সম্পাদকীয়
এই সময় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি বা রাজনীতি নয় চিন্তার স্বাধীনতা হোক। প্রশ্ন করাকে আজও অনেকেই ভয় পায়। কারণ প্রশ্নই ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেয়।

ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইতিহাস আমাদের জীবনে নতুন নয়। কিন্তু তা মেনে নেওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। সমাজ তখনই এগোয় যেতে পারে। যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে। আজ সকলের সকলকে প্রয়োজন। বিরোধ বা শত্রু হয়ে লড়াই কেনো! সহমর্মিতার প্রয়োজন । আমরা যদি মানুষকে আগে রাখি তাহলে ধর্ম, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি সবই তার স্বাভাবিক জায়গা খুঁজে নেবে। ধর্ম কোন বিষয় না হয়ে মানবতাই হোক আমাদের মূল ভিত্তি।🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
শিব বলেছেন— যাঁরা কৃষ্ণনাম গান করেন, কৃষ্ণের সেবা করেন, তাঁরা পরম অব্যয় বাসুদেবের স্থানে গমন করে থাকেন।

ভুলে যাই, অন্যমনস্ক হয়ে যাই, তার উপায় কি?
তার উপায়ও নাম। নামসঙ্কীর্ত্তন কর্। নাম তোকে নাম স্মরণ করিয়ে দেবে। নাম তোকে সমনস্ক করে আনন্দ দিতে দিতে আমার কাছে নিয়ে আসবে। নামে যে মানুষ পরমানন্দময় আমাকে লাভ করে, তা নামকারী সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করে থাকে। নাম করতে করতে সমস্ত মন-প্রাণ আনন্দে ভরে যায়, শরীর কম্পিত হতে থাকে, কখন নৃত্য করে, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে সাড়ে তিনকোটি লোমও নৃত্য করতে থাকে। তারা নৃত্য করতে করতে বায়ুকে লয় করে দেয়। বাহাত্তর কোটি, বাহাত্তর লক্ষ, দশ হাজার দুশো এক শিরায় নামের প্রবাহ ছুটতে থাকে। প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান, উদান আপন কার্য্য ত্যাগ করে নামে মিলিত হয়ে যায়। প্রাণ মনকে সঙ্গে নিয়ে পরম আনন্দ পারাবারে নিমজ্জিত হয়। জ্যোতিপ্রবাহ অন্তরে বাহিরে খেলা করতে থাকে। কত বেণু, বীণা মুরজ আদির প্রাণমন বিমোহনকারী ধ্বনি সকল ভেসে আসে। নামকারীর চতুর্দ্দিকে আনন্দের প্রাচীর উঠে। নামকারী আনন্দসাগরে ডুবে যায়।
নাম কর্। কেবল নাম কর্। কোন সাধনা, তপস্যা, যোগ-যাগ, ধ্যান-ধারণা কিছু করতে হবে না। কেবলমাত্র নাম অবলম্বন করে থাক্— আমি তোকে বুকে করে আমার আনন্দময় ধামে নিয়ে যাবো। তুই কিছুর জন্য চিন্তা করিস্ না। তোর যা চাই না চাই, তোর কখন কি প্রয়োজন— সে ব্যবস্থা আমি করবো। আমি তোর আছি— তুই নাম কর্ নাম কর্। আমি তোর আছি— আমি তোর আছি— আমি তোর আছি।
শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
🍂ফিরে পড়া
যুবকটি পুত্রের দেহ ছুঁইয়া বসিয়া রহিল। তখন বৃষ্টি পড়িতেছে। চিতা যে জ্বলিবে না। পরদিন সকালে, শিশুটির চিতা তখন নিবিয়া আসিতেছে। বদন হারু কে একটা টাকা ও কয়েক আনা পয়সা দিয়া বলিল,-“ জলদি গিয়ে চাল নিয়ে আয়। চিতা নিবে যাওয়ার আগে ফিরবি। তা না হলে আবার জ্বালানি কাঠ লাগবে”। মৃতের পিতা ইহা শুনিয়া বদনের দিকে চাহিয়া রহিল।
ডোমের চিতা
রমেশ চন্দ্র সেন
ধূ ধূ করে প্রকাণ্ড বিল। চারিদিকে জল আর জল। জলের বুকে কচুরিপানার গাদার মধ্যে মাঝে মাঝে রক্তশাপলা ও রক্ত-কমল। নানা রকম ঘাসের বুকে বিচিত্র রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটিয়াছে। কোনোটা নীল কোনোটা বেগুনী, কোনোটা বা ধবধবে সাদা। উপরে পাখির দল উড়িতেছে – আকাশের গভীর নীলিমার বুকে একটা সুর জাগাইয়া। সমুদ্রের মধ্যে লাইটহাউসের মতো মাঝে মাঝে দুই একটা বাড়ি দেখা যায়।
এই জলরাশির মাঝখানটায় শুষ্ক প্রাণহীন মাদারের ভিটা যেন প্রকৃতির একটা অনিয়ম! ভিটার উপর পাতাহীন মৃতপ্রায় গাছগুলি বিকলাঙ্গ কুষ্ঠীর মতো দাঁড়াইয়া আছে। এখানে ওখানে ছড়ান রহিয়াছে কয়লা, অর্ধদদ্ধ অস্থি ও মানুষের মাথার খুলি।
এই ভিটায় দুটি ডোম থাকে হারু ও বদন। দুজনেই প্রৌঢ়, স্বাস্থ্যবান, কালো মিশমিশে তাদের গায়ের রং। হারুর মাথায় ছিল একটা বাবরি। বদনের চুল কদমফুলের মতো চারদিকে সমানভাবে ছাঁটা।
মাদারের ভিটা এই অঞ্চলের শ্মশান। দুধারে দশমাইল দূর হইতেও মড়া পোড়াইতে সকলে এখানে আসে। তাই হারু ও বদন সবারই পরিচিত। কোথায় তাদের বাড়ি ঘর কোথা হইতে তারা আসিয়াছে কেহ জানে না; যমদূতের মতো আকাশ হইতে তারা এই শ্মশানের বুকে আবিভূর্ত হইয়াছিল মড়ার–কাঠ জোগাইবার জন্যে। আজ বিশ বৎসর তাদের এই অধিকারে কেহ হস্তক্ষেপ করে নাই। তারাও বিলের মধ্যে পোড়ো ভিটা হইতে গাছ কাটিয়া আনিয়া মৃতদের সৎকারের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে।
কাঠ বেচিয়া, মাছ ধরিয়া, মৃতের উদ্দেশে প্রদত্ত চাল, ডাল, ফল-ফলারি সিদ্ধ করিয়া তারা উদরান্নের সংস্থান করে। প্রায়ই উনান ধরাতে হয় না। চিতার উপর হাঁড়ি চড়াইয়া দেয় বা রুটি সেঁকিয়া লয়। তপ্ত অঙ্গার হাতে তুলিয়া কলিকায় তামাক সাজে।
মাদারের ভিটায় একটি কুঁড়ে বাঁধিয়া তারা থাকে। সমাজ সংসার সবই তাদের পরস্পরকে লইয়া। বাহিরের জগৎ এই ডোম দুটির কাছে অর্থহীন। জীবিত মানুষের কন্ঠস্বর অপেক্ষা মৃতদেহই যেন প্রাণবন্ত। তারাই তাদের জীবিকা। পরস্পরের সঙ্গেও তারা বড় একটা কথা বলে না, হাসে আরও কম। কোন্ মৃতদেহ কিরূপে পুড়িল, কোনটার হাড় কতখানি শক্ত এইই তাদের আলোচ্য বিষয়। মৃতদেহের অস্বাভাবিকতা মধ্যে মধ্যে তাদের হাসির উদ্রেক করে বটে কিন্তু সে হাসি হিংস্র জানোয়ারের ক্রুদ্ধ গর্জনের মত বিকট। তাই এই অঞ্চলে তাদের নামে নানা বিভৎস গল্প চলিয়া আসিতেছে।
হারুর চিতায় বদনের চাল চড়িল। বদন একদৃষ্টে হাঁড়ির দিকে চাহিয়া রইল। হাঁড়ির ভিতর চালের সঙ্গেই গোটা দুই মাছ সিদ্ধ হইতেছিল। ফুটন্ত ভাতের টগবগানি, চিতার চড়্,-চড়াৎ চড় শব্দ – তাছাড়া সবই নিস্তব্ধ।
হারু ও বদনের দুর্ভাগ্য ক্রমে আজ দুদিন পর্যন্ত কোনও মড়া আসে নাই। হাঁড়িতেও চাল ছিল না। চাল কিনিতে যাইতে হইবে প্রায় এক ক্রোশ দূরে। সমস্ত দিনটা মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছিল। তারা চাল কিনিতে যায় নাই। শুকনা ছোলা চিবাইয়া দিনটা কাটাইয়া দিয়াছে। সন্ধ্যার সময় বদন বলিল, যে কটা পয়সা আছে দু’সেরের বেশি চাল হবে না। তাতে একবেলা চলবে। তারপর ? হারু বলিল, জুটে যাবে’খন।
বদন শূকরের মতো অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিল, ছাই, এ রাজ্যে দুদিনের মধ্যে এক বেটাও মরল না। মানুষগুলো দিন দিন যেন অমর হয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ গর্জিয়া উঠিল, কড়…কড়াৎ…কড়। হারু বলিল, “কাল সকালে যা হয় করব। আজ এখন শোয়া যাক”। ঘুম তাদের হইল না। কিন্তু বিধাতা প্রার্থনা শুনিলেন। মধ্য রাত্রে একজন যুবক আসিয়া ডাকিল, “হারু, বদন”। কোলে তার একটি মৃত শিশু। নিজের স্নেহ পুত্তলি পুত্রকে সে একাই পোড়াতে আসিয়াছিল। লোকটি জাতিতে পদ্মরাজ। পাঁচ মাইলের মধ্যে আর পদ্মরাজ নাই। কাছে, জেলে, কোচ, ভুঁইমালী আছে বটে কিন্তু তারা পদ্মরাজের মরা ছুইবে না। তাই সে একাই নৌকো বাহিয়া আসিয়াছিল পুত্রের প্রতি শেষ কর্তব্য সম্পাদন করিতে।
তার ডাক শুনিয়া বদন বলিল, এত রাত্তিরে মড়া পুড়াতে বেশি দাম লাগিবে। যুবকের কাছে একটি মাত্র টাকা ছিল। সে বলিল, বড়ো গরীব আমি, এই একটি টাকা আছে।
বদন বলিল, এক টাকায় আর মড়া পোড়ে না।
যুবকটি অনেক কাকুতি মিনতি করিয়াও তাকে রাজী করাইতে পারিল না। বদন বলিল, একটি মড়া পোড়াবার মতো কাঠ আছে বটে। কিন্তু এক টাকায় তোমায় সেই কাঠ বেচলে তারপর যদি কেউ আসে, তখন যে ভিটের গাছ কাটতে হবে।
