প্রোগ্রাম (Aspirational Blocks Programme বা ABP)’ সম্পর্কে বিশদ ধারণা নিতে সম্প্রতি নতুন দিল্লিতে সফর করল জার্মানির একটি প্রতিনিধি দল। জার্মান সংস্থা গ্লোবাল ব্রিজেস (Global Bridges) -এর প্রতিনিধিরা ভারতের নীতিনির্ধারণী সংস্থা নীতি আয়োগ (NITI Aayog)-এ এসে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাঠামো, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই বৈঠকের নেতৃত্ব দেন রোহিত কুমার (Rohit Kumar), নীতি আয়োগের অতিরিক্ত সচিব এবং ADP ও ABP কর্মসূচীর মিশন ডিরেক্টর। বৈঠকে তিনি ভারতের এই উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলির পরিকল্পনা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ভারতের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়নকে দ্রুততর করার লক্ষ্যে এই প্রকল্পগুলি চালু করা হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, জেলার পাশাপাশি ব্লক স্তরেও উন্নয়নের সূচকগুলিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রশাসনের পরিষেবা মানুষের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগগুলির প্রধান লক্ষ্য। বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রোহিত কুমার বলেন, ‘অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট এবং অ্যাসপিরেশনাল ব্লক প্রোগ্রাম এমন একটি মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে যেখানে উন্নয়নের গতি বাড়াতে বিভিন্ন স্তরের প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করে।’ তিনি আরও জানান, এই কর্মসূচিগুলি মূলত ‘৩সি’ এবং ‘৩এফ’ নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ‘৩সি’ বলতে বোঝায় কনভারজেন্স (Convergence), কোলাবোরেশন (Collaboration) এবং কম্পিটিশন (Competition)। অর্থাৎ বিভিন্ন মন্ত্রক, রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়, যৌথ উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের গতি বাড়ানো হয়। অন্যদিকে ‘৩এফ’ বলতে বোঝায় ফান্ডস (Funds), ফাংশনস (Functions) এবং ফাংশনারিজ (Functionaries) যার মাধ্যমে অর্থ, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং কর্মীদের সঠিক সমন্বয় ঘটানো হয়।
নীতি আয়োগের এই কর্মসূচীর মূল লক্ষ্য হল স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে উন্নয়নের সূচকগুলিকে দ্রুত উন্নত করা। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলিকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বৈঠকে উপস্থিত জার্মান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন স্টেফান ট্রেগার (Dr. Stefan Traeger)। তিনি ভারতের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট এবং অ্যাসপিরেশনাল ব্লক প্রোগ্রাম উন্নয়ন প্রশাসনের একটি অত্যন্ত কার্যকর মডেল।’ তাঁর মতে, তথ্যনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো এবং স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এই প্রকল্পগুলিকে বিশেষভাবে সফল করেছে। নীতিনির্ধারণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই কর্মসূচীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বৈঠকে রোহিত কুমার ব্যাখ্যা করেন যে, এই প্রকল্পগুলিতে ডেটা-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিটি জেলার উন্নয়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এই ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রশাসন দ্রুত বুঝতে পারে কোথায় উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা হয়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হয় এবং ফলাফলও দ্রুত দৃশ্যমান হয়। বৈঠকের পরে জার্মান প্রতিনিধি দল নীতি আয়োগের ‘বিকশিত ভারত স্ট্র্যাটেজি রুম (Viksit Bharat Strategy Room)’ পরিদর্শন করেন। সেখানে নীতি আয়োগের আধিকারিকরা দেখান কীভাবে আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এই স্ট্র্যাটেজি রুমে দেশের বিভিন্ন রাজ্য, জেলা এবং ব্লকের উন্নয়ন সূচকগুলি বিশ্লেষণ করা হয়। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশে উন্নয়নের ব্যবধান কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট এবং অ্যাসপিরেশনাল ব্লক প্রোগ্রাম সেই ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নীতি আয়োগের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দেশ এখন ভারতের এই তথ্যনির্ভর উন্নয়ন মডেল সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। জার্মান প্রতিনিধি দলের এই সফর সেই আন্তর্জাতিক আগ্রহেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই ধরনের তথ্যনির্ভর উন্নয়ন মডেল ধারাবাহিকভাবে কার্যকর করা যায়, তবে ভারতের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলগুলির উন্নয়ন আরও দ্রুত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ত্বরান্বিত হবে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : NITI Aayog Natural Farming Workshop, State Support Mission SSM | প্রাকৃতিক চাষে জাতীয় কর্মশালা: নীতি আয়োগের উদ্যোগে দুই দিনের আলোচনায় দেশজুড়ে কৃষক-বিজ্ঞানী সমাগম




