সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির ময়দানে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে বামফ্রন্ট। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার দ্বিতীয় দফাতেই সবচেয়ে বড় চমক, সিপিআইএম (CPIM) -এর দুই শীর্ষ নেতা মহম্মদ সেলিম (Mohammed Salim) এবং সুজন চক্রবর্তী (Sujan Chakraborty) এবার নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে যে, একি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, না কি দলের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত? গত কয়েকটি নির্বাচনে এই দুই নেতা ছিলেন বাম রাজনীতির প্রথম সারির মুখ। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট হোক বা সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচন, দু’জনেই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন। ফলে ২০২৬-এর লড়াই থেকে তাঁদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে। দলের অন্দরের সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত’, যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় মোট ৩২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বামফ্রন্ট। এর মধ্যে ২৮ জনই সিপিএমের প্রার্থী, বাকি কয়েকটি আসনে শরিক দলগুলির প্রার্থী রয়েছে। কিন্তু এই তালিকায় মহম্মদ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তী -এর নাম না থাকায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। এর আগে প্রথম দফায় ১৯২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। তখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের রানিনগর এবং কলকাতার টালিগঞ্জ।
এই দুই কেন্দ্র নিয়েই মূলত আলোচনা চলছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের আশা ছিল, রানিনগর কেন্দ্র থেকে মহম্মদ সেলিমকে প্রার্থী করা হতে পারে। একই ভাবে টালিগঞ্জ থেকে সুজন চক্রবর্তীর নামও উঠে এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তে তাঁরা কেউই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। রানিনগরে প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় নেতা জামাল হোসেন, আর টালিগঞ্জে প্রার্থী করা হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পার্থপ্রতিম বিশ্বাসকে। দলের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নীতি। সূত্রের খবর, এ বার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু নেতাকেই ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (Minakshi Mukherjee) এবং দেবলীনা হেমব্রম (Debolina Hembram) নির্বাচনে লড়ার অনুমতি পেয়েছেন। ফলে সেলিম ও সুজনের মতো শীর্ষ নেতারা তালিকার বাইরে থাকাটা অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এই প্রেক্ষাপটে বামফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) -এর কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। দলের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় (Naren Chatterjee) জানিয়েছেন, ‘সিপিএমের সঙ্গে কিছু আসন নিয়ে এখনও মতানৈক্য রয়েছে, তাই বৈঠকে যাওয়া হয়নি।’ এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, শরিক দলগুলির মধ্যে আসন সমঝোতা এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।
আরও পড়ুন : TMC Candidate List 2026: ৫২ মহিলা, নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন, প্রার্থী তালিকায় বড় চমক মমতা-অভিষেকের
এদিনের প্রার্থী তালিকায় কিছু অভিজ্ঞ মুখের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম থেকে প্রাক্তন সাংসদ পুলিনবিহারী বাস্কে (Pulin Bihari Baske) এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি থেকে প্রাক্তন বিধায়ক রামশঙ্কর হালদারকে (Ramshankar Halder) প্রার্থী করা হয়েছে। অন্যদিকে, পূর্ব মেদিনীপুরে দলের জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি (Niranjan Sihi) পাঁশকুড়া পশ্চিম আসনে লড়ছেন। তবে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির মধ্যে রয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আফরিন শিল্পী বেগম (Afrin Silpi Begum)। তাঁকে বালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তাঁর নাম এখনও ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেছে সিপিএমের প্রতিনিধিদল, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar)। বর্তমান পরিস্থিতিতে বামফ্রন্ট মোট ২৩৪টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দুই দফায়। এর মধ্যে সিপিআইএমএল-কে (লিবারেশন) ১০টি আসনে সমর্থন করা হয়েছে। অন্যদিকে, নওশাদ সিদ্দিকির (Naushad Siddiqui) দল আইএসএফ (Indian Secular Front) এখনও প্রায় ৩০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেনি, যা ঈদের পর প্রকাশ করা হবে বলে সূত্রের খবর। উল্লেখ্য, আসন সমঝোতা এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ২০টি আসনে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সেলিম ও সুজনের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো যে বামফ্রন্টের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলের অংশ, তা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ‘এটি এক ধরনের জেনারেশনাল শিফট, যেখানে নতুন মুখদের সামনে আনা হচ্ছে, আর প্রবীণ নেতারা সংগঠনকে মজবুত করার দিকে বেশি মন দিচ্ছেন।’ ২০২৬-এর ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে, এই লড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের নয়, বরং দলগুলির ভিতরে ভিতরে পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। সেলিম ও সুজনের সরে দাঁড়ানো সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় ইঙ্গিত, যা আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় লিখতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : O Panneerselvam joins DMK | তামিলনাড়ু ভোটের আগে বড় চমক! ডিএমকে-তে যোগ দিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওপিএস, বদলাচ্ছে সমীকরণ