নিরুপায়ে দীর্ঘ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া যুবকটি বলিল,তবে ছেলেটাকে জলেই ফেলে দিতে হবে দেখছি। শকুন কাছিমে ঠুকরে খাবে। এমন অদৃষ্ট করেছিলাম বলিয়াই সে হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। হারু বদন কে বলিল, দে ভাই, অমন করে কাঁদছে।
বদন তাকে কষিয়া ধমক দিল, বলিল, আরে না মরলে আমাদের কাছে কেউ আসে না। মড়ার দুখ্খু দেখে গললে চলবে কেন? হারু আরও দু’একবার বলিল। বদন কিছুতেই সম্মত হইল না। কিন্তু যখন দেখিল যে যুবকটি সত্যই শব লইয়া যাইতেছে তখন ভাবিল, লোকটিকে হাত ছাড়া করা উচিত নয়। এক টাকায় যাহাই হোক অন্তত আর কয়েক বেলা চালের সংস্থান হইবে। সে শেষটায় বলিল, আচ্ছা-কাঠ দিচ্ছি, দুদিন পরে দামটা দিয়ে যেও কিন্তু।
যুবকটি বলিল,- দুদিনের মধ্যে পারব না। সাতদিন সময় দাও। ছেলের ঋণ আমি রাখব না।
বদন বলিল,-আচ্ছা, পাঁচদিনের মধ্যে দিয়ে যেও।
যুবকটি পুত্রের দেহ ছুঁইয়া বসিয়া রহিল। তখন বৃষ্টি পড়িতেছে। চিতা যে জ্বলিবে না। পরদিন সকালে, শিশুটির চিতা তখন নিবিয়া আসিতেছে। বদন হারু কে একটা টাকা ও কয়েক আনা পয়সা দিয়া বলিল,-“ জলদি গিয়ে চাল নিয়ে আয়। চিতা নিবে যাওয়ার আগে ফিরবি। তা না হলে আবার জ্বালানি কাঠ লাগবে”। মৃতের পিতা ইহা শুনিয়া বদনের দিকে চাহিয়া রহিল।
চিতা নিবিয়া গেল, হারু আর ফিরিল না। বেলা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে বদনের ক্ষুধা বাড়িতে লাগিল। সে হারুর উদ্দেশে গালি পাড়িতে আরম্ভ করিল।
চারিদিকে অসীম জলরাশির মধ্যে বদন একা বসিয়া আছে। ডিঙিখানা হারু লইয়া গিয়াছিল। সে না ফিরিলে বদনের এক পা নড়িবার সামর্থ্য নাই। আগের দিনে সে উপবাসী ছিল। তার আগেও কদিন পেট ভরিয়া খাইতে পায় নাই। হারু না ফিরিলে আরও কতকাল যে না খাইয়া থাকতে হইবে, একমাত্র বিধাতাই জানেন। সকাল হইতে বৃষ্টি পড়িতেছে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, দু একটা কাকের ক্ক-ক্ক ভিন্ন আর কিছু শোনা যায় না। পিঞ্জরাবদ্ধ ক্ষুধিত হিংস্র পশুর মতো বদন মধ্যে মধ্যে নিস্ফলা গর্জন করিতে থাকে।
দুপুরের পর বৃষ্টি একটু কমিলে সে একটা ন্যাড়া গাছের উপর উঠিয়া চারিদিকে চাহিল। একটি জেলে বিলের মধ্যে নৌকোয় বসিয়া মাছ ধরিতেছে। আরও দূরে দেখা যায় কয়েকখানা বেদের নৌকো। বদন এদিক ওদিক চাহিয়া তাদের ডিঙিখানা দেখতে পায় না। তখন সে গলা ছাড়িয়া ডাকে, হা-রু।
সেই স্বরে ভীত হইয়া পাশের গাছ হইতে একটি কাক উড়িয়া যায়, ছানাগুলি চীৎকার করিতে থাকে, চিঁ-চিঁ।
বৈকালের দিকে বদন খুব দর্বল বোধ করিল। প্রত্যহ দু’সের ভাত খাওয়া তার অভ্যাস। দুদিন পেটে কিছু না পড়ায় সে একেবারেই ভাঙিয়া পড়িল। হারুর উপর তার রাগও কমিয়া গেল। ভয় হল হারুর কিছু হইয়াছে। কিন্তু নিজে সে নিরুপায়, খোঁজ করিবার সাধ্য তার নাই।
বৈকালে ভিটার পূর্বপ্রান্তে যাইয়া সে ডাকিল, হা-রু-উ। বাতাসের বুকে সে শব্দ মিশিয়া গেল। বদন তারপর গেল দক্ষিণ দিকে, সেখানে গিয়ে কানে হাত দিয়ে আরও উঁচু গলায় ডাকিল হা-রু-উ। এবার জবাব আসিল। দূর হইতে একটা শকূনি চীৎকার করিয়া উঠিল কর্-র-র-র-। বদন তার উদ্দেশে কুৎসিত গালি পাড়িল।
পরদিন প্রাতে একদল ভদ্রলোক আসিলেন একটি স্ত্রীলোকের শব লইয়া। বদনের তখন একখানাও কাঠ নাই। সে বলিল, তোমার নৌকাখানা একবার দাও তো কাঠ আনতে হবে।
সে তাঁদের কাছে হারুর কথা জিজ্ঞাসা করিল। তাঁহারা কোন জবাব দিতে পারিলেন না।
ঘন্টাখানেক পরে শবযাত্রীরা দেখিলেন, তাঁদের নৌকার সঙ্গে একটি ডিঙি বাঁধিয়া বদন ফিরিতেছে। কাঠ সে আনে নাই কিন্তু সে ফিরিয়াছে ডিঙির উপর একটি শব লইয়া।
বদন হারুর নীল বর্ণ ফুলা মৃতদেহটি ভিটার উপর তুলিল। একটি ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় পেলে?
বদন বলিল, পাতিয়ার বিলে। সাপে ওর হাত কামড়ে দিয়েছে। ডিঙির মধ্যে সের দশেক লাল মোটা চাল এবং কয়েকটা কই মাছ ছিল। কই মাছগুলি হারুর দেহের দুচার জায়গা খাইয়া ফেলিয়াছে, পাখিতে ঠোকরাইয়া শবটিকে ক্ষত বিক্ষত করিয়াছে।
বদন চাল ও মাছগুলি তুলিয়া কুড়াল লইয়া অগত্যা ভিটার একটি মরা গাছ কাটিয়া ফেলিল। কাটিতে সময় বেশী লাগিল না। ভদ্রলোকের প্রশ্নে সে হাঁ হাঁ করিয়া সংক্ষেপে জবাব দিল। স্ত্রীলোকটির শব সৎকার করিয়া ভদ্রলোকেরা চলে গেলেন। যাবার সময় একজন বলিলেন, থানায় খবর দাও, বদন বলিল, কাকে চিলেই যথেষ্ট ঠুকরেছে। আর দরকার কি?
তারা চলিয়া গেলে বদন ভালো করিয়া একটা চিতা সাজাইল। তারপর যত্নের সহিত হারুর শবটি চিতার উপর তুলিয়া দিল। চিতার ধোঁয়া সাপের মতো কুণ্ডলী পাকাইয়া আকাশে উঠিতে লাগিল। বর্ণে তার একটি নীল আভা। দীর্ঘ বিশ বৎসর ধরিয়া বদন মানুষ পোড়াইয়া আসিয়াছে, কিন্তু এ ধোঁয়া জীবনে আর কখনও দেখে নাই। এই ধোঁয়ার দৃষ্টি যেন ঝাপসা হইয়া আসে। সেদিন আকাশ ছিল পরিস্কার, গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য আগুনের হল্কা ঢালিয়া দিতেছিল। হারুর চিতার ধোঁয়া সূর্যের জ্যোতিকে স্লান করিল। তারপর চিতার বুক হইতে উঠিতে লাগিল লোলজিহ্ব অগ্নিশিখা। যেন কতগুলি লাল সাপের ফণা; ক্রুদ্ধ তার গর্জন, অফুরন্ত তার হিংসাবৃত্ত।
চিতার দিকে চাহিয়া চাহিয়া বদন আপনা আপনি বলিয়া উঠিল, দূর ছাই, কিছু ভাল লাগে না। আগুনটা আবার নিবে যাবে। এর উপরই চাল চড়িয়ে দি।
হারুর চিতায় বদনের চাল চড়িল। বদন একদৃষ্টে হাঁড়ির দিকে চাহিয়া রইল। হাঁড়ির ভিতর চালের সঙ্গেই গোটা দুই মাছ সিদ্ধ হইতেছিল। ফুটন্ত ভাতের টগবগানি, চিতার চড়্,-চড়াৎ চড় শব্দ – তাছাড়া সবই নিস্তব্ধ।
ঊর্ধ্বে অনন্ত নীল আকাশ, – চারধারে সীমাহীন জলরাশি – তার মধ্যে বাতাসের তালে তালে ঘাসের পাগল নৃত্য, উচ্ছল জলের সাবলীল ভঙ্গী।
দূরে আকাশের বুকে বকের পাতি উড়িতেছে। বৈকালী সূর্য চিতার উপর ফাগের গোলা ঢালিয়া দিয়াছে। চিতার আগুন ও সূর্যের আলোয় মাদারের ভিটা একটা লাল আভা ধারণ করিল। চিতার দিকে চাহিয়া বদনের চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
২৪
তিতাস একটি মেয়ের নাম
কলেজের দিনগুলো বাইরে থেকে যতটা সরল মনে হয়, ভেতরে ততটাই স্তরবহুল। প্রতিটি দিন যেন আলাদা কোনও ঘটনার জন্য নয়, বরং মানুষের ভিতরকার সূক্ষ্ম পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনও একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে জীবন বদলায় না; বরং অদৃশ্যভাবে সরে যায়, সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলায়, উপলব্ধির পরিসর প্রসারিত হয়, এবং কোনো একদিন হঠাৎ মনে হয়, আগের অবস্থায় আর ফেরা সম্ভব নয়। তিতাস প্রথমে বিষয়টা খেয়াল করেনি। অনীকের সঙ্গে তার দেখা, কথা, সবকিছুই ছিল একেবারে স্বাভাবিক গতিতে। কলেজে নতুন পরিচয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কয়েকটি কথা, কয়েকটি হালকা প্রশ্ন, কয়েকটি ভাগ করা মুহূর্ত- এই দিয়েই সম্পর্কের সূচনা হয়। কিন্তু অনীককে ঘিরে যে অনুভূতি তৈরি হচ্ছিল, সেটি এই সাধারণ সূত্রে বাঁধা যাচ্ছিল না। প্রথম কয়েকদিন সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল এটি কেবল কণ্ঠের আকর্ষণ। গান ভালো লাগে, তাই মানুষটিও আলাদা মনে হয়। এ ধরনের আকর্ষণ ক্ষণস্থায়ী। সময় গেলে মুছে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি সহজ হয়নি, বরং জটিল হয়েছে। ক্যান্টিনে বসে তারা কথা বলছিল। চারপাশে ভিড়, কোলাহল, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ। এইসব শব্দের ভেতরেও তাদের কথোপকথন অদ্ভুতভাবে আলাদা হয়ে থাকত।
এই কথাটি বলার সময় তার নিজের কণ্ঠও বদলে গেল। কারণ এটি কেবল তথ্য নয়, ব্যক্তিগত ইতিহাস।
অনীক চুপ করে শুনছিল। তার চোখ নম্র হয়ে এল, যা তিতাস আগে দেখেনি।
এই মুহূর্ত থেকে তাদের সম্পর্কের ভেতর একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হল।
