সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বৃহস্পতিবার এক অন্য রাজনৈতিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল। এতদিন যাঁকে ‘আগ্রাসী’ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) প্রথম দফার ভোটে নিজেকে তুলে ধরলেন একেবারে ভিন্ন ভঙ্গিতে। দিনভর তাঁর আচরণে ছিল সংযম, কথাবার্তায় ছিল মাপা সুর, আর মাঠপর্যায়ে নজরদারিতে ছিল একধরনের স্থিরতা। ভোটের দিন তাঁর এই বদলে যাওয়া উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। ভোরবেলা কাঁথির ‘শান্তিকুঞ্জ’ থেকে রওনা দিয়ে নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রামে পৌঁছন বিরোধী দলনেতা। নির্দিষ্ট বুথে ভোটদান সেরে তিনি আর দেরি করেননি। বুথে বুথে ঘুরে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, গোটা দিনটাই কেটেছে মাঠে। সাধারণত এসইউভি-র মাঝের আসনে বসে সফর করলেও এ দিন তাঁকে দেখা যায় ছোট গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসে এলাকা পরিদর্শন করতে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, ‘এতে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে।’
ভোট পর্যবেক্ষণের ফাঁকে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) কর্মীদের সঙ্গে ক্যাম্প অফিসে গিয়ে কথা বলেন শুভেন্দু। তাঁদের কাছ থেকে বুথের অবস্থা শোনেন, কোথাও কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না তা খোঁজ নেন। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে রাজ্যের অন্যান্য কেন্দ্রের খবরও সংগ্রহ করতে দেখা যায় তাঁকে। একাধিক প্রার্থী সরাসরি ফোনে নিজেদের এলাকার পরিস্থিতি জানান তাঁকে। গোপালচক এলাকায় কর্মীদের অনুরোধে ত্রিপলের উপর বসে মুড়ি ও ঝুরিভাজা খেতেও দেখা যায় তাঁকে, যা নিয়ে স্থানীয় স্তরে বেশ চর্চা শুরু হয়।।দিনভর শুভেন্দুর এই শান্ত উপস্থিতিকে বিজেপির একাংশ ব্যাখ্যা করছে আত্মবিশ্বাস হিসেবে। তাঁদের দাবি, প্রথম দফার ১৫২টি আসনে বিজেপির ভালো ফল হবে বলেই নেতাকে নির্ভার দেখিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress)-এর শিবিরে এই আচরণকে অন্যভাবে দেখা হচ্ছে। তাঁদের মতে, ‘হারের আশঙ্কা থেকেই সংযত হয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু।’ এই দ্বিমুখী ব্যাখ্যার মধ্যেই দিনের শেষে বড় রাজনৈতিক মন্তব্য করেন বিরোধী দলনেতা। ভোটগ্রহণ প্রায় শেষের দিকে তিনি বলেন, ‘এই দফাতেই বিজেপি ১২৫ আসনের কম পাবে না, রাজ্যে পরিবর্তন নিশ্চিত।’ এই দাবিকে ঘিরেই রাজনৈতিক তরজা চরমে উঠেছে। কারণ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। শুভেন্দুর এই মন্তব্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় অল্প সংখ্যক আসন পেলেই বিজেপি সরকার গঠনের পথে এগোতে পারে। অনেকের মতে, এই মন্তব্য দ্বিতীয় দফার আগে কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত রাখার কৌশল। তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) পাল্টা দাবি করেছেন, ‘১৫২টির মধ্যে ১৩২টি আসনই আমাদের দখলে যাবে।’
ভোটের দিন কয়েকটি মুহূর্ত বিশেষভাবে নজরে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশ দিয়ে তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর (Pabitra Kar)-এর কনভয় যায়। সেই সময় জোরে হর্ন বাজানো হলেও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাননি শুভেন্দু। বরং হেসে বলেন, ‘ওরা ভাবছে এখানে কেউ জয় শ্রীরাম বলবে, কিন্তু নন্দীগ্রামে ওদের কেউ গুরুত্ব দেয় না।’ ভীমকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয় (Bhimkata Primary School) এবং সাতেঙ্গাবাড়ি শিশু শিক্ষাকেন্দ্র (Satengabari Shishu Shiksha Kendra)-এর সামনে তাঁর কনভয় ঘিরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ওঠে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও দ্রুত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আনে। এই পরিস্থিতিতেও শুভেন্দুকে শান্ত থাকতে দেখা যায়। কোনও উত্তেজনায় তিনি জড়াননি, বরং নির্ধারিত সূচি মেনেই বুথ পরিদর্শন চালিয়ে যান। ভোট চলাকালীন তাঁর এই আচরণ অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুভেন্দুর ভূমিকা বরাবরই আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত। ২০০৭ সালের ভূমি আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর বিরুদ্ধে লড়াই, র্বত্র তাঁর লড়াকু উপস্থিতি ছিল আলোচনায়। বিধানসভায় তাঁর আক্রমণাত্মক অবস্থানের জন্য একাধিক বার তাঁকে সাসপেন্ডও হতে হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবারের ‘শান্ত’ শুভেন্দু অনেককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, একাধিক কেন্দ্রে লড়াইয়ের চাপ এবং বৃহত্তর নির্বাচনী কৌশলের কারণেই তাঁর আচরণে এই পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ভবানীপুর (Bhabanipur)-কে ঘিরে তাঁর বক্তব্য তা ইঙ্গিত করছে। তেখালি এলাকায় একটি বুথ পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, ‘এসআইআরের পর ভবানীপুর অনেকটাই সহজ হয়েছে। তবে দ্বিতীয় দফায় আমি কম জায়গায় প্রচার করব, সেখানে বেশি মনোযোগ দিতে চাই।’
এর পরেই নন্দীগ্রামের ভোটের দায়িত্ব স্থানীয় নেতৃত্বের উপর ছেড়ে তিনি ভবানীপুরের দিকে রওনা দেন। আগামী দফার ভোটের আগে তাঁর এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। প্রথম দফার ভোটে বিপুল উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের এই ভিন্ন ভঙ্গির মধ্যে দিয়ে রাজ্যের নির্বাচনী আবহ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এখন নজর ফল ঘোষণার দিকে, যেখানে বোঝা যাবে এই শান্ত মেজাজের অন্তরালে থাকা আত্মবিশ্বাস কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।
ছবি : সংগৃহীত :
আরও পড়ুন : WB Election News, Bengal Politics, Political Clash | উত্তেজনা, সৌজন্য আর রেকর্ড : প্রথম দফার ভোটে বাংলার মিশ্র ছবি, মমতা-শাহের মন্তব্যে নতুন সুর


