শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় সংস্কৃতিতে মন্দির শুধু উপাসনার স্থান নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত মন্দিরে গিয়ে দেব-দেবীর দর্শন করেন। কিন্তু অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, দর্শনের পর অধিকাংশ মানুষ মন্দিরের চারপাশে এক বা একাধিকবার ঘুরে আসেন। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘পরিক্রমা’ (Parikrama)। বহু মানুষের কাছে এটি একটি প্রচলিত রীতি হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ধারণা, পৌরাণিক কাহিনি এবং কিছু বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিও।
‘পরিক্রমা’ শব্দটির অর্থ হল কোনও পবিত্র কেন্দ্র বা দেবমূর্তিকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করা। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, এই প্রদক্ষিণ সর্বদা ডান দিক ঘেঁষে, অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকেই করা হয়। এর পেছনে বিশ্বাস, ভগবানকে নিজের ডান পাশে রেখে চলা শুভ এবং তা ভক্তির এক বিশেষ প্রকাশ। এই প্রথা শুধুমাত্র ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হল ভগবান শিব (Lord Shiva) ও দেবী পার্বতী (Goddess Parvati)-এর দুই পুত্র গণেশ (Lord Ganesha) ও কার্তিকেয় (Lord Kartikeya)-এর গল্প। একটি প্রতিযোগিতায় তাঁদের বলা হয়েছিল, যে প্রথমে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড প্রদক্ষিণ করে ফিরবে, তাকেই শ্রেষ্ঠ ধরা হবে। কার্তিকেয় তাঁর বাহন ময়ূরে চড়ে দ্রুত যাত্রা শুরু করেন। অন্যদিকে, গণেশ তাঁর পিতা-মাতাকেই সমগ্র সৃষ্টির প্রতীক মনে করে তাঁদের চারপাশে পরিক্রমা করেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মা-বাবাই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড।’ এই ভাবনায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ও পার্বতী গণেশকেই বিজয়ী ঘোষণা করেন। এই কাহিনি পরিক্রমার গুরুত্বকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়, যেখানে ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং উপলব্ধির গুরুত্ব ফুটে ওঠে। উল্লেখ্য যে, মন্দিরে পরিক্রমা করার সময় ভক্তরা সাধারণত গর্ভগৃহকে (Sanctum Sanctorum) কেন্দ্র করে ঘোরেন। অনেকের বিশ্বাস, এই কেন্দ্রস্থলে এক ধরনের ইতিবাচক শক্তির উপস্থিতি থাকে। সেই শক্তির চারপাশে ঘুরলে ভক্তরা মানসিকভাবে স্থিরতা পান এবং এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি মনোসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।
ধর্মীয় অনুশাসনে পরিক্রমাকে পূজার একটি পূর্ণাঙ্গ অংশ হিসেবে দেখা হয়। অনেকেই মনে করেন, শুধুমাত্র দেবদর্শন নয়, তার সঙ্গে পরিক্রমা যুক্ত হলে তবেই পূজা সম্পূর্ণ হয়। এই বিশ্বাসের ফলে ভক্তরা নিয়মিত এই প্রথা অনুসরণ করেন। এছাড়াও, পরিক্রমার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকও রয়েছে। মন্দির চত্বরে একসঙ্গে অনেক মানুষ এই প্রথা পালন করেন, যা এক ধরনের সমষ্টিগত অনুভূতির জন্ম দেয়। এতে সমাজে ধর্মীয় ঐক্য এবং পারস্পরিক সংযোগও গড়ে ওঠে। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি একটি হালকা শারীরিক ব্যায়াম হিসেবেও কাজ করে। মন্দিরের চারপাশে হাঁটা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে এবং মনকে শান্ত রাখতেও সাহায্য করে। যদিও এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে, তবুও এটি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য।
বর্তমান সময়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের প্রথার প্রয়োজনীয়তা কতটা! তবে ধর্মীয় অনুশীলনের ক্ষেত্রে বিশ্বাস একটি বড় ভূমিকা পালন করে। যারা এই প্রথা মেনে চলেন, তাঁদের কাছে পরিক্রমা আত্মিক সংযোগের একটি মাধ্যম। পরিক্রমা ঘিরে এই বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে শুধুমাত্র অন্ধ বিশ্বাস নয়, নানা স্তরের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকে। মন্দিরে গিয়ে দেবদর্শনের পর পরিক্রমা করা তাই বহু মানুষের কাছে এক গভীর অভ্যাস, যা তাঁদের মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক তৃপ্তির সঙ্গে যুক্ত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : tulsi plant astrology rules | শুকনো তুলসীগাছ কীভাবে বিসর্জন দেবেন? শাস্ত্র মতে না মানলে রুষ্ট হতে পারেন শ্রীবিষ্ণু