“তুমি গান শিখেছ কোথায়?”
“শিখিনি। শুনেছি।”
এই উত্তর তিতাসকে থামিয়ে দিয়েছিল। কারণ এটি কেবল তথ্য নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি। শেখার চেয়ে শোনার গুরুত্ব। বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে গ্রহণ।
“বাড়িতে কেউ গায়?”
অনীক একটু থেমে বলল, “মা গাইত।”
এই ‘গাইত’ শব্দটি তিতাসকে অস্বস্তিতে ফেলল। কারণ এতে ছিল অসম্পূর্ণতা। যেন একটি প্রক্রিয়া থেমে গিয়েছে, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে থামানো হয়েছে। সে জিজ্ঞেস করতে পারত, “এখন গায় না কেন?”
কিন্তু জিজ্ঞেস করল না। কারণ তার মনে হয়েছিল, কিছু প্রশ্ন করা যায় না। কিছু নীরবতা অক্ষত রাখা প্রয়োজন। এই প্রথম তিতাস বুঝল, অনীক কেবল একজন গায়ক নয়। তার ভিতরে এমন কিছু স্তর আছে, যা সহজে প্রকাশিত হয় না।
সেদিন সাহিত্যচর্চা ক্লাবের অনুষ্ঠান ছিল। ছোট্ট ঘর, কম আলো, অল্প মানুষ। দেয়ালে টাঙানো পোস্টারগুলো সময়ের সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে গেছে। কয়েকজন শিক্ষক কোণে বসে কথা বলছিলেন। তাদের কথার ভঙ্গি ধীর, পরিমিত।
তিতাস সেদিকে বিশেষ মন দেয়নি প্রথমে। কিন্তু একটি নাম শুনে থেমে গেল।
“সোমদত্তা ম্যাডাম…” শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভিতরে যেন বহুদিন বন্ধ থাকা একটি দরজা খুলে গেল। স্কুলের দিনগুলো। ক্লাসরুমের কাঠের বেঞ্চ। ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষিকা।
সোমা ম্যাডাম!
তিনি অন্যরকম মানুষ। অন্য ধাতুতে গড়া। শুধু পড়াতেন না! প্রশ্ন করতেন। এবং সেই প্রশ্নের উত্তর সবসময় বইয়ে পাওয়া যেত না।
“এই লাইনের ভেতর তুমি কী দেখছ?” এই প্রশ্নের সামনে ছাত্রছাত্রীরা চুপ করে থাকত। কারণ এটি জ্ঞানের প্রশ্ন নয়, অনুভূতির।
তিতাস সেই সময় খুব বেশি কথা বলত না। নিজের অনুভূতি প্রকাশে তার অস্বস্তি ছিল। কিন্তু সোমা ম্যাডাম তাকে ধীরে ধীরে শিখিয়েছিলেন, অনুভূতি লুকিয়ে রাখলে তা স্পষ্ট হয় না, বরং বিকৃত হয়।
একদিন তিনি বলেছিলেন, “ভয়কে লুকিও না। ভাষা দাও।” এই বাক্যটি তিতাসের ভিতরে স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিল।
আজ হঠাৎ সেই নাম শুনে তার মনে হল, অতীত কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। তা অন্য কোনও পথে ফিরে আসে- “সোমদত্তা ম্যাডামের ছেলে নাকি এখন এই কলেজেই…”
“নাম কী যেন… অনীক…”
এই দু’টি বাক্য যেন তিতাসের মাথার ভেতর সংঘর্ষ সৃষ্টি করল। অনীক। এই নামটি এখন তার কাছে নতুন নয়।
কিন্তু এই নামের সঙ্গে সোমদত্তা জুড়ে যাওয়ায় সম্পর্কের অর্থ বদলে গেল।
পরদিন ক্যাম্পাসে এসে সে সরাসরি প্রশ্ন করল। “তোমার পুরো নাম কী?”
“অনীক সেন।”
“তোমার মায়ের নাম?”
এই প্রশ্নটি হঠাৎ। প্রাসঙ্গিক নয়। তবু প্রয়োজনীয়। অনীক একটু থেমে বলল, “সোমদত্তা সেন।”
শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিতাসের মনে আর কোনও সন্দেহ রইল না-
“সোমদত্তা… সোমা ম্যাডাম?”
অনীকের চোখে কৌতূহল, “তুমি চেনো?”
“তিনি আমার স্কুলের শিক্ষিকা, তাঁর কাছে শুধু বাংলা শিখিনি, জীবনও শিখেছি।”
এই বাক্যটির মধ্যে কেবল পরিচয়ই নেই, রয়েছে একটি সম্পর্কের সূত্র।
অনীক একটু এগিয়ে বসল, “সত্যি?”
তিতাস মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। তিনি আমাকে প্রথম লিখতে সাহস দিয়েছিলেন।”
এই কথাটি বলার সময় তার নিজের কণ্ঠও বদলে গেল। কারণ এটি কেবল তথ্য নয়, ব্যক্তিগত ইতিহাস।
অনীক চুপ করে শুনছিল। তার চোখ নম্র হয়ে এল, যা তিতাস আগে দেখেনি।
এই মুহূর্ত থেকে তাদের সম্পর্কের ভেতর একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হল।
আগে তারা দু’জন আলাদা ব্যক্তি ছিল, এখন তারা একটি তৃতীয় বিন্দুর মাধ্যমে যুক্ত। সেই বিন্দু, সোমদত্তা।
এই সংযোগের ভেতর অদ্ভুত এক জটিলতা আছে। কারণ এখানে সময় সরলরেখায় চলছে না। তিতাসের কাছে সোমদত্তা অতীত। অনীকের কাছে বর্তমান।
এই দুই সময়ের সংযোগ ঘটছে তাদের কথোপকথনের মধ্যে।
তিতাস হঠাৎ অনুভব করল, অনীকের গলার বিষাদ, তার কথার ভঙ্গি, তার নির্লিপ্ততা, সবকিছুর মধ্যে কোথাও যেন সোমা ম্যাডামের ছায়া আছে। এটি কি কেবল জেনেটিক উত্তরাধিকার? নাকি দীর্ঘ সহাবস্থানের প্রভাব?
নাকি তিতাস নিজেই এই মিল তৈরি করছে? সে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছিল, অনীকের প্রতি তার আকর্ষণ এখন আর কেবল বর্তমানের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে অতীতের আবেগ, স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা। এই মিশ্রণটিই তাকে অস্থির করে তুলছিল। কিছুক্ষণ তারা চুপ করে বসে রইল। শিরিষ গাছের পাতা নড়ছিল হালকা বাতাসে। দূরে কয়েকজন কথা বলছিল। কেউ হাঁটছিল, কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
এই সমস্ত দৃশ্য স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের মধ্যে যে নীরবতা তৈরি হয়েছিল, তা স্বাভাবিক ছিল না।
তিতাস বলল, “তোমার গলায় যে বিষাদ শুনি… এখন বুঝতে পারছি।”
অনীক তাকাল। “কী বুঝলে?”
তিতাস উত্তর দিল না। কারণ সে নিজেই নিশ্চিত নয়। বুঝতে পারা আর ব্যাখ্যা করতে পারা এক জিনিস নয়।
পরবর্তী কয়েকদিন তাদের কথাবার্তা আরও বেড়েছে।
কিন্তু সেই কথার ভেতরে একটি নতুন সচেতনতা ঢুকে গেছে। তিতাস এখন অনীকের প্রতিটি বাক্য একটু বেশি মন দিয়ে শুনছে। তার শব্দের ভেতরে কোনো ইঙ্গিত খুঁজছে। তার নীরবতার ভেতর অর্থ খুঁজছে। এই মনোযোগ অস্বস্তিকর। কারণ এটি স্বাভাবিক সম্পর্কের অংশ নয়। এটি বিশ্লেষণ। এটি অনুসন্ধান। এটি একধরনের মানসিক টানাপোড়েন।
একদিন ক্যান্টিনে বসে অনীক বলছিল, “মানুষ গান শোনে কেন জানো?”
“কেন?”
“নিজেকে অন্যভাবে শোনার জন্য।”
এই কথাটি তিতাসকে আবার থামিয়ে দিল। সে ভাবল, সোমা ম্যাডামও কি এমনই ভাবতেন? নাকি এই ভাবনাগুলো অনীক নিজের মতো করে তৈরি করেছে?
তিতাস ধীরে বলল, “তোমার মা কি এখনও লেখেন?”
“জানি না।”
“মানে?”
“সবকিছু কি জানতেই হয়?”
এই উত্তরে কোনও বিরক্তি নেই। তবু একটি স্পষ্ট সীমারেখা আছে। তিতাস বুঝল, অনীকের ভেতরে এমন একটি অঞ্চল আছে, যেখানে সে কাউকে ঢুকতে দেয় না। এবং সেই অঞ্চলেই হয়তো তার কণ্ঠের উৎস।
এই সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল দিকটি হল, এটি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধা যাচ্ছে না।
বন্ধুত্ব?
তার চেয়ে বেশি।
প্রেম?
এখনই বলা যায় না। তবে এটি নিশ্চিত, এটি সাধারণ নয়। সেদিন বিকেলে তারা আবার শিরিষ গাছের নিচে বসেছিল। আলো ধীরে নরম হচ্ছিল। তিতাস হঠাৎ বলল, “তোমার মা যদি জানতেন আমরা কথা বলি, কেমন লাগত?”
অনীক একটু হেসে বলল, “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
“ভয় না… কৌতূহল।”
“সব সম্পর্ক কি জানানো দরকার?”
এই প্রশ্নে তিতাস চুপ করে গেল। কারণ সে জানে, কিছু সম্পর্ক নিজের মধ্যেই পূর্ণ হয়।
তারা আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু এবার তাদের মধ্যে দূরত্ব আগের মতো ছিল না। কারণ এখন তারা জানে, তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ আছে। একটি নামের ভিতর দিয়ে তৈরি হওয়া সম্পর্ক।
যার গভীরতা তারা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
সন্ধ্যার আলো নেমে আসছিল। শিরিষপাতা ধীরে নড়ছিল। আর তাদের ভেতরে, নীরবে, একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গিয়েছিল, যার ভাষা এখনও সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। 🍁(ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
বিকাশ চন্দ -এর দু’টি কবিতা

