সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন প্রচারের কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে উদ্যোগী বিজেপি (BJP)। ‘পরিবর্তন যাত্রা’ ও ব্রিগেড সমাবেশের পর এবার তাদের তৃতীয় বড় কর্মসূচী, নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্র প্রকাশ। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। দিল্লিতে নয়, সরাসরি কলকাতায় এসে তিনি এই ইস্তাহার প্রকাশ করবেন, এমন পরিকল্পনাই এখন দলের অন্দরে জোরাল। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচীর ঘোষণা হয়নি, তবুও বিজেপির ভাষ্যনির্মাণ বিভাগ ইতিমধ্যেই এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দলীয় সূত্রে খবর, ২৭ ও ২৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ সফরে থাকতে পারেন অমিত শাহ। তারই মধ্যে ২৮ মার্চ, শনিবার, রাজ্য নেতৃত্বের উপস্থিতিতে কলকাতায় প্রকাশ করা হবে পূর্ণাঙ্গ সঙ্কল্পপত্র।
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পিছনে রয়েছে স্পষ্ট কৌশল। ভোটের আগে ইস্তাহারকে কেন্দ্র করে জনমনে আলোড়ন তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। একদিনে ঘোষণা করে থেমে না গিয়ে, এই কর্মসূচিকে ‘ইভেন্ট’-এ পরিণত করার চেষ্টা চলছে। যাতে প্রথম দিন থেকেই প্রতিশ্রুতিগুলি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং ভোটের আগে সেই বার্তা পৌঁছে যায় রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষের কাছে। এর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘিতে ২ মার্চ ‘পরিবর্তন যাত্রা’র সূচনা করতে গিয়ে অমিত শাহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই সভা থেকেই তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে।’ পাশাপাশি তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ছ’মাসের মধ্যে সমস্ত শূন্য সরকারি পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।’ আরও একটি বড় ঘোষণা ছিল—‘যে সব সরকারি পদ বিলুপ্ত হয়েছে, সেগুলি পুনরায় চালু করা হবে এবং চাকরির আবেদনকারীদের বয়সসীমায় পাঁচ বছরের ছাড় দেওয়া হবে।’
এই ঘোষণাগুলি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিজেপির অন্দরে ধারণা তৈরি হয়েছে, অমিত শাহের মুখ থেকে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি এলে তার প্রভাব অনেক বেশি হয়। সেই কারণেই পূর্ণাঙ্গ সঙ্কল্পপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাঁকেই সামনে রাখা হচ্ছে। বিজেপির এই সঙ্কল্পপত্রে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিকাঠামো গঠন, শিল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, এই সমস্ত ক্ষেত্রেই একাধিক প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের যে সব সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এখনও পশ্চিমবঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, সেগুলিও চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতে পারে। রাজ্যের বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রকল্প নিয়েও বিজেপি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে। যেমন, তৃণমূল সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের পাল্টা হিসেবে বিজেপি ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ নিয়ে কী পরিকল্পনা করছে, তা সঙ্কল্পপত্রেই জানানো হতে পারে। একই ভাবে ‘যুবসাথী’-র মতো প্রকল্পের বিকল্প বা পরিবর্তিত রূপও তুলে ধরা হতে পারে।
এই ইস্তাহার তৈরির প্রক্রিয়াটিকেও গুরুত্ব দিয়েছে বিজেপি। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। দলীয় দফতর থেকে শুরু করে জেলা স্তরে ‘ড্রপবক্স’ বসিয়ে নাগরিকদের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, দলের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতারা বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের মতামত জেনেছেন। এই প্রসঙ্গে রাজ্য বিজেপির সঙ্কল্পপত্র কমিটির চেয়ারম্যান তাপস রায় বলেন, ‘আমরা রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মতামত সংগ্রহ করেছি। সেই সব মতামত যাচাই করে একটি শক্তিশালী সঙ্কল্পপত্র তৈরি করার চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে অমিত শাহের হাত দিয়ে এই ইস্তাহার প্রকাশিত হওয়া আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর নেতৃত্বে সেই ইস্তাহার ঘোষণার দিন সকালেই জানানো হয় এবং বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। বিজেপি সেই পদ্ধতি অনুসরণ না করে আলাদা কৌশল নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিজেপি নেতা তাপস রায় তৃণমূলের ইস্তাহারকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ অনেক সময় আগের ইস্তাহার ও বর্তমান ইস্তাহারের তুলনা করেন না। কিন্তু যদি তা করা হয়, দেখা যাবে একই প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর দাবি, নতুন সঙ্কল্পপত্রে বিজেপি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরবে। রাজনৈতিক মহলে এখন নজর ২৮ মার্চের দিকে। কারণ, এই দিন প্রকাশিত হতে চলা বিজেপির সঙ্কল্পপত্রই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে নির্বাচনী লড়াইয়ের মূল সুর। অমিত শাহের উপস্থিতি এই কর্মসূচিকে কতটা প্রভাবশালী করে তুলতে পারে, তা নিয়েও আগ্রহ তুঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে ইস্তাহার সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে, তাতে প্রতিটি পদক্ষেপই হয়ে উঠছে কৌশলের অংশ। আর সেই কৌশলের কেন্দ্রে এখন বিজেপির ‘সঙ্কল্পপত্র’ যা প্রকাশ পেতে চলেছে ‘শাহি’ উপস্থিতিতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Cooperative crop loan India | ক্ষুদ্র কৃষকদের ভরসা সমবায় ঋণ, কোটি কোটি টাকার সহায়তায় বাড়ছে উৎপাদন, সংসদে তথ্য দিলেন অমিত শাহ




