বিষ্ণুপদ মণ্ডল, সাশ্রয় নিউজ ★ ঝাড়গ্রাম : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ (West Bengal Election 2026)-এর আবহে ঝাড়গ্রাম (Jhargram) স্টেডিয়ামে আয়োজিত জনসভা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ল। রবিবার একদিনে রাজ্যে একাধিক সভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তার মধ্যে ঝাড়গ্রামের সভা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। জনজাতি অধ্যুষিত এই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে তিনি রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং বিজেপি (BJP) -এর পক্ষে জনসমর্থন চেয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। সভা শুরুতেই স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মোদী ‘জয় জোহার’ বলে বক্তব্য শুরু করেন। বাংলায় ‘কেমন আছেন?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি জনতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁর কথায়, ‘এই ভূমি বীরদের, ঝাড়গ্রাম জনজাতি সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।’ এই সূচনাতেই তিনি স্থানীয় আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই মূল রাজনৈতিক আক্রমণে নামেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, ‘বাংলার এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের জন্য নয়, এই ভূমির পরিচয় ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’ অনুপ্রবেশ ইস্যু তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূল এমন এক সরকার গড়তে চাইছে, যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ রক্ষা পাবে, আর সাধারণ মানুষই সমস্যার মুখে পড়বেন।’ তাঁর দাবি, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের কথা ভাবছেন এবং বিজেপিকে সুযোগ দিতে প্রস্তুত।
এদিন মোদী আরও বলেন, ‘এই ভোট বিজেপির প্রার্থী বা কর্মীরা একা লড়ছে না, এই লড়াই লড়ছে বাংলার যুবসমাজ, মা-বোনেরা এবং সাধারণ মানুষ।’ তিনি সভা থেকে আবেদন জানান, প্রতিটি বুথে বিজেপি প্রার্থীদের জেতাতে এবং দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য সমর্থন দিতে। মহিলাদের প্রসঙ্গে তিনি একাধিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ‘মহিলাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক সুরক্ষার জন্য বিজেপি কাজ করতে চায়।’ মোদী বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে বছরে ৩৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, পাশাপাশি মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তাও বাড়ানো হবে।’ এছাড়াও সার্ভিক্স ক্যানসার প্রতিরোধে টিকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। জনজাতি সম্প্রদায়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিজেপি জনজাতিদের সংস্কৃতি ও বিকাশকে গুরুত্ব দেয়। পিএম জনমন যোজনার মাধ্যমে তাঁদের উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে না। তাঁর দাবি, ‘ঝাড়গ্রামের মতো এলাকায় বনধন কেন্দ্র বাড়ালে মহিলাদের আয়ের সুযোগ বাড়বে।’
অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নিয়েও বক্তব্য রাখেন মোদী। তিনি বলেন, ‘ঝাড়গ্রাম অরণ্যসুন্দরী হিসেবে পরিচিত। এখানে ইকো টুরিজম ও হোম স্টে প্রকল্প বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’ পাশাপাশি রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ‘কেন্দ্র ইতিমধ্যে বন্দে ভারত ও অমৃত ভারত প্রকল্পের মাধ্যমে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু রাজ্যের সহযোগিতা না থাকায় কাজের গতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।’ কৃষকদের প্রসঙ্গেও তিনি সরব হন। মোদী বলেন, ‘ধানচাষীদের জন্য ৩১০০ টাকা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পিএম কিষাণ সম্মাননিধির অর্থও বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, কৃষকদের শোষণ বন্ধ করতে এবং বাজারে সিন্ডিকেট প্রথা দূর করতে বিজেপি উদ্যোগ নেবে। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি নিয়েও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর কথায়, ‘পিএম সূর্যঘর মুক্ত বিজলি যোজনার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।’ তিনি অভিযোগ করেন, এই ধরনের প্রকল্প বাংলায় কার্যকর করতে রাজ্য সরকার বাধা দিচ্ছে।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের নেতারা নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে, সাধারণ মানুষের সমস্যার দিকে নজর নেই।’ তাঁর কথায়, ‘ছোট ঘর তৈরি করতে হলেও সিন্ডিকেটের উপর নির্ভর করতে হয়, অথচ পরিষেবা সঠিকভাবে মেলে না।’ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। মোদীর বক্তব্য, ‘ভাল স্কুলের সুযোগ থেকে অনেকেই বঞ্চিত। দেশের অন্যান্য জায়গায় একলব্য মডেল স্কুল বা পিএম শ্রী স্কুল গড়ে উঠছে, কিন্তু বাংলায় সেই অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।’ তিনি জনজাতি এলাকাগুলিতে উন্নয়নের অভাবের কথাও তুলে ধরেন। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে শাস্ত্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সাঁওতালি ভাষায় সংবিধানের সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।’ এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে বিজেপি বাংলার ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সভা শেষের দিকে আবারও ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানান মোদী। তাঁর কথায়, ‘পরিবর্তনের সময় এসেছে। বিজেপিকে সুযোগ দিন, উন্নয়নের পথ খুলবে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘৪ মের পরে বাংলায় বিজেপি সরকার গঠিত হবে।’ উল্লেখ্য, ঝাড়গ্রামের এই সভা রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় এই ধরনের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। এখন নজর ভোটের ফলাফলের দিকে, যেখানে এই প্রচারের প্রভাব কতটা পড়ে, সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Sanand Speech | সাণন্দে সেমিকন্ডাক্টর যুগের সূচনা: ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ থেকে বৈশ্বিক বাজারে ভারতের শক্ত অবস্থান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বড় বার্তা