বীজ বুনবো কোথায়
সমাগত সময় ছুঁয়েছে আমার সকল সত্তা যাপন কালের—-
মাত্রা ছাড়া চপলতায় ম্লান ছায়া শরীর ইচ্ছেগুলো নড়ে চড়ে
বসে অবিকল অবিন্যস্ত যন্ত্রণায় অনভিপ্রেত অনুশীলন,
ঘাপটি মেরে বসে থাকে সংঘবদ্ধ মরণ জড়িয়ে মায়ালতা।
হঠাৎ হারানোর ভয় ঘিরে থাকে প্রাত্যহিক বুঝিনা আনন্দ লহরী—
তবুও প্রতিদিন একক অভিযাত্রী ধাত্রীকাল আমার আত্মার অসুখ,
ফিরে দেখে নিসর্গ জীবন সকল চেনা ঘর সংসার শুধু কথা মাত্রায়
ভেঙে যায় জ্বলে উঠে চিতা ঘর পুড়ে যায় চেতনা চৈতন্য আমার।
রক্ত বর্ণ সকাল রোদের কাজ কোন নিষেধ মাত্রা নেই শান্ত সুর্য ভোর
ঘর গেরস্তের বউড়ী মানুষ জল ছড়াচ্ছিল সকালের শ্যামলা উঠোনে,
সে জানে তবুও কোনও বীভৎসতা কেড়ে নেবে এই সব সরল সংসার
মা হারানোর ব্যথা জানে মাটির কাঙ্গাল অঙ্কুরিত বীজ বুনবে কোথায়।

