সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে ভোট-পরবর্তী হিংসা ঘিরে উত্তেজনা যখন চরমে, তখন কলকাতা হাই কোর্টের (Calcutta High Court) একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর দায়ের করা মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujay Paul) -এর বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনও রকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাড়ি বা দোকান থেকে উচ্ছেদ করা হলে, তাকে নিরাপদে ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হবে প্রশাসনকেই।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে পাঁচ সপ্তাহ পরে। তার আগে সমস্ত পক্ষকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতিরা জানিয়েছেন, ‘হলফনামা খতিয়ে দেখে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে, এই মামলা কি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো প্রয়োজন কি না।’ এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে আইনি মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবারের শুনানিতে একটি নজিরবিহীন দৃশ্যও সামনে আসে। ‘আইনজীবী’ পরিচয়ে নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে সওয়াল করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। দীর্ঘদিন পর আদালতের মেঝেতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই প্রথম কলকাতা হাই কোর্টে আমি সওয়াল করছি। ১৯৮৫ সালে বার কাউন্সিলে আমার নাম নথিভুক্ত হয়েছিল এবং তার পর থেকে নিয়মিত সদস্যপদ নবীকরণ করেছি।’ নিজের বক্তব্যে তিনি রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন। মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, ভোট-পরবর্তী সময়কালে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রমাগত অভিযোগ আসছে। তিনি বলেন, ‘শিশু, নারী বা সংখ্যালঘু কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। বিবাহিত মহিলাদের পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ি লুট, অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আসছে, অথচ পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয়।’ আদালতের অনুমতি পেলে এই সমস্ত অভিযোগ অতিরিক্ত হলফনামায় যুক্ত করার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে তাঁর আবেদন, ‘রাজ্যের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুন। এটা কোনও বুলডোজ়ার রাজ্য নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গ— মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।’
এই শুনানিতে মমতার পাশাপাশি সওয়াল করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) এবং প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya)। তাঁদের বক্তব্যেও রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পায়। আদালতের পর্যবেক্ষণের পর রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, ‘বিরোধী পক্ষের তরফে তৃণমূল কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ চলছে। সেই প্রেক্ষিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে আদালতে গিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আদালতও বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে।’ তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক তরজা বাড়িয়েছে। আইনি মহলের একাংশ মনে করছে, এই মামলার পরবর্তী দিকনির্দেশ অনেকটাই নির্ভর করবে জমা পড়া হলফনামার উপর। যদি অভিযোগগুলির গুরুত্ব আদালতের কাছে পর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়, তবে মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হতে পারে। ফলে এই মামলা আগামী দিনে আরও বড় আইনি লড়াইয়ের রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্যে ভোট-পরবর্তী হিংসা নতুন কোনও বিষয় নয়, অতীতেও এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বার মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল করায় বিষয়টির গুরুত্ব অনেকটাই বেড়েছে। প্রশাসনিক ভূমিকা, পুলিশের সক্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে। কলকাতা হাই কোর্টের এই নির্দেশের ফলে প্রশাসনের উপর চাপ আরও বাড়ল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আদালতের তরফে পরিষ্কার বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব পালনে কোনও রকম গাফিলতি চলবে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া যাবে না, এই বার্তাই উঠে এসেছে আদালতের বক্তব্যে। পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহ এই মামলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ের মধ্যে জমা পড়া হলফনামা এবং তার ভিত্তিতে আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই মামলা কোন পথে এগোবে। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ, দুইয়ের উপরই এর প্রভাব পড়তে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : TMC MLA meeting Kolkata, Mamata Banerjee party meeting | দলের লাইনের বাইরে সুর! কলকাতায় তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে ‘নিজেদের মতো চলার’ সিদ্ধান্তে চাঞ্চল্য