পৌষ পরবের শেষে
বর্ষা শরৎ পেরিয়ে ঘিরে থাকে জমিন জীবন অনন্ত সবুজ—-
ফসল ফলানোর প্রার্থনা বাঁধা চাষী বোউএর বুকে হৈমন্তী নাম,
ভয় ছিল তার অন্ধকারের পরেও অন্ধকার কবে যে সুন্দর সকাল
আকাশ মাটি জলের ঐকতান বোঝে কত না পাখির গান।
মরমে মরেছে বহুবার শান্তিজলে ভিজেছে শরম করম পরবের
প্রার্থনার আকাশে চাষীর প্রাণের চাঁদ কত না নিহিত কথা,
শরীর ছুঁলেই পালায় মন্দ শোক, পাখিদের সকালের ভাষা বোঝে—-
গাছের সবুজ রোদ্দুর আলো, নড়ে চড়ে পেটের ভেতর মাংসের দলা।
কোন ইচ্ছে কথারা কীযে গল্প শোনায় জল পি পি গাঙচিল জল পাখি
কালঘুম চেপে ধরলে স্বপ্নে আসে অভিমন্যু মানুষ বোনা ক্ষেতে—
সকাল শুরুর শাঁখ ঘন্টা উলুধ্বনি আজান আজন্ম প্রাণের ঠিকানা,
সহজিয়া জীবনের খুদ কুঁড়ো একই রকম পৌষ পরবের শেষে।
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

কবিতারা উঠে দাঁড়াতে চায়
তোমার অসুখের বিছানার পাশে
আমার কবিতারা বসে আছে
কোথাও যায়নি ওরা
জানালার চাঁদে হাত বাড়ায়নি ওরা
স্নেহান্ধ পিচ্ছিল কান্না চেপে
সারারাত জেগে জেগে আছে।
কী বলল ডাক্তার?
হয়তো সেরে যাবে
তিনমাস বিশ্রামে তারপর একটু একটু করে
কে দেখবে সংসার? আমরা সবাই হাওয়া খাব?
ছেলেমেয়ে আর শীতের কুয়াশার হাত ধরে
রোদের অপেক্ষা করে করে আমরা কি বিপ্লবী হব?
মৃত্যুকে পুষে পুষে রোজ বড় করি
মৃত্যু কি কোনও দিন আলো হতে পারে?
ডাক্তারের কাছে কোনও সমাধান নেই
শুধু অ্যানাস্থেসিয়া আর ডেটলের গন্ধ ঘরময়
সেলাইন চুপচাপ শরীরে ঢোকে
যন্ত্রণারা উপশম চায় আমার শব্দের কাছে
কবিতারা উঠে দাঁড়াতে চায়
সুসংবাদ এসে যদি দরজা খুলে ডাকে!
টিপু সুলতান -এর কবিতাগুচ্ছ

তুমি নেই, খেরোখাতা
বাঁচো!বেঁচে থাকো-গন্তব্য ছাড়া চুপ থাকো
ঠোঁটেরও ভয় আছে-
বেদনার অভ্যাস
যেকোনো নরম শব্দেরও সেফটিপিনে গাঁথো;
কখনো হুক খুলতে চেয়ো না,মেলতে যেয়ো না-
নতমুখ,ক্লান্তমেদ বাড়বে-কিছু বলবার আপ্ত ভাষা
কেবল নিজের ভেতর ভেঙেচুরে শেষ করো,
বলতে পারবে না যেটা-অভিপ্রায়; অথৈ বছরজুড়ে
অপেক্ষা করবে,তারপর কদিন পরেই
কেউ না কেউ চোখ তুলে নিয়ে গেছে-টের পাবে
ব্যথা কিভাবে গাছ হয়,যেনো ক্ষতলেপন শরীর-
প্রেমিকার ধানতারা গেরাম,অঘ্রাণের হৈম হাওয়া-
তারপর কোনোদিন শুনবে-তুমি নেই,খেরোখাতা;
ওহ!টিপু,আবার স্বাধীনতা
এবং ইচ্ছার প্রতি মনোযোগী হও, যেভাবে…

ঠাণ্ডা সামাজিকতা
আমার রাঙা রক্তে ঠাণ্ডা লাগে,নির্মিত হাতের তালু
কুঁচকে যায়-বলো কিভাবে ধরবো তোমাকে-
কেবল কুয়াশার দরজা টেনেছ,সম্মুখে কল্পনার রমণী
অনন্ত ঊষারে পলকা বাতাসে ধড়ফড়ায়-
ঊরুভঙ্গির অবিশ্বাস, অবৈধ কিছু চাইতে আসিনি
হা করে পড়ছি নভোনীল ফুঁসফুঁস,তোমার প্রাক্তনতা;
এবং আপেলের কাছাকাছি ছুরি রাখার মতো
তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জড়ায় সকল স্পর্ধা,আজানুপ্রেম-

ধানতারা ফুল
হলুদ রোদের বনে-ধানতারা ফুল খুঁজি
ধূসর হতে ফড়িং যেদিন গেয়েছিল
উর্বর লাঙ্গলে বেজে ওঠা চিরঞ্জীবী গান-
এই প্রান্ত হতে মাটির সানকিতে ওড়ে
মার খাওয়া রক্তময় রাষ্ট্রের ভাত-দেহ
ওহ!কবর-গোরস্থান,শ্মশানে ডেকো না প্রাণ!

আগুন আমার চোখ দু’টো পোড়াও
আহ!আগুন আমার চোখদুটো পোড়াও, অবিরাম রাশি রাশি-
তারপর দেহের ভেতরে যে হৃদপিণ্ড-জানোয়ার তাকিয়ে থাকে
তাকেও-পুড়ে পুড়ে ছটফট করুক,নড়াচড়া করলে টুটি চেপে ধরো
কোনো শিকারির হাতে খুন হওয়ার চেয়ে
আমাকে অগ্নিসলিলে ভাসিয়ে নাও,সে নিষ্ফল পূর্ণিমায় বাঁচুক

অনুভবের স্পর্শ
আমি যখন বেশী হতবিধ্বস্ত হয়ে পড়ি
তখন তোমাকে অনন্তবার স্মরণ করি
এসো দেখে যাও,বুকে সাঁতরায় জলোচ্ছ্বাস
অথচ তুমি শোনাও নিষেধের বাণী
আহ!আমার স্বপ্নকে এক কোদাল মাটি চাপা দাও

গহিন বুকে অতিথি শীত
পথের কাছে নিজের ছায়া ফেলে দেহ নিয়ে হাঁটি
পৃথিবী হাঁটে-আমি হাঁটি,এভাবে নারীর সঙ্গে প্রথম দেখা
কুয়াশার আদিত্য দেওয়ালে নেহাতি ঠোঁট,ক’টি আঙ্গুল-
হোগলা পাতার অদূরে উদলা বাতাস ওড়ে-
কার্তিকের শ্যামত্বকে লেপটানো কচুরিপানার মতো রূপ তার
আকুলতার ক্ষতস্থানে দাঁড়িয়ে জিগ্যেসা করি-
ওগো-আমাকে যদি তুমি করে বলো,চিনিতে পার
নেমে আসবে গন্ধহীন প্রেম,গহিন বুকে অতিথি শীত
বঙ্কিমকুমার বর্মন -এর একটি কবিতা

আবহমান
ভিজে যাই চুপিচুপি গাছের নীল কান্নায়। মুছে দেয় অশ্রুজল লাজুক ভোরের আলোর হাত। যথার্থ গোপন রয়েছে যে সবুজের মনখারাপ তাঁকে শ্রমের উপমহাদেশ বোঝাই। এপার ওপার জেগে ওঠা শান্ত ঘরবাড়ি ছড়িয়ে আছে সুখনিদ্রায়। ভেসে যায় কিছু নদীপথের সত্য । মোহনার পিঠে ঝুঁকে কত চেনা অচেনার আত্মীয়তার মুখ । ছুটে যায় দিকে দিকে অশ্বারোহী বর্ষার বাহিনী। বেড়ে উঠে নিঃসঙ্গে রোজ রোজ পাখির মৌলিক উদযাপন। খুঁজে ফিরি একেকটি শস্যদানার বংশপরিচয়। এই ভেবে ফিরে আসি বারেবারে পথিকের পিপাসা হয়ে। গভীরে বাজে জাহাজের দূর ভ্রমণ।
সঞ্জয় আচার্য -এর একটি কবিতা

ভঙ্গিমা
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার ডানদিক একবার বাঁদিক,
যে মুদ্রায় কর্ণভূমিতে লিপিবদ্ধ করেন ম্যাচিং দুল
তারপর দু’আঙুলের দক্ষতায় ভোরের কপালে
যে মুদ্রায় আপনি বসিয়ে দেন একটি জ্বলজ্বলে শুকতারা
আমি তাকে অক্ষরের উঠোনে আনতে পারিনা কিছুতেই।
টিকিট কাটার সময় যে ভঙ্গিতে পার্স থেকে পয়সা বের করেন আপনি
যে ভঙ্গিতে ভিখারিকে দশ টাকা ধরিয়ে দেন প্লাটফর্মে যেতে যেতে
আমি লিখতে পারি না সেই কলাকার মুহূর্ত।
যে আঙ্গিকে দগ্ধ দিনের ঘাম মোছেন আপনি ট্রেন জানলার ধারে বসে
ব্যাগ থেকে যে আঙ্গিকে বের করে আনেন মুঠোফোন
আমি লিখতে পারি না কবিতা, কপালের উপর রুমাল স্পর্শের আলো।
এসব বিভঙ্গ লিখবার জন্য সমুদ্র তোলপাড় করি
তলদেশ থেকে তুলে আনি শব্দের অমৃত কুম্ভ
অথচ কখন যে ক্ষণিক মোহ রাহুবেশে চুরি করে নিয়ে যায়
আমি ধরতে পাারি না, আমি কিছুতেই ধরতে পারি না।
আমার নগরীর বাতাসে নীরব গন্ধ ভেসে আসে
আমি কিছুতেই খুঁজে পাই না সেইসব পঙক্তির স্বরলিপি।
সুচিতা সরকার -এর একটি কবিতা

নিস্তব্ধতার ওপাড়ে
হাজার বছরের নিস্তব্ধতার হাত ছাড়িয়ে,
আজ আরেকবার খোয়ই-য়ের মুখোমুখি।
সময়ের ঘূর্ণিস্রোতে পড়ে,
অক্ষরগুলো অস্পষ্ট হয়ে এসেছে;
লেখাগুলো প্রায়, অবক্ষয়ের পথে।
দুটো কথা ভিক্ষের আশায়,
ভিখারির বেশে, ভাঙা বাটি হাতে-
মন আজ আমার চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমার শব্দ ভান্ডার যে শূন্য!
এতটা অসহায় হয়তো আগে কখনও হইনি।
চোখের কোণদুটো মাঝে মাঝেই,
চিক্ চিক্ করে উঠছে।
নোনা জলে ধীরে ধীরে,
গোটা পৃথিবী গড়ে উঠছে।
ভাগ্যিস, ওদের শব্দের প্রয়োজন পড়ে না!
তন্ময় কবিরাজ -এর একটি কবিতা

বৃষ্টি এলো
পদ্মপাতায় যে বৃষ্টির সংসার
আমি সেখানে সুখ ধার করেছি
যে বৃষ্টি অবিরাম
তার বাউলে গান ধরেছি
যে বৃষ্টি ঝাপসা
আমি সে পথের সন্ধান পেয়েছি
রাস্তা কেন শুকনো?
বৃষ্টি হলো যে কাল রাতে!
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
সুনয়নাদি
১১.
সুনয়না মনে মনে ভাবছে বৌদিকে কথাগুলো না বললেও হত কিন্তু কি করবে এছাড়া উপায় বা কী ছিল। কদিন ধরে সুনয়নার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না কেমন যেন একটা বমি বমি ভাব। ভেবেছে প্রদীপকে বলবে কিন্তু শাশুড়ি মা যেভাবে আজকাল কথা বলছেন তা নিয়ে প্রদীপকে বলাটা কী ঠিক হবে? মাটির উনুনে দু’ টুকরো কাঠ পুড়ে দিয়ে রান্নাঘরের ভেতরে গেল মশলার ঝুড়িটা নিয়ে আসতে। তখনই শুনতে পেল শাশুড়ি মাকে ওর বড় জা তৃপ্তি বলছে, জানেন ও-তো প্রদীপের কাছে আপনার নামে লাগানি ভাঙানি করছিল।
–তুমি ওঠো আমি করে নিচ্ছি।
–একবার ওই বৌদিদের বাড়ি যাওয়ার দরকার ছিল।
–তুমি অবস্থায় কাজ করবে কী করে?
–কিন্তু বৌদিদের কাজের লোক না হলে চলবে না।
–ঠিক আছে যদি তুমি একটু সুস্থ থাকো সন্ধ্যাবেলায় তোমাকে নিয়ে যাব বৌদির কাছে।
–আচ্ছা।
–ও মা খিদে পেয়েছে।
–ভাত হয়ে গেছে, এখন শুধু তরকারিটা করলেই হয়ে যায়।
–কি বলছ বড় বৌমা!
–হ্যাঁ মা, আমি নিজে কানে শুনেছি।
–হায় হায় আমার ছেলেটাকে পুরো কব্জা করে ফেলেছে গো ওই হারামজাদি।
–তা আর বলতে আমাদের প্রদীপটাকে তো ভেড়া বানিয়ে ফেলল।
–ওই হাড় জ্বালানি মাগী এসে আমার সংসারটাকে ছারখার করে দিচ্ছে। ওর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।
–হ্যাঁ মা আপনি তাই করুন পরে কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যাবে… বলতে বলতেই হঠাৎ চোখ পড়ে গেল সুনয়নার দিকে। শাশুড়ি মাকে একটু ধাক্কা দিয়ে বড় জা ফিসফিস করে বলছে,
–ওই দেখুন মা আমাদের কথাগুলো কান পেতে শুনছে।
–কই দেখি তো মাগীকে, মনে হচ্ছে আজকে চ্যালা কাঠ পিঠে ভাঙতে হবে।
–উনুনের ধারে যে কাঠটা ছিল সেটা ছুঁড়ে মারল শাশুড়ি।
সুনয়না একটু সরে যেতে কাঠটা বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে।
আবার বমি করতে ছুটল
এর মধ্যেই প্রদীপের গলা শুনতে পাওয়া গেল সুনয়না, সুনয়না সুনয়না…আ…আ… আ…
সুনয়না কথা বলতে পারছে না শরীরটা খুবই টলমল করছে।
–মা সুনয়না কোথায়?
–আমি কি করে বলব।
–কি অদ্ভুত কথা, তুমি বাড়ি ছিলে না?
–তা তুই আজকে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসলি?
–আজকে আমার কাজ হয়নি।
–এভাবে আর ক’দিন চলবে রে? এদিকে তো একটা বিয়ে করে এনেছিস কে খাওয়াবে?
–কে খাওয়াবে আবার আমি যখন বিয়ে করেছি আমিই খাওয়াব।
–কদিন কাজ করছ খাচ্ছ তো রোজ।
–দেখো মা খাওয়া নিয়ে বেশি খোঁটা দেবে না।
–তুমি কি বাংলার শেষ নবাব তোমাকে কিছু বলা যাবে না।
তারপর দেখা গেল সুনয়না কোনও রকমে হেলতে দুলতে আসছে।
–কি হয়েছে নয়ন কি হয়েছে তোমার?
মনে হচ্ছে এক্ষুনি আবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
–আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে
–মাথা ঘুরছে কেন?
পড়ে যাবার মতো অবস্থা প্রদীপ গিয়ে ওকে ধরল
চল শোবে গিয়ে।
–তুই কিরে, দেখছিস না রান্না চাপিয়েছে শোবে কিরে? রান্নাটা কে করবে?
–কে আবার করবে বৌদি আছে তো করবে ওর শরীরটা ভাল নেই।
–কেন বৌদি করবে কেন?
–শুনলেন মা শুনলেন।
–তাহলে রান্না পড়ে থাক।
–শুনলেন মা শুনলেন কি রকম কথা বলছে…
–প্রদীপ আর কোনও কথা বাড়াল না…
–আমার বমি পাচ্ছে।
–বমিও পাচ্ছে।
–চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
–জানো তো আমার মনে হচ্ছে অন্য কিছু…
–প্রদীপ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে নয়নের দিকে, যখন খুব ভালবাসার মন থাকে তখন ওকে নয়ন বলে ডাকে।
–অন্য কিছু মানে!
–তুমি বুঝতে পারছ না বলেই নয়ন প্রদীপের বুকে মুখ লুকায়।
–সত্যি
–সত্যি, সত্যি, সত্যি।
–আজ থেকে তোমার রেস্ট ।
কিন্তু নয়ন ওই কথাগুলো বলতে পারল না। উদাসী মন নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল খোলা জানালায় মুখ রেখে।
–কি হল? তুমি আমার বুকের থেকে মুখটা সরিয়ে নিলে কেন আর জানলার দিকে তাকিয়ে কী ভাবছ?
–ভাবছি আমাদের মত মেয়েদের কেউ মেনে নিতে পারে না, আমরাও যে ভাল হতে পারি!
–কে বলল তাই যদি না হতো তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতাম।
–নয়ন তাকিয়ে থাকে প্রদীপের দিকে।
বাইরে হুলস্থুল কান্ড বেঁধে যায়। শাশুড়ি তো তুলকালাম যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়।
–শোন ঘরে গিয়ে বউকে সোহাগ করা বাদ দিয়ে বউকে পাঠিয়ে দে রান্না-বান্না তো করতে হবে নাকি? তোর তো কাজকর্ম বন্ধ হতে চলেছে তো তিনটে প্রাণের খাওয়াটা আসে কোথা থেকে রে লজ্জা করে না তোদের!
নয়ন বেরিয়ে এসে উনুনের ধারে যায়। প্রদীপ বেরিয়ে এসে মাকে সাবধান করে দেয়। দেখ, মা তুমি কিন্তু অনেক অত্যাচার করো নয়নের ওপর আমি সব জেনে বুঝেও চুপ করে থাকি ।
কেন রে? ওই হারামজাদি লাগিয়েছে তোকে? হায়রে আমার পোড়া কপাল ছেলেটা ঘরে ফিরতে না ফিরতেই তার কান ভারি করছে।
–কেন কেন কর এরকম?
শোন তোর ওই হাড় জ্বালানি বউ তোকে লাগিয়েছে না রে তাই মাকে শাসন করতে এসেছিস?
দেখো মা, ওর শরীরটা খারাপ ওকে দিয়ে এত কাজ করিও না।
তাহলে কাজটা কে করবে?
প্রদীপ চুপ করে থাকে।
কীরে বল কাজটা কে করবে?
এরই মধ্যে নয়নের মেয়ে তারা এসে বলছে ও মা, ভাত হয়েছে গো, আমার না খুব খিদে পেয়েছে।
–হ্যাঁ, একটু দাঁড়া বাবা এক্ষুনি হয়ে যাবে।
–কোথায় ছিলিস রে?
–এই পাশের বাড়িতে বুড়িদের বাড়িতে গেছিলাম।
এই যে তেমনি একটা মেয়ে হয়েছে সংসারের কোন কাজে তার হাত লাগানো নেই সারাদিন টো টো করে পাড়া বেড়াচ্ছে।
এর মধ্যে মেয়েটি পাড়ার মধ্যে সকলের প্রিয় হয়ে গেছে।
–শোন প্রদীপ, তোকে একটা কথা বলি– তোরা বরং আলাদা খা তাহলে বুঝতে পারবি কত খরচ হয় সংসারে।
–হ্যাঁ।
–যদি তোমার তাই মনে হয়। তাহলে আলাদা করে দিও।
নয়ন বলে, না না আমার জন্য আলাদা হতে হবে না।
–তুমি চুপ করো নয়ন। আলাদা করে দিক আমিও দেখি কে কাজ করে?
–যা যা কাজ করে খা, তাহলে বুঝতে পারবি। তিন তিনটে প্রাণী কি করে চলে।
–চল বড় বৌমা।
–তবে রান্নাটা যেন ঠিক সময়ে হয়।
–নয়ন রান্না করতে গেল।
–তুমি ওঠো আমি করে নিচ্ছি।
–একবার ওই বৌদিদের বাড়ি যাওয়ার দরকার ছিল।
–তুমি অবস্থায় কাজ করবে কী করে?
–কিন্তু বৌদিদের কাজের লোক না হলে চলবে না।
–ঠিক আছে যদি তুমি একটু সুস্থ থাকো সন্ধ্যাবেলায় তোমাকে নিয়ে যাব বৌদির কাছে।
–আচ্ছা।
–ও মা খিদে পেয়েছে।
–ভাত হয়ে গেছে, এখন শুধু তরকারিটা করলেই হয়ে যায়।
–তুমি সর না।
–বলছি আমি ঠিক পারব রান্না করতে।
–ঠিক আছে আমি ঘরে আছি অসুবিধা হলে আমাকে ডাকবে। তারা মায়ের খেয়াল রাখিস।
–আচ্ছা।
–আর শোনো, একবার চলো, তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে নিই।
–হাতে এখন টাকা-পয়সারও দরকার আছে, কোথায় পাবে?
–ঠিক হয়ে যাবে।
–ও মা…
তাড়াতাড়ি এরকমই খিদে পেলে খিদে সহ্য করতে পারে না।
–ভাত তো হয়েছে খাবি কি দিয়ে
–ওই যাই হোক একটু সেদ্ধ ভাত দাও না…
–আজ কথায় কথায় আলু সেদ্ধ দিতেই ভুলে গেছি। একটু দাঁড়া এক্ষুনি তরকারি হয়ে যাবে এই দেখ বসিয়েছি।
–তারা এদিকে আয়।
–যা বাবা ডাকছে যা, লজ্জা কিসের…
–কিরে আমাকে তোর লজ্জা লাগে?
তারা মাথা নিচু করে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি ঘষতে লাগল।
নয়ন রান্না করতে করতে মেয়েটার কথাও ভাবতে লাগল। সত্যিই তার স্বামী কত ভাল এই মেয়েটার দায়িত্ব নিয়েছে আমার স্বামীর প্রতি কিছু কর্তব্য আছে, যাতে আমিও দু’টো পয়সা ইনকাম করে ওর হাতে দিতে পারি।
–এই নে মা, হয়ে গেছে ভাত।
–নকু, তুই খাবি?
–হ্যাঁ আমি দিদির সাথেই খাব।
–আচ্ছা বসে যা তাহলে।
ওদিকে নয়নের জা এসে চিৎকার শুরু করল, তোকে বলেছি না ওর সাথে তুই মিশবি না আবার ওকে দিদি বলছিস। কোন হিসেবে তুই ওকে দিদি বলিস!
–আমি দুটো দিদির সাথে ভাত খেয়ে নিই না মা ।
–দিদি তোর কোন গুষ্টিতে এই দিদি এসেছে রে? দিদি ফলাচ্ছিস।
নকু কোনও কিছুই বুঝতে পারে না
–আয় বলছি।
–থাক না দিদি, বাচ্চা…
–আমাদের ব্যাপারে তোমাকে নাক গলাতে হবে না তোমার কেউ সুপরামর্শ চায়নি।
–ওর খিদে পেয়েছে তো…
-আমি চাই না আমার ছেলের উপর কোনও বাজে মেয়ে ছেলের প্রভাব পড়ুক।
টানতে টানতে ছেলেটাকে নিয়ে চলে গেল। নয়ন তার জায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, কবে সে দেখতে পাবে আকাশের বুকে চিড়ে
বৃষ্টি নেমে সকলের হৃদয় থেকে সমস্ত ময়লা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে… 🍁 (ক্রমশঃ)
🍂গল্প
মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার মনে হল, এতদিনের সব শূন্যতা, সব অজানা প্রশ্ন, সবকিছুর উত্তর সে পেয়ে গিয়েছে। বিয়ের আগুন জ্বলছিল। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে মেঘলা আর অর্ণব বা ঋত্বিক শুধু একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে…
স্বপ্নবিবাহ

প্রত্যুষ মজুমদার
রাতটা অদ্ভুত। চতুর্দিকের ব্যস্ততা যেন হঠাৎ কোথাও গিয়ে থেমে গেল। জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছ বাতাসে হালকা দুলছিল, আর আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ যেন কারও অপেক্ষায়। পূর্ণিমার ঝলক পড়ছিল মেঘলার মুখে। মেঘলা ঘুমোতে পারছিল না। আজই তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাড়ি আনন্দে কলকল করছে। আত্মীয়স্বজন, গানের শব্দ, সবকিছু যেন ঠিকঠাক। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও অদ্ভুত শূন্যতা। কেন কি জানি!
বর। অর্ণব। ভাল ছেলে। চাকরি ভাল, পরিবারও ভাল। দেখতে-শুনতেও সুন্দর। সব মিলিয়ে যেন পারফেক্ট ম্যাচ। কিন্তু প্রেম? ওই অনুভূতি কোথাও নেই। মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে কোনও একটি অচেনা জায়গাতে। চারপাশে কুয়াশা, ধীর ফুলের গন্ধ। মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে। মাটিতে শালপাতা বিছানো, তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ও-এগোতে লাগল। সামনে হঠাৎ একটা মানুষ। সাদা পাঞ্জাবি, ধুতি, মুখে অদ্ভুত শান্তি। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তুমি এলে?
মানুষটি মৃদু হেসে বলল।
মেঘলা অবাক, আপনি কে?
মানুষটি একটু থামল। তারপর বলল, আমি তো তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন।
—আমি তো আপনাকে চিনি না…
লোকটা হেসে উঠল,
—সব চেনা কী মনে থাকে? কিছু চেনা থাকে শুধু মনের গভীরে।
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। তারপর সে জিজ্ঞেস করল।
—আপনার নাম কী?
—ঋত্বিক।
নামটা শুনেই যেন কোথাও একটা পরিচিত সুর বাজল। কিন্তু সে মনে করতে পারল না।
পরের ক’য়েকটা দিন, অথবা স্বপ্নে মেঘলা আর ঋত্বিক বারবার দেখা করতে লাগল। কখনও তারা নদীর ধারে বসে গল্প করে, কখনও ফুলে ভরা বাগানে হাঁটে, কখনও আবার একসঙ্গে বৃষ্টি ভেজে। প্রতিবারই মেঘলার মনে হয়, এই মানুষটাকে সে বহুদিন ধরে চেনে। তার হাসি, তার কথা বলার ভঙ্গি, এসবকিছু যেন মেঘলার নিজের। একদিন ঋত্বিক বলল,
—তুমি জানো, আমাদের বিয়ে হবে?
মেঘলা হেসে ফেলল।
—স্বপ্নে বিয়ে?
—স্বপ্নের বিয়েও তো সত্যি হতে পারে।
—কীভাবে?
ঋত্বিক তার হাতটা আলত করে ধরল,
—যদি ঈশ্বর চান তাহলে সবই সম্ভব।
মেঘলা চুপ করে রইল। তার মনে হল, এই মুহূর্তটা যেন শেষ না হয় কখনও। এরপর একদিন তারা দাঁড়িয়ে আছে সেই মন্দিরের সামনে। চারদিকে ফুলের সাজ, শঙ্খধ্বনি। মেঘলা দেখল নিজেকেই। একটি লাল বেনারসি পরে আছে। মাথায় সিঁদুরের আলপনা। আর ঋত্বিক, ঠিক তার পাশে, সাদা পাঞ্জাবিতে৷ অপূর্ব লাগছে ওঁকে। মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,
—এটা কী হচ্ছে?
—আমাদের বিয়ে।
—কিন্তু এটা তো স্বপ্ন…
ঋত্বিক মৃদু হাসল। হেসে বলল,
স্বপ্নই তো আমাদের সবচেয়ে সত্য জায়গা।
এরপর দেখল, পুরোহিত মশাই মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। আগুন জ্বলছে, ফুলের গন্ধে ভরে গিয়েছে চারপাশ। ঋত্বিক মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,
–তুমি কী আমাকে চাও?
তখনই মেঘলার চোখে জল এসে গেল। বলল,
—হ্যাঁ… আমি তোমাকেই চাই। তোমাকেই…
—তাহলে চোখ বন্ধ করো।
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
আর সেই মুহূর্তেই—
—মেঘলা! ওঠ! আজ যে তোর গায়ে হলুদ! এভাবে ঘুমায় কেউ!
মায়ের গলা শুনে মেঘলা থেকে ঘুম ভেঙে উঠল। সে চারদিকে তাকাল। নিজের ঘর, নিজের বিছানা। সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা। ও দ্রুত উঠে বসল।
ঋত্বিক? সে কি শুধুই স্বপ্ন? তার হাতটা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হারিয়ে গিয়েছে। বিয়ের দিন এগিয়ে এল। সব প্রস্তুত। বাড়ি সাজানো, সাজ, অতিথি সব.. সব কিছু যেন নিখুঁত। কিন্তু মেঘলার মন যেন এসবের ভেতর কোথাও নেই। বিয়ের মণ্ডপে বসে বারবার ভাবছিল, ঋত্বিক সত্যিই কী ছিল না? হঠাৎ পুরোহিত মশাই বললেন,
—কনে, আপনার মাথা তুলুন।
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। আর ঠিক তখনই তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বরকে দেখে সে স্তব্ধ। ঋত্বিক! একদম সেই মুখ, সেই চোখ, সেই হাসি। মেঘলার ঠোঁট কাঁপতে লাগল,
—তুমি…?
ছেলেটা মৃদু হেসে বলল,
—আমি তো বলেছিলাম, ঈশ্বর চাইলে স্বপ্ন সত্য হয়।
—কিন্তু… তুমি অর্ণব…
—হ্যাঁ, আমার নাম অর্ণব ঋত্বিক সেন। বাড়িতে সবাই আমাকে অর্ণব বলে, আর খুব কাছের মানুষরা, ঋত্বিক।
মেঘলার চোখে জল এসে গেল।
—তুমি জানলে কীভাবে?
অর্ণব একটু থামল। তারপর বলল,
—কারণ আমিও যে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। ঠিক একইভাবে।
ভালবাসা আর নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য করা, এটা মনস্তত্ত্বের একটি জটিল বিষয়। অনেক সময় মানুষ মনে করে, কাউকে ছাড়া বাঁচতে না পারা মানেই গভীর প্রেম। কিন্তু বাস্তবে সেটা হতে পারে attachment anxiety… এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা, যেখানে ভালবাসার চেয়ে ভয়টাই বড় হয়ে ওঠে।
মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার মনে হল, এতদিনের সব শূন্যতা, সব অজানা প্রশ্ন, সবকিছুর উত্তর সে পেয়ে গিয়েছে। বিয়ের আগুন জ্বলছিল। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে মেঘলা আর অর্ণব বা ঋত্বিক শুধু একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে…
মেঘলা ফিসফিস করে বলল,
—এটা কি সত্য?
—তুমি কী মনে করো?
মেঘলা হেসে ফেলল।
—এটা যদি স্বপ্নও হয়, আমি চাই না এটা শেষ হোক।
ঋত্বিক তার হাত শক্ত করে ধরল।
—এটা আর স্বপ্ন নয়। এটাই আমাদের জীবন। এটাই বন্ধন।
বিয়ে শেষ হল। সবকিছু যেন স্বাভাবিক, কিন্তু তাদের জন্য সবকিছুই নতুন। রাতে, নতুন ঘরে, মেঘলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে, ঠিক সেই স্বপ্নের মতো। ঋত্বিক পিছন থেকে এসে দাঁড়াল।
—কী ভাবছ?
মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
—ভাবছি, যদি সেদিন আমি সেই স্বপ্ন না দেখতাম?
—তাহলে আমরা হয়তো একে অপরকে চিনতেই পারতাম না।
–তুমি কি বিশ্বাস করো, এটা শুধু কাকতালীয়?
ঋত্বিক একটু ভেবে বলল,
—হয়ত না। হয়ত কিছু সম্পর্ক আগে থেকেই লেখা থাকে। আমরা শুধু সেগুলো খুঁজে পাই।
মেঘলা তার দিকে তাকাল,
—তাহলে এটা আমাদের স্বপ্নবিবাহ?
ঋত্বিক হেসে বলল,
—হ্যাঁ, আর এই স্বপ্নটায় আমরা প্রতিদিন নতুন করে বাঁচব।
বাইরে চাঁদ তখনও প্রজ্বলিত। কদম গাছটা হালকা দুলছে। কিন্তু এবার মেঘলার ভেতরে আর কোনো শূন্যতা নেই। কারণ সে জানে, সত্য স্বপ্ন কখনও ভাঙে না। কিছু স্বপ্নই হয়ে ওঠে জীবনলেখা।
বিয়ের পরের সকালটা অন্যরকম ছিল। মেঘলা যখন ঘুম থেকে উঠল, প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য সে বুঝতেই পারল না সবকিছু সত্য, না কি এখনও সেই স্বপ্নের ভেতরেই আছে! জানলা দিয়ে বাইরের আলো ঢুকছে, পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তার মন যেন কোথাও একটা অদ্ভুত কিছুতে ভরা! সে ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকাল। ঋত্বিক-অর্ণব ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে সেই চেনা শান্তি, যেটা মেঘলা প্রথম দেখেছিল স্বপ্নে। মেঘলা চুপচাপ তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, এই মানুষটাকে সে বহু জন্ম ধরে চেনে। ঋত্বিক চোখ খুলল।
—এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? সে মুচকি হেসে বলল। মেঘলা একটু লজ্জা পেল,
দেখছিলাম, তুমি সত্যি আছ কিনা।
ঋত্বিক হেসে উঠে বসে পড়ল,
—আমিও মাঝে মাঝে ভাবি, তুমি কী সত্যিই আমার পাশে আছ, না হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে…
—আমি আর কোথাও যাব না। ধীরে বলল মেঘলা। ঋত্বিক তার হাতটা ধরল,
—আমিও।
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক। ধীরে ধীরে মেঘলার জীবনের অংশ হয়ে উঠল সবই। কিন্তু একটা জিনিস বদলাল না, তার আর ঋত্বিকের সেই অদ্ভুত সংযোগ। তারা মাঝে মাঝে একই স্বপ্ন দেখত। একই নদীর ধারে হাঁটা, একই মন্দির, একই ফুলের গন্ধ বারবার ফিরে আসত।
একদিন রাতে মেঘলা হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসল। তার বুক ধড়ফড় করছে।
—ঋত্বিক… সে ফিসফিস করে ডাকল।
—কী হয়েছে?
ঋত্বিকও উঠে বসল।
—আমি আবার সেই জায়গাটা দেখলাম… কিন্তু এবার কিছু আলাদা ছিল।
—কী?
—মন্দিরটা ভাঙা… আর চারপাশে কেউ নেই। শুধু একটা শব্দ। কেউ যেন বলছে, সবকিছু চিরকাল থাকে না…
ঋত্বিক চুপ করে রইল।
তার চোখেও একটা অজানা-অচেনা ছায়া।
মেঘলা জিজ্ঞেস করল,
—তুমিও কি কিছু দেখেছ?
ঋত্বিক ধীরে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ… আমি দেখেছি, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ। আমি যতই ডাকছি, তুমি ফিরছ না।
মেঘলার গা শিউরে উঠল, এটা কেন হচ্ছে?
ঋত্বিক তার হাত শক্ত করে ধরল,
বলল,
—স্বপ্ন সব সময় সুখের হয় না। কিন্তু বাস্তবও আমাদের হাতে নয়।
কিছুদিন পর ঋত্বিকের অফিস থেকে খবর এল, তাকে অন্য শহরে ট্রান্সফার করা হচ্ছে। অনেক দূরে। দিল্লি।
—তুমি যাবে?
মেঘলা প্রশ্ন করল। ঋত্বিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—চাকরির জন্য যেতে হবে। কিন্তু আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে যাও।
মেঘলা চুপ করে রইল। এই শহর, এই বাড়ি—সবকিছু ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু ঋত্বিককে ছাড়া থাকা? সেটাও অসম্ভব।
—আমি যাব, সে ধীরে বলল।
ঋত্বিক হেসে উঠল,
—ধন্যবাদ।
দিল্লির জীবন একদম আলাদা। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন ছন্দ। প্রথমে মেঘলার একটু অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু ঋত্বিক সবসময় পাশে ছিল। তবু… স্বপ্নগুলো থামল না বরং আরও স্পষ্ট হতে লাগল। একদিন রাতে, মেঘলা আবার সেই মন্দিরে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এবার সে একা নয়। তার সামনে একজন বৃদ্ধা। সাদা শাড়ি, কাঁধে চুল, চোখে গভীরতা।
— তুমি কে? মেঘলা জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বলল,
—আমি এই গল্পের সাক্ষী।
—কোন গল্প?
—-তোমাদের গল্প।
মেঘলার বুক কেঁপে উঠল,
—আমাদের…?
—হ্যাঁ। এটা প্রথমবার নয়।
—মানে?
বৃদ্ধা বলল,
—তোমরা আগেও একে অপরকে পেয়েছিলে। এই একই মন্দিরে, এই একইভাবে। কিন্তু তখন তোমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল।
মেঘলার গা শিউরে উঠল, বলল, —কেন?
—সময়… পরিস্থিতি… আর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত।
—তাহলে এবার?
বৃদ্ধা একটু হাসল,
—এবার তোমাদের সুযোগ আছে। কিন্তু মনে রেখ, স্বপ্ন পথ দেখায়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হয় জেগে থেকে।
মেঘলার হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই উঠে বসল। তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। ঋত্বিক তখনও ঘুমোচ্ছে। সে আস্তে আস্তে তার দিকে তাকাল। আমরা আগেও কী একে অপরকে হারিয়েছিলাম? সে নিজের মনেই বলল নিজেকে। পরের দিন, মেঘলা সবকিছু ঋত্বিককে বলল, ঋত্বিক মন দিয়ে শুনল।
—তুমি কি বিশ্বাস করো? মেঘলা জিজ্ঞেস করল।
ঋত্বিক একটু ভেবে বলল,
—আমি জানি না আগের জন্ম ছিল কিনা! হয়ত অনেকেই জানেন না! কিন্তু আমি জানি, তোমাকে হারানোর কথা ভাবলেই আমার ভেতরটা ভেঙে যায়।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল। বলল,
—আমারও।
ঋত্বিক তার কপালে চুমু খেল। —তাহলে আমরা একটা জিনিস ঠিক করি।
—কী?
—যা-ই হোক না কেন, আমরা একে অপরকে ছাড়ব না। কোনও ভুল বোঝাবুঝি, কোনও দূরত্ব, কিছুই আমাদের আলাদা করতে পারবে না।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
—প্রমিস?
—প্রমিস।
দিনগুলো আবার স্বাভাবিক হতে লাগল। কিন্তু কোথাও একটা অদ্ভুত টান থেকেই গেল। কিছু যেন একটা অপেক্ষা করছে! একদিন সন্ধ্যায় মেঘলা আর ঋত্বিক ছাদে বসে ছিল। আকাশে চাঁদ উঠেছে।
—এই চাঁদটা দেখলে আমার সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। মেঘলা বলল। ঋত্বিক হেসে বলল,
—আমারও।
কিছুক্ষণের ভেতরই হঠাৎ মেঘলার ফোনে একটা কল এল। সে রিসিভ করল। কিছুক্ষণ পর তার মুখের রং পাল্টে গেল।
—কী হয়েছে?
ঋত্বিক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল। মেঘলা ধীরে বলল,
—বাবা অসুস্থ… খুবই।
ঋত্বিক উঠে দাঁড়াল।
ট্রেনের জানলার পাশে মেঘলা চুপ করে বসে ছিল। বাইরের দৃশ্যগুলো দ্রুত পাল্টাচ্ছে, কিন্তু তার মন স্থির। ঋত্বিক তার হাত ধরে আছে। ঋত্বিক বলল,
সব ঠিক হয়ে যাবে…
মেঘলা কিছু বলল না। তার মনে হচ্ছিল, এই যাত্রা শুধু বাড়ি ফেরার নয়। এর সঙ্গে কী আরও কিছু জড়িয়ে আছে? রাতে ট্রেনের দোলায় দোলায় মেঘলার চোখ লেগে এল। আর মেঘলা আবার সেই মন্দিরে। কিন্তু এবার আগুন জ্বলছে না। সব… সবকিছু অন্ধকার। দূরে ঋত্বিক দাঁড়িয়ে। ! সে ডাকছে,
—মেঘলা…
মেঘলা দৌড়ে যেতে চাইছে। কিন্তু তার পা নড়ছে না। কেউ তাকে আটকে রেখেছে? মাটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে? আর সেই একই কণ্ঠস্বর, এইবার কী বেছে নেবে তুমি?
মেঘলা হঠাৎ উঠে বসল ঘুম থেকে। ঋত্বিক তার দিকে তাকিয়ে, আবার সেই স্বপ্ন? মেঘলা মাথা নাড়ল।
—ঋত্বিক… আমাদের সামনে কিছু একটা আসছে। আমি অনুভব করতে পারছি।
ঋত্বিক তার হাত শক্ত করে ধরল, যা-ইইইই আসুক, আমরা একসঙ্গে সামলাব।…
ট্রেনটা তখন অন্ধকার রাত চিরে এগিয়ে চলেছে। আর তাদের গল্প আরও গভীর, আরও রহস্যময় পথে এগোচ্ছে।
ট্রেনটা যখন ভোরের দিকে হাওড়া স্টেশনে ঢুকল, তখন আকাশের রঙটা ছিল অদ্ভুত ধূসর। যেন আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি কোথাও আটকে আছে, ঠিক মেঘলার মনের মতো। প্ল্যাটফর্মে নামার পরেও তার ভেতরের অস্বস্তিটা কাটছিল না। শুধু বাবার অসুস্থতার জন্য নয়, আরও গভীর কিছু একটা তাকে টানছিল, এমন একটা অনুভূতি যার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু প্রভাব আছে প্রবল। প্রবলতর। ঋত্বিক ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, চলো, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
মেঘলা মাথা নাড়ল। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে সে খেয়াল করছিল, এই শহর, এই শহরের গন্ধ, এই শব্দ সে যেন আগেও অনুভব করেছে। শুধু বাস্তবে নয়, স্বপ্নেও। বাড়িতে পৌঁছ নোর পর পরিস্থিতি গুরুতর ছিল। মেঘলার বাবা হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তাররা বলছেন, অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু ঝুঁকি এখনও আছে। হাসপাতালের করিডোরে বসে মেঘলা প্রথমবার নিজেকে সম্পূর্ণ একা অনুভব করল। ঋত্বিক পাশে বসে ছিল, কিন্তু তবুও এক ধরনের অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করছিল। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, existential anxiety… অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের ভঙ্গুর অবস্থা, সময়ের সীমাবদ্ধতা,,একসঙ্গে এসে যেন তাকে আঘাত করছিল।
—তুমি চুপ করে আছো কেন? ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল। মেঘলা বলল,
—তুমি কখনও ভেবেছ, আমরা কেন এই স্বপ্নগুলো দেখি?
ঋত্বিক একটু চুপ করে রইল একটু। তারপর বলল,
—হয়ত অবচেতন মন আমাদের কিছু বলতে চায়।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ… কিন্তু যদি এগুলো শুধু মনের তৈরি না হয়?
ঋত্বিক তাকাল,
—মানে?
—মানে… যদি এগুলো আমাদের ভয়ের প্রতিফলন হয়? আমাদের হারানোর আতঙ্ক? আমাদের অতীতের কোনও অসম্পূর্ণতা?
ঋত্বিক এবার গভীরভাবে ভাবল।
সেই রাতেই মেঘলা আবার স্বপ্ন দেখল। কিন্তু এবার স্বপ্নটা অন্যরকম। সে দাঁড়িয়ে আছে সেই মন্দিরে, কিন্তু এবার সবকিছু পরিষ্কার। না কোনও কুয়াশা, না কোনও অস্পষ্টতা। বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। ঋত্বিক সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার চোখে সেই শান্তি নেই। ঋত্বিক বলল,
—তুমি এসেছো… কিন্তু তার গলায় ক্লান্তি।
—কী হচ্ছে আমাদের সঙ্গে? মেঘলা প্রশ্ন করল।
—এটা আমাদের মনের লড়াই।
—লড়াই?
—হ্যাঁ। তুমি ভয় পাচ্ছ আমাকে হারানোর। আর আমি ভয় পাচ্ছি তোমাকে ধরে রাখতে না পারার।
মেঘলা থমকে গেল।
—কিন্তু এটা তো স্বাভাবিক…
ঋত্বিক মাথা নাড়ল।
—না, যখন ভয় ভালবাসার চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন সেটা সম্পর্ককে ভেঙে দেয়।
সেখানে হঠাৎ সেই বৃদ্ধা আবার উপস্থিত। তিনি বললেন,
—তোমরা বুঝতে শুরু করেছ…
মেঘলা তার দিকে তাকাল,
এই সবকিছু কি সত্য? আগের জন্ম, এই মন্দির…সব?
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
—সত্য আর মিথ্যা, এই দুইয়ের মাঝে যে জায়গাটা, সেখানেই মানুষ সবচেয়ে বেশি থাকে। তোমাদের স্বপ্নগুলো আসলে প্রতীক।
—কিসের প্রতীক?
—তোমাদের ভয়, তোমাদের আশা, আর তোমাদের সিদ্ধান্তের।
ঋত্বিক বলল,
তাহলে আগের জন্মের গল্প?
—হয়ত ছিল, হয়ত ছিল না! কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, তোমরা এখন কী করছ!
মেঘলার মাথার ভেতর যেন একটা আলো জ্বলে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই স্বপ্নগুলো কোনও অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এগুলো তার নিজের মনের প্রতিচ্ছবি। তার অবচেতন মন বারবার তাকে দেখাচ্ছে, সে কী হারাতে ভয় পাচ্ছে, আর সেই ভয় কীভাবে তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। পরদিন সকালে, হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলল,
—ঋত্বিক, আমি একটা কথা বুঝেছি।
—কী?
—আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে এতটাই আটকে গিয়েছিলাম, যে আমি আমাদের বর্তমানটা ঠিকমতো বাঁচছিলাম না।
ঋত্বিক চুপ করে শুনছিল।
—স্বপ্নগুলো আমাকে দেখাচ্ছিল, আমি কী ভুল করছি।
ঋত্বিক বলল,
—আমিও একই জিনিস অনুভব করেছি।
—আমরা কী খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি একে অপরের ওপর?
ঋত্বিক একটু ভেবে বলল, —হয়ত। আর সেটা ভালবাসা নয়, সেটা একটা ভয়ের রূপ।
এই উপলব্ধিটা সহজ ছিল না।
ভালবাসা আর নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য করা, এটা মনস্তত্ত্বের একটি জটিল বিষয়। অনেক সময় মানুষ মনে করে, কাউকে ছাড়া বাঁচতে না পারা মানেই গভীর প্রেম। কিন্তু বাস্তবে সেটা হতে পারে attachment anxiety… এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা, যেখানে ভালবাসার চেয়ে ভয়টাই বড় হয়ে ওঠে। মেঘলা বলে,
—আমরা কী নিজেদের একটু স্পেস দিতে পারি?
ঋত্বিক তাকাল,
—মানে দূরে থাকা?
—না… মানসিকভাবে স্বাধীন হওয়া। যেন আমরা একে অপরকে ভালোবাসি, কিন্তু যেন হারানোর ভয়ে যেন না বাঁচি।
ঋত্বিক হাসল,
—এটাই তো সত্যিকারের ভালবাসা হওয়া উচিত।
কয়েকদিন পর মেঘলার বাবার অবস্থা একটু ভাল হল। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল। আর আশ্চর্যের বিষয়, স্বপ্নগুলোও থেমে গেল। না সেই মন্দির, না সেই কণ্ঠস্বর, কিছুই আর ফিরে এল না।
এক রাতে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঋত্বিক এসে পাশে দাঁড়াল।
—স্বপ্নগুলো আর আসছে না, সে বলল। মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
—কারণ হযত আমাদের আর সেগুলোর দরকার নেই।
ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল,
তুমি কী মনে করো, ওগুলো সত্যি ছিল?
মেঘলা একটু ভেবে বলল,
—সত্যি ছিল… কিন্তু বাইরের নয়, ভেতরের।
—মানে?
—আমাদের মনের সত্যি।”
ঋত্বিক তার হাত ধরল।
—তাহলে আমাদের বিয়ে?”
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওটা ছিল স্বপ্নবিবাহ… কিন্তু এখন, এটা বাস্তবের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্কটা টিকবে, যদি আমরা এটাকে সচেতনভাবে বাঁচি।
ঋত্বিক মাথা নাড়ল।
—কোনও ভয় ছাড়া?
—ভয় থাকবে, মেঘলা বলল, কিন্তু আমরা তাকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে দেব না।
আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। কিন্তু এবার সেই চাঁদ আর কোনও স্বপ্নের প্রতিরূপ নয়। এটা শুধু একটা চাঁদ : বাস্তব, স্পষ্ট, শান্ত। আর মেঘলা বুঝতে পারল, স্বপ্ন কখনও কখনও আমাদের পথ দেখায়,
কিন্তু সেই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে হয় জেগে থেকেই। আসলে ভালবাসা কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। এটা ঈশ্বরের নির্বাচন, প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। তাদের গল্পে আর কোনো মন্দির নেই,
কোনও রহস্যময় কণ্ঠস্বর নেই। শুধু আছে দু’জন মানুষ, দুজনের ভয়, দুজনের বোঝাপড়া,
আর একসঙ্গে বাঁচার ইচ্ছা। বাস্তবের দীর্ঘযাত্রা। 🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।






